গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেন ট্রাম্প, কী করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৪: ৩৮
মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তদন্ত ও নজরদারির ক্ষমতা বাড়বে দলটির।

পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও প্রশাসনকে চাপে ফেলতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। ফলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছর প্রথম দুই বছরের চেয়ে ভিন্ন হতে যাচ্ছে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা কী কী করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা

রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন আসনে জয় পেয়ে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের সীমা অতিক্রম করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। ফলে পরবর্তী সময়ে এই কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হতে যাচ্ছেন হাকিম জেফরিস। ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে কোনো আইন পাস করানো রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর সুযোগও পাচ্ছে দলটি। প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন, সরকারি নথিপত্র তলব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে তাদের। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও কংগ্রেসের নজরদারির আওতায় এনে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।

এ ছাড়া ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের দাবিও উঠতে পারে দলটির সমর্থকগোষ্ঠীর ভেতর থেকে। এ বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিনেটে নিয়ন্ত্রণের প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল আদালতের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় এসব নিয়োগ আটকে দেওয়া বা অনুমোদনের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হতে পারে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারবে তারা।

যেসব বিষয়ে তদন্ত হতে পারে

রাজনৈতিক প্রতিবেদক জোসেফ গিডিওন ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের ক্ষেত্র তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি এবং পেন্টাগনের ব্যয়।

ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা ও দুর্নীতির অভিযোগ

প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া জানিয়েছেন, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তকে তিনি অগ্রাধিকার দেবেন।

এ ছাড়া প্রতিনিধি জেমি রাসকিন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসায়িক লেনদেন ও কর্মকাণ্ডের তথ্য চেয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি ও ইমেইল

প্রতিনিধি রো খান্না ও টমাস ম্যাসির যৌথ উদ্যোগে গত বছর জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত লাখ লাখ নথি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। তবে নথি প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই জটিলতা তৈরি হয়।

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব নথি প্রকাশ করতে পারেনি বিচার বিভাগ। পরে তাদের কাছে থাকা প্রায় ৬০ লাখ পৃষ্ঠার নথির মধ্যে সাড়ে ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়। বাকি নথিগুলো একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি বা ডুপ্লিকেট হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত জানায় বিভাগটি।

প্রকাশিত নথির কিছু অংশে অতিরিক্ত তথ্য আড়াল করা এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে ভুলবশত ভুক্তভোগীদের নাম প্রকাশের ঘটনায় দুই দলের সদস্যদের মধ্যেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে সাংবাদিক কেটি ফ্যাংয়ের করা একটি মামলারও মুখোমুখি হয়েছে বিচার বিভাগ।

বর্তমান রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসেও এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্তে দুই দলের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা সহযোগিতা দেখা গেছে। প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কোমারের নেতৃত্বে কমিটি বিভিন্ন সময়ে সাক্ষীদের তলব করেছে। সহযোগিতা না করায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস অবমাননার অভিযোগও আনা হয়েছে। নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসেও এ ধরনের তদন্ত ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকতে পারে।

পেন্টাগন ও যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয়

ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো জানিয়েছেন, তাঁর তদন্তের প্রাথমিক লক্ষ্য হবে পেন্টাগন। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির সদস্য। পাশাপাশি কংগ্রেসের দুর্নীতিবিরোধী ককাসের সহসভাপতিও তিনি।

ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ চলে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্রো। তাঁর মতে, পেন্টাগনের ব্যয় এবং প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ বরাদ্দের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ট্রাম্পের অভিশংসন

ট্রাম্পকে আবারও অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস জানিয়েছেন, এ বিষয়ে দল কোনো সম্ভাবনাই নাকচ করে দিচ্ছে না।

অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা স্টিভ স্ক্যালিস ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারেন।

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যা করেছিল ডেমোক্র্যাটরা

২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। এরপর ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক তদন্ত শুরু করে পরিষদের বিভিন্ন কমিটি।

ট্রাম্পের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, রাশিয়া-সংক্রান্ত তদন্তে তাঁর ভূমিকা এবং স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাব্য অভিযোগগুলো এসব তদন্তের কেন্দ্রে ছিল। কয়েক ডজন তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হয়।

২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রায় এক বছর পর ট্রাম্পকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয় প্রতিনিধি পরিষদ। অভিশংসনের দাবিতে কয়েক মাস ধরে চলা চাপের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মূলত ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং কংগ্রেসের নজরদারিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ ছিল, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে জো বাইডেনের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। এর মাধ্যমে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেনকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।

তবে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিনেটে অভিশংসনের দুটি অভিযোগ থেকেই খালাস পান ট্রাম্প। এরপর ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনে হামলায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসিত হন তিনি। কিন্তু সেবারও রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটে খালাস পান ট্রাম্প।

এবার কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি, তদন্ত ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ক্ষমতা এবং সিনেটে আইন পাসের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভোটের সীমাবদ্ধতার কারণে সব ক্ষেত্রে নিজেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে না দলটি।

তারপরও প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে আগামী দুই বছর ট্রাম্পকে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad