কোথায় শুরু হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের ‘ব্লু ওয়েভ’, কোন আসনের ফল বদলে দেবে সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে আসন হারাতে হয়। কখনো সেই ক্ষতি সীমিত থাকে, কখনো তা বড় ধাক্কায় পরিণত হয়। আর কিছু নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের জন্য ঐতিহাসিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
আজ মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য প্রথম পরিস্থিতি প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে ক্ষতির মাত্রা কতটা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার নয়, বরং সিনেটেও অপ্রত্যাশিত সাফল্যের স্বপ্ন দেখছে।
নির্বাচনের শেষ পর্যায়ের জনমত জরিপগুলো ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদ বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন ২০১৮ সালের তুলনায় অনেক নিচে। ওই বছর ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের ৪০টির বেশি আসন হারিয়েছিল। বর্তমান জনসমর্থনের অবস্থা বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটনের আমলে তাদের দলের বড় নির্বাচনি পরাজয়ের আগের অবস্থার চেয়েও খারাপ।
এবারের প্রচারণার শেষ দিকে টেক্সাস, ওহাইও, এমনকি কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের ভালো অবস্থান দেখা যাচ্ছে। তবে উদ্বেগও আছে। কারণ, দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বেশির ভাগ আসনই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে। এসব এলাকায় এখনো রিপাবলিকান ভোটার বেশি।
ট্রাম্পের ব্যাপক নির্বাচনি প্রচার ও রিপাবলিকানদের বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুবিধা যদি ভোটের দিন কাজে লাগে, তাহলে জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য ব্যবধান মুছে যেতে সময় লাগবে না।
ডেমোক্র্যাটদের অভিজ্ঞ নির্বাচনি জরিপবিদ পল মাসলিনের মতে, প্রচারের শেষ দিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও রিপাবলিকানদের প্রত্যাশিত উত্থান ঘটেনি। তবে রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের পাওয়া ব্যবধান শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যাবে কি না, সেটিই বড় পরীক্ষা।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের সমীকরণ কী
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষ— প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট এবং বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নর নির্বাচন হয়। ফলে শুধু জাতীয়ভাবে কে বেশি ভোট পেল, তা দিয়ে নির্বাচনের ফল বোঝা যায় না। কোন দল কতটি আসন পেল এবং কোন রাজ্যে জয়ী হলো, সেটিই ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণ করে।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জন্য তিনটি সম্ভাব্য ফল সামনে রয়েছে।
- ভালো রাত: রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে জয় পাওয়া এবং নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ আসন ধরে রাখা। এতে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
- খুব ভালো রাত: রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্য ও জেলাগুলোতেও জয় পাওয়া। এতে শুধু প্রতিনিধি পরিষদ নয়, সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনেও বড় সাফল্য আসতে পারে।
- ঐতিহাসিক জয় বা ব্লু ওয়েভ: রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও একের পর এক আসন হাতছাড়া হওয়া। ১৯৯৪ ও ২০১০ সালে রিপাবলিকানদের বড় জয় এবং ২০০৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের বড় নির্বাচনি সাফল্যের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা যদি নিজেদের ‘ভালো ফলে’র তালিকায় থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনেও হেরে যায়, তাহলে প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল হতে পারে।
নির্বাচনের ফলের গতিপথ বোঝার জন্য তাই কয়েকটি রাজ্য ও আসনের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। পূর্ব উপকূল থেকে পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত এসব আসনের ফলই জানিয়ে দেবে, ডেমোক্র্যাটদের ঢেউ কতটা শক্তিশালী।
উত্তর-পূর্বাঞ্চল: প্রথম ইঙ্গিত ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভ্যানিয়ায়
পূর্বাঞ্চলে ভোট গণনা শুরু হবে আগে। ফলে নির্বাচনের রাতের প্রথম বড় ইঙ্গিত আসবে ভার্জিনিয়া থেকে। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে।
ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে (ভিএ-২) সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এলেইন লুরিয়া রিপাবলিকান জেন কিগানসের বিরুদ্ধে লড়ছেন। ২০২২ সালে কিগানসের কাছে হেরেছিলেন লুরিয়া। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প এই আসনে এক পয়েন্টেরও কম ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। এখানে লুরিয়ার জয় ডেমোক্র্যাটদের ভালো নির্বাচনী রাতের ইঙ্গিত দেবে। হারলে বুঝতে হবে, দলটি প্রত্যাশার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
ভার্জিনিয়ার প্রথম আসনেও ডেমোক্র্যাটরা জয় পেলে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। সেখানে রিপাবলিকান রব উইটম্যানের বিরুদ্ধে লড়ছেন শ্যানন টেলর। আসনটিতে ট্রাম্প পাঁচ পয়েন্টে জয়ী হয়েছিলেন। আর পঞ্চম আসনে সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি টম পেরিয়েলো যদি রিপাবলিকান জন ম্যাকগুয়ারকে হারাতে পারেন, তাহলে তা ঐতিহাসিক সাফল্যের ইঙ্গিত হবে।
এই আসনে ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জয়ের ব্যবধান ছিল ১২ পয়েন্ট। এমন ফল এলে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পাওয়া ২৩৫টি আসনের চেয়েও বেশি আসন জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রাত ৮টায় ভোট শেষ হবে পেনসিলভ্যানিয়ায়। রাজ্যটির সপ্তম ও দশম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রতিনিধি রায়ান ম্যাকেঞ্জি ও স্কট পেরিকে হারাতে পারলে ডেমোক্র্যাটরা ভালো অবস্থানে থাকবে। দুটি আসনেই ট্রাম্পের জয়ের ব্যবধান ছিল পাঁচ পয়েন্ট বা তার কম।
আর অষ্টম আসনে ডেমোক্র্যাট পেইজ কগনেত্তি যদি প্রথম মেয়াদের রিপাবলিকান প্রতিনিধি রব ব্রেসনাহানকে হারান, তাহলে রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়বে। এই আসনে ট্রাম্প আট পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
পেনসিলভ্যানিয়ার প্রথম আসনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ভোটারদের আধিক্য থাকা এই আসনে রিপাবলিকান ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাকে হারাতে পারলে ডেমোক্র্যাটদের জয় হবে বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা। এর অর্থ, ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা থেকে শুধু দূরত্ব বজায় রাখলেই রিপাবলিকান প্রার্থীদের রক্ষা মিলছে না।
মেইনে গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট হান্না পিংগ্রির স্বস্তিদায়ক জয় দলের প্রত্যাশিত ফলের ইঙ্গিত দেবে। তবে দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ম্যাথিউ ডানল্যাপ যদি সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর পল লেপেজকে হারান, তাহলে ফল আরও ভালো হবে।
সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে মেইনের সিনেট নির্বাচনে। রিপাবলিকান সুসান কলিন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন। ট্রাম্পের তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই যে ১৯টি রাজ্য তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে মেইনেই এখনো একজন রিপাবলিকান সিনেটর রয়েছেন— কলিন্স। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রভাব যদি তার মতো অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী প্রার্থীর ওপরও পড়ে, তাহলে তা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় সাফল্য হবে।
নিউ জার্সির সপ্তম আসনে রেবেকা বেনেট যদি রিপাবলিকান টম কিন জুনিয়রকে হারান, তাহলে ডেমোক্র্যাটরা ভালো অবস্থানে থাকবে। নিউইয়র্কের ১৭তম আসনে মাইক ললারকে হারাতে পারলে আরও বড় ঢেউয়ের ইঙ্গিত মিলবে। আর ২১তম আসনে ব্লেক গেন্ডেবিয়েনের জয় হলে সেই ঢেউ ঐতিহাসিক মাত্রা পেতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চল: জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের পরীক্ষা
দক্ষিণাঞ্চলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ফল আসবে জর্জিয়া থেকে। সন্ধ্যা ৭টায় ভোট শেষ হবে সেখানে। সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট জন অসফের পুনর্নির্বাচিত হওয়া প্রত্যাশিত ফল হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস যদি বিপুল অর্থ ব্যয় করা রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে হারাতে পারেন, তাহলে তা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল হবে।
নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক ডেমোক্র্যাট গভর্নর রয় কুপার সিনেট আসনটি পুনরুদ্ধারের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তিনি অন্তত ছয় পয়েন্টের ব্যবধানে জিতলে তা ডেমোক্র্যাটদের ভালো রাতের ইঙ্গিত দেবে।
রাজ্যটির প্রথম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডোনাল্ড ডেভিসের জয়ও গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকানরা আসনটির সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে ট্রাম্পের পক্ষে ১১ পয়েন্টের বেশি ব্যবধান তৈরি করেছিল। আর ১১তম আসনে জেমি অ্যাগারের জয় হলে তা আরও বড় সাফল্য হবে।
রিপাবলিকানদের দখলে থাকা তৃতীয় বা নবম আসনেও ডেমোক্র্যাটরা জয় পেলে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলবে। নবম আসনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর বর্তমান প্রতিনিধি রিচার্ড হাডসন রিপাবলিকানদের কংগ্রেশনাল নির্বাচনি কমিটির চেয়ারম্যান।
ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাটদের প্রথম লক্ষ্য হবে রিপাবলিকানদের পুনর্নির্ধারিত সীমানার কারণে কঠিন হয়ে পড়া তিনটি আসন ধরে রাখা। ২৫তম আসনে জ্যারেড মোসকোভিচ, ১৪তম আসনে ক্যাথি কাস্টর ও নবম আসনে ড্যারেন সোতোর জয় ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী করবে। এর বাইরে রিপাবলিকান আনা পলিনা লুনার ১৩তম আসন অথবা দলটির ছেড়ে দেওয়া সপ্তম আসন দখল করতে পারলে তা আরও বড় সাফল্য হবে।
গভর্নর নির্বাচনেও বড় চমক দেখাতে পারেন সাবেক রিপাবলিকান ডেভিড জলি। তিনি রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডসকে হারালে ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
তবে ঐতিহাসিক ফলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ২৭তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট। হিস্পানিক-অধ্যুষিত এ আসনে রিপাবলিকান মারিয়া এলভিরা সালাজারকে হারাতে পারলে ডেমোক্র্যাটরা বড় সাফল্য পাবে। ২০২৪ সালে এখানে ট্রাম্প ১৫ পয়েন্টে জয়ী হয়েছিলেন। আর সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট অ্যাঞ্জি নিক্সন যদি রিপাবলিকান অ্যাশলি মুডিকে হারাতে পারেন, তাহলে সেটি হবে আরও বড় বিস্ময়।
সাউথ ক্যারোলাইনা ও মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনও ডেমোক্র্যাটদের জন্য ঐতিহাসিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ যদি রিপাবলিকান ডারলিন গ্রাহামকে হারান, তাহলে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার রাজ্যটিতে সিনেট আসন পাবে ডেমোক্র্যাটরা। মিসিসিপিতে স্কট কোলমের জয় হলে তা হবে আরও বড় ঘটনা। ১৯৮২ সালের পর রাজ্যটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা টেক্সাসে। রাজ্যটিতে ১৯৮৮ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট মার্কিন সিনেটর নির্বাচিত হননি। এবার ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো যদি রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে হারাতে পারেন, তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলবে। প্যাক্সটন নানা বিতর্কে জড়িত থাকলেও রিপাবলিকানদের বিপুল অর্থায়ন তার পক্ষে রয়েছে। ইলন মাস্কসহ বিভিন্ন দাতার অর্থে রিপাবলিকান সুপার পিএসি সেখানে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে।
গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা যদি রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবটকে হারান, তাহলে সেটি হবে প্রজন্মগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো ঘটনা। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের জন্য এমন জয়কে ‘এক প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সাফল্য’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
টেক্সাসে হিস্পানিক ভোটারদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে ট্রাম্প এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিলেন। এবার দক্ষিণ টেক্সাসের ২৮তম আসনে হেনরি কুয়েলার ও ৩৪তম আসনে ভিসেন্তে গনজালেসের জয় হলে বোঝা যাবে, ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের আসন ধরে রাখতে পারছে। ১৫তম আসনে সংগীতশিল্পী ববি পুলিডো অথবা ৩৫তম আসনে জনি গার্সিয়ার জয় হলে হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ মিলবে। আর ২৩তম আসনে ক্যাটি পাদিলা স্টাউটের জয় হলে তা হবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য প্রায় সুনামির মতো পরিস্থিতি।
মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল: ট্রাম্পের ভোটব্যাংকে ফাটল ধরবে কি?
গত এক দশকে মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকলেও এবার অঞ্চলটি আবার মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে কৃষি অর্থনীতিতে চাপ এবং শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করেছে।
কেন্টাকির ষষ্ঠ আসনে জ্যাক ডেম্বো অথবা ইন্ডিয়ানার পঞ্চম আসনে জেডি ফোর্ডের জয় হলে ডেমোক্র্যাটরা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলের পথে থাকবে। দুটি আসনেই ২০২৪ সালে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
ওহাইওতে ভোট শেষ হবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। রাজ্যটির প্রথম ও নবম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান ও মার্সি ক্যাপটুর পুনর্নির্বাচিত হওয়া দলের জন্য ভালো ফল হবে। সপ্তম আসনে ব্রায়ান পোয়েনডেক্সটারের জয়ও একই বার্তা দেবে।
তবে রাজ্যটির সিনেট ও গভর্নর নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন যদি রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারাতে পারেন, তাহলে শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের হারানো সমর্থন কিছুটা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলবে। গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাকটনের জয়ও প্রত্যাশিত বলে মনে করা হচ্ছে। রিপাবলিকান বিবেক রামস্বামীর বিরুদ্ধে তার অবস্থান শক্তিশালী।
ওহাইওর দশম ও ১৫তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান মাইক টার্নার ও মাইক কেরিকে হারাতে পারলে তা হবে আরও বড় সাফল্য। ট্রাম্পের জয়ী হওয়া দুটি আসনেই ডেমোক্র্যাটদের এমন জয়কে বড় নির্বাচনি ঢেউয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখা হবে।
আইওয়ায় প্রথম ও তৃতীয় আসনে রিপাবলিকান মারিয়েনেট মিলার-মিকস ও জ্যাক নানের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের জয় প্রত্যাশিত ভালো ফলের অংশ। গভর্নর নির্বাচনে রব স্যান্ডের জয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্বিতীয় আসনে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেলে কিংবা সিনেট নির্বাচনে জশ টুরেক যদি রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনকে হারান, তাহলে তা আরও বড় সাফল্য হবে। কারণ, এমন জয় পেতে হলে গ্রামীণ ও শ্রমজীবী শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনও ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরতে হবে।
উইসকনসিনে তৃতীয় আসনে রেবেকা কুকের জয় ডেমোক্র্যাটদের ভালো ফলের ইঙ্গিত দেবে। প্রথম আসনে মিচেল বারম্যানের জয় এবং গভর্নর নির্বাচনে ডেভিড ক্রাউলির সাফল্য হলে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে।
মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে জোসেলিন বেনসনের স্বস্তিদায়ক জয় ডেমোক্র্যাটদের ন্যূনতম প্রত্যাশা। চতুর্থ ও সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নিতে পারলেও দলটি ভালো অবস্থানে থাকবে।
তবে রাজ্যটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই সিনেট নির্বাচন। ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদ ও সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক রজার্সের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। নির্বাচনি প্রচারে এল-সায়েদের মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে ট্রাম্পসহ রিপাবলিকানদের ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি জয়ী হলে তা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় রাজনৈতিক বার্তা হবে। কারণ, ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিরূপ প্রচারণা এবং অন্যান্য প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রিপাবলিকানরা সুবিধা করতে পারছে না।
মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের বাইরেও কয়েকটি রাজ্যের সিনেট নির্বাচন ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কানসাসে অ্যাডাম মার্শাল যদি রিপাবলিকানদের হারান, তাহলে ১৯৩২ সালের পর প্রথমবার রাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হবেন।
নেব্রাস্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ড্যান অসবর্ন রিপাবলিকান পিট রিকেটসকে এবং সাউথ ডাকোটায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্রায়ান বেঙ্গস রিপাবলিকান মাইক রাউন্ডসকে হারাতে পারলে তা হবে জাতীয় রাজনীতিতে বড় বিস্ময়। এসব রাজ্যে জয় ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী ঢেউকে ঐতিহাসিক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।
পশ্চিমাঞ্চল: অ্যারিজোনা-কলোরাডো-আলাস্কায় বড় পরীক্ষার মুখে রিপাবলিকানরা
পশ্চিমাঞ্চলে কলোরাডো ও অ্যারিজোনা ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কলোরাডোর অষ্টম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট মানি রুটিনেল রিপাবলিকান গ্যাবে ইভান্সকে হারাতে পারলে সেটি ভালো ফল হবে। পঞ্চম আসনে জেসিকা কিলেনের জয় হলে তা আরও বড় সাফল্য। আর তৃতীয় আসনে জেফ হার্ড অথবা বিশেষ করে চতুর্থ আসনে লরেন বোয়েবার্টকে হারাতে পারলে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনি ঢেউ অনেক শক্তিশালী হবে। চতুর্থ আসনে ২০২৪ সালে ট্রাম্প ১৮ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
অ্যারিজোনায় গভর্নর কেটি হবসের স্বস্তিদায়ক পুনর্নির্বাচন এবং প্রথম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট আমিশ শাহর জয় দলের ভালো ফলের ইঙ্গিত দেবে। ষষ্ঠ আসনে জোয়ানা মেন্ডোজা যদি রিপাবলিকান হুয়ান সিসকোমানিকে হারাতে পারেন, তাহলে তা আরও বড় সাফল্য হবে।
আলাস্কায় গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট জনাথন ক্রেইস-টমকিনসের জয় প্রত্যাশিত। তবে সিনেট নির্বাচনে সাবেক প্রতিনিধি মেরি পেল্টোলা যদি রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানকে হারাতে পারেন, তাহলে তা হবে বড় ঘটনা। ১৯৫৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হওয়ার পর আলাস্কা মাত্র চারজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত করেছে। ১৯৮০ সালের পর সংখ্যাটি মাত্র একজন। পেল্টোলা জয়ী হলে তিনি হবেন আলাস্কার প্রথম আদিবাসী সিনেটর।
তবে তাকে ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। আলাস্কার র্যাঙ্কড-চয়েস ভোটব্যবস্থায় ড্যান জে সুলিভান নামের আরেক প্রার্থী চূড়ান্ত তালিকায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন আগাম মামলা করে পেল্টোলার সম্ভাব্য জয় বাতিলের চেষ্টা করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেল্টোলার প্রচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডেমোক্র্যাটরা ওই প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আলাস্কার রিপাবলিকান গভর্নর ও মার্কিন বিচার বিভাগ তদন্ত করছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করেন, এই বিতর্ক নির্বাচনের ফল বাতিলের আইনি ভিত্তি তৈরি করার সম্ভাবনা কম।
পশ্চিমাঞ্চলের অন্য রাজ্যগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ লড়াই রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ২২তম আসনে ডেমোক্র্যাট র্যান্ডি ভিলেগাসের জয় এবং ওয়াশিংটনের তৃতীয় আসনে ডেমোক্র্যাট মেরি গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজের পুনর্নির্বাচন দলের ভালো ফলের ইঙ্গিত দেবে।
ওরেগনের গভর্নর নির্বাচনে টিনা কোটেক রিপাবলিকান ক্রিস্টিন ড্রাজানকে হারাতে পারলে তা হবে আরও বড় বার্তা। নেভাদায় গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট অ্যারন ফোর্ডের জয় এবং মন্টানার প্রথম আসনে স্যাম ফোরস্ট্যাগের সাফল্যও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
তবে অ্যারিজোনার দ্বিতীয় ও নেভাদার দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে জয় পেলে পরিস্থিতি ঐতিহাসিক মাত্রা পেতে পারে। দুটি আসনেই ২০২৪ সালে ট্রাম্প ১৪ থেকে ১৫ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। সেখানে ডেমোক্র্যাটদের জয় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও বড় পরিবর্তনের প্রমাণ হবে।
শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণে নির্ধারিত হবে ফল
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াকে কেন্দ্র করে। জ্বালানির উচ্চমূল্য, শুল্কনীতির প্রভাব, কৃষি অর্থনীতির চাপ এবং শ্রমজীবী ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হিস্পানিক ও শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের ২০২৪ সালের অর্জন কতটা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, তারও পরীক্ষা হবে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ভোটারভিত্তি ও অর্থনৈতিক সুবিধা। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় রিপাবলিকান ভোটার এখনো বেশি। ট্রাম্পের শেষ মুহূর্তের প্রচার যদি তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে জনমত জরিপের পূর্বাভাস পালটে যেতে পারে।
অর্থাৎ, এবারের নির্বাচনের মূল লড়াই শুধু কোন দল কত আসন পাবে, তা নিয়ে নয়; বরং কোন দল নিজেদের সমর্থকদের বেশি সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে নিতে পারবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ক্ষমতার সমীকরণ।
ডেমোক্র্যাটরা যদি ভার্জিনিয়া, পেনসিলভ্যানিয়া ও মেইনের মতো রাজ্যে প্রত্যাশিত ফল পায়, দক্ষিণে টেক্সাস ও ফ্লোরিডায় চমক দেখায় এবং মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে শ্রমজীবী ভোটারদের সমর্থন ফেরাতে পারে, তাহলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সিনেটেও অপ্রত্যাশিত সাফল্যের সুযোগ তৈরি হবে। আর কানসাস, নেব্রাস্কা, সাউথ ডাকোটা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও আলাস্কার মতো রাজ্যে জয় এলে তা হবে ঐতিহাসিক ব্লু ওয়েভ।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটারকে কেন্দ্রে আনতে পারে এবং নিজেদের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখতে পারে, তাহলে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য অগ্রযাত্রা থেমে যেতে পারে। ফলে রিপাবলিকানদের জন্য এবার ভালো ফল বলতে ঐতিহাসিক বিপর্যয় এড়াতে পারাকেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান, সিএনএন, এবিসি নিউজ, রয়টার্স, এপি






-b3e939.jpg)



















