ইরান যুদ্ধ নয়, এর ‘অর্থনৈতিক মূল্য’ই নির্বাচনে হারের কারণ: ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধের বাড়তি ব্যয়কে দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, যুদ্ধ নয়, বরং এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারের কারণ হয়েছে।

আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, বুধবার হোয়াইট হাউজের সংস্কারকাজের নির্মাণস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে আমাদের যা করার ছিল, তা করতে হয়েছে। আমরা এই কাজ চালিয়ে যাব।’

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করার পরিবর্তে এর ব্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ নয়, এর মূল্যই’ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতির জন্য দায়ী।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের অনুপস্থিতিকেও পরাজয়ের একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। তার দাবি, তিনি নিজে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারত। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি যদি ব্যালটে থাকতাম, তাহলে আমরাই জিততাম।’

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, তাদের সঙ্গে সম্ভবত তার ভালো সম্পর্কই থাকবে। তবে ডেমোক্র্যাটরা তাকে অভিশংসনের চেষ্টা করলে তাতে তাদের দলই ‘ধ্বংস’ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে তার রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যকে শুধু রিপাবলিকানদের পরাজয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জয় ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত সাতটি আসন বাড়িয়েছে। এসব আসনের মধ্যে রয়েছে টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, মেইন ও ওহাইও। কানসাসে ১৯৩২ সালের পর, সাউথ ক্যারোলাইনায় ১৯৯৮ সালের পর এবং টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সিনেট আসন পেয়েছে দলটি।

বিশেষ করে সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের জয়কে ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটিতে প্রায় ১৮ শতাংশ ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। এবার সেখানে তার সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ।

প্রতিনিধি পরিষদেও দুই ডজনের বেশি আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ কক্ষে দলটি অন্তত ২৩১টি এবং রিপাবলিকানরা ১৪১টি আসন পেয়েছে। কয়েকটি আসনের ভোট গণনা তখনো বাকি ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একই মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এক দল থেকে অন্য দলের হাতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৯৪৬, ১৯৯৪ ও ২০০৬ সালে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবারও এমন পরিবর্তন ঘটল। ফলে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধ

নির্বাচনের ফলাফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বার্তা সংস্থা এপির নির্বাচনি বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, ভোটাররা এই দুটি বিষয়কে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বিদেশে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তার আরোপ করা শুল্ক পণ্যের দামে চাপ তৈরি করে। এর সঙ্গে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। এতে অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্পের ওপর তার সমর্থকদের একাংশের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়।

নির্বাচনি প্রচারেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ট্রাম্প। বিভিন্ন জনসভায় দীর্ঘ বক্তব্যের পাশাপাশি স্থাপত্য প্রকল্প নিয়ে কথা বলা, মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য এবং ওহাইওর এক রিপাবলিকান সিনেটরের শারীরিক গঠন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তিনি। প্রচারের শেষ দিকে লিংকন মেমোরিয়ালের প্রতিফলন পুকুর থেকে শৈবাল পরিষ্কারের কাজ নিয়েও নিজের সাফল্যের দাবি করেন।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি, বিলাসবহুল আয়োজন এবং হোয়াইট হাউজে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার মধ্যে প্রেসিডেন্টের এমন বিলাসী উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সমালোচকরা।

সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ট্রাম্পের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড— এসব বিষয়ই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad