ইসরায়েলকে ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে)। ফাইল ছবি
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে)। ফাইল ছবি

চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইসরায়েলের এখন আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর পর আকস্মিকভাবে এ ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করা ভোটারদের কথা বিবেচনায় রেখেই তিনি এমন ঘোষণা দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। বিশ্লেষকদের মতে, এই ফল শুধু রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয় নয়; একসময় দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জয় ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষেরও প্রতিফলন।

মঙ্গলবার সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কারণ, দেশটির এই সহায়তার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ৪০০ কোটি ডলার দিচ্ছিলাম। তবে বছরের শেষেই তা বন্ধ হয়ে যাবে।’

তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ক্রমেই সমালোচনার মুখে পড়ছে। মিশিগানের আবদুল এল-সায়েদের মতো সরব রাজনীতিকরা এ সমালোচনা করছেন। এ পরিস্থিতিতে সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান ট্রাম্প।

তিনি বলেন, ‘এল-সায়েদের মতো উন্মাদদের কাছ থেকে আমাদের কেন সমালোচনা শুনতে হবে, যখন তাদের (ইসরায়েলের) এই অর্থের প্রয়োজনই নেই? এটি একটি খারাপ রাজনৈতিক ইস্যু।’

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ৪০০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম ও অর্থ দিই। অথচ তাদের এগুলোর প্রয়োজন নেই। বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। কয়েক বছর ধরেই আমাদের আলোচনা চলছে, কারণ এর পরিমাণ অনেক বেশি।’

এর আগে আগামী ১০ বছরে ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্পের ঘোষণা কার্যকর হলে সেই সময়সীমা অনেকটাই এগিয়ে আসবে।

গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। দেশটির বিরোধী দলের নেতাদের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর বিরোধীরা নতুন সরকার গঠনে জোট বাঁধার চেষ্টা করছে। এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের এ ঘোষণা এল।

নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী পদের প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-ডানপন্থি রাজনীতিক গাদি আইজেনকোট বলেন, ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এবং দেশটির নাগরিকেরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে কৌশলগত সম্পর্কের কাঠামোয় পরিবর্তনের বিষয়টি জানতে পারছেন। এটি দেখিয়ে দেয়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড কতটা প্রকৃত বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। আমরা আর তার ওপর নির্ভর করতে পারি না। তাকে সরিয়ে দিতে হবে।’

বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসের প্রধান ইয়ার গোলান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করতেন, তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতেন না। নেতানিয়াহু নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করছেন এবং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলছেন।’

২০২৫ সালে ইসরায়েলকে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর বড় অংশ ছিল বিদেশি সামরিক অর্থায়ন অনুদান। এই অর্থ দিয়ে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের মতো মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারে ইসরায়েল। এর বাইরে দুই দেশের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য আরও ৫০ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছিল।

গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি জরিপেও ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি মার্কিন জনসমর্থনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গাজায় মানবিক সংকট নিয়ে ক্ষোভের জেরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে প্রগতিশীল প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। আবদুল এল-সায়েদও তাদের একজন। অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

গত জুনে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভ্যান্স বলেছিলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু মানুষ হত্যা করে যেতে পারেন না।’

তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। ইসরায়েলে নিজের জনপ্রিয়তা নিয়েও কথা বলেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যদি কখনো আমার ওপর বিরক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমি ইসরায়েলে চলে যাব এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী হব।’

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad