মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলই কি ট্রাম্পের পতনের শুরু?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে দেয়নি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একসময় রিপাবলিকানদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভ— সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের হিসাব পালটে গেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলকে দল হিসেবে কেবল রিপাবলিকান পার্টির ব্যর্থতার দায়ভার যতটা মনে করা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি মনে করা হচ্ছে ট্রাম্পের নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান হিসেবে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি ট্রাম্পেরও পতনের সূচনা কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। সিনেটে তারা অন্তত সাতটি আসন বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, মেইন ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্য।
নির্বাচনের ফল বলছে, কানসাসে ১৯৩২ সালের পর, সাউথ ক্যারোলাইনায় ১৯৯৮ সালের পর ও টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাটরা সিনেট আসন জিতেছে এবারের নির্বাচনে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রায় ১৮ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানেও তার সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ।
প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের জয় এসেছে দুই ডজনের বেশি আসনে। নির্বাচনের পরপর প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সেখানে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ২৩১টি ও রিপাবলিকানরা ১৪১টি আসন পেয়েছে।কিছু আসনের গণনা তখনো বাকি ছিল।
ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একই মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এক দল থেকে অন্য দলের হাতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল মাত্র তিনবার— ১৯৪৬, ১৯৯৪ ও ২০০৬ সালে। ২০২৬ সালে আবারও সেই ঘটনা ঘটল। এর ফলে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টার বিপরীতে কংগ্রেসে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি হলো।
ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধ
নির্বাচনের ফলের পেছনে ভোটারদের অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে। বার্তা সংস্থা এপির এক্সিট পোলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি দুর্নীতিকে ভোটাররা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছেন।
২০২৪ সালে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি কমানো ও বিদেশে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। কিন্তু তার আরোপ করা শুল্ক পণ্যের দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে অর্থনৈতিক জনতুষ্টিবাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয় তার নিজের সমর্থকগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যেও।
ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারও ছিল বিতর্কিত ও অস্বাভাবিক। দীর্ঘ বক্তৃতায় তিনি বিভিন্ন স্থাপত্য প্রকল্প নিয়ে কথা বলেছেন, মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন এবং ওহাইওর এক রিপাবলিকান সিনেটরের শারীরিক গঠন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পর্যন্ত করেছেন। প্রচারের শেষ দিকে লিংকন মেমোরিয়ালের প্রতিফলন পুকুরে শৈবাল পরিষ্কারের কাজকে ঘিরেও নিজের বিজয়ের দাবি করেন তিনি।
এসব বক্তব্য ও আচরণ ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রচারকেই বেশি গুরুত্ব পাওয়ার ধারণা তৈরি করেছে— এমন বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।
এখন রিপাবলিকানদের সামনে পরাজয়ের কারণ খুঁজে দেখার পালা। ট্রাম্প নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরলেও তার ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি, বিলাসবহুল আয়োজন ও হোয়াইট হাউজে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে। বাজারে খাবারের দাম বাড়তে থাকলেও প্রেসিডেন্টের বিলাসী প্রকল্পের প্রচার তার সমর্থকদের একাংশকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে।
কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপে ট্রাম্প
আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। ডেমোক্র্যাটরা তার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে পারবেন, প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত করতে পারবেন এবং সরকারি নথি ও কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য তলব করতে পারবেন। একই সঙ্গে বিচারক ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করতে পারবেন।
এর ফলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতো প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের তদন্ত ও জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ভাবতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিরাও কংগ্রেসের তদন্তের আওতায় আসতে পারেন।
এতে ট্রাম্প কার্যত রাজনৈতিক অবরোধের মুখে পড়তে পারেন। আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা তৈরি হলে তার হাতে নির্বাহী আদেশ ও ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার ছাড়া বিকল্প কমে আসবে। নির্বাচনের রাতেই তিনি ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগে ভেটো দেওয়ার হুমকি দিয়েও রেখেছেন।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই ট্রাম্পের সব ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়। প্রথম মেয়াদের প্রথম দুই বছরেও কংগ্রেসের প্রতি তার মনোযোগ সীমিত ছিল। কর ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত ‘বিগ, বিউটিফুল বিল’ পাস করানো ছিল তার বড় আইন প্রণয়নমূলক সাফল্য।
অন্যদিকে শুল্ক আরোপ এবং ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সামরিক হামলার মতো সিদ্ধান্ত তিনি নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করেই নিয়েছেন। ফলে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ট্রাম্প একতরফাভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা অব্যাহত রাখতে পারেন। নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গড়তে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানোর প্রবণতা থাকলে তা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিশ্বেও উদ্বেগের কারণ হবে।
ওয়াশিংটনের চেহারা বদলে দেওয়ার পরিকল্পনাও চালিয়ে যেতে পারেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে বিশাল বলরুম, বিজয়-তোরণ নির্মাণ এবং সরকারি স্থাপনায় সোনালি সাজসজ্জা— এসব তার দীর্ঘদিনের আগ্রহের বিষয়। কংগ্রেস এসব প্রকল্পে বাধা দিতে পারে, আবার তুলনামূলক কম ক্ষতিকর কাজ হিসেবে তাকে ব্যস্ত রাখার সুযোগ হিসেবেও দেখতে পারে।
২০২৮ সালের উত্তরসূরি নিয়ে লড়াই
ট্রাম্পের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সময়ের পরিবর্তন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রতিযোগিতা কার্যত এখন থেকেই শুরু। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দিকে ধীরে ধীরে মনোযোগ সরতে পারে। আর সেটি ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
কারণ, গত এক দশক ধরে তিনি রিপাবলিকান পার্টি ও ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনকে নিজের ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থানের আদলে গড়ে তুলেছেন। দলের ভেতরে তার প্রভাব সহজে শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় নতুন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
আবার নির্বাচনের ফলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে কোনো রাজনৈতিক যুগের অবসান ঘোষণা করার ঝুঁকিও রয়েছে। ট্রাম্প দুইবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন, কিন্তু কোনোবারই জাতীয় পর্যায়ে মোট ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পাননি। ২০২০ সালে জো বাইডেনের কাছে তার পরাজয়ের পরও অনেকে ট্রাম্প-যুগের অবসান ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু চার বছর পর তিনি আবারও রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসেন।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও প্রযোজ্য হতে পারে একই সতর্কতা। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অর্ধেকেরও কম সময় পার হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সুযোগও তার সামনে রয়েছে। বরং পরাজয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আগামী দুই বছরে হারানোর কিছু নেই— এমন মনোভাব নিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন তিনি। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর আশঙ্কা তাকে আরও বেপরোয়া সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিলে সেটিই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
সুতরাং, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্বে বড় ধাক্কা হলেও একে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি বিবেচনা অতিকল্পনায় পরিণত হতে পারে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ, রিপাবলিকানদের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন হিসাব এবং ২০২৮ সালের উত্তরসূরি প্রতিযোগিতা এখন ট্রাম্পের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, সেটিই নির্ধারণ করবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কতটা সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, রয়টার্স, এপি


-31b3e3.jpg)

















