ইরান লস অ্যাঞ্জেলেস-সান দিয়েগো ধ্বংস করলেও ক্ষতি নেই— বলেই তোপের মুখে ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
সোমবার নেব্রাস্কার নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
সোমবার নেব্রাস্কার নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপের প্রসঙ্গ টেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বড় শহর লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নেব্রাস্কায় এক নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লেও তা ‘ছোট মূল্য’, এমনকি ইরান কোনো মার্কিন শহর ‘ধ্বংস’ করলেও তা মেনে নেওয়া যেতে পারে। তার এ বক্তব্যের পর ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম, দুই শহরের মেয়র এবং এক রিপাবলিকান রাজনীতিকও এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।

গার্ডিয়ান ও সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার রাতে নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে সমর্থকদের সমাবেশে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় জয়ের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছিলেন ট্রাম্প। এ সময় ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে। ট্রাম্প বলেন, এসব মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখার জন্য ‘ছোট মূল্য’।

এরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘তারা একটি শহরকে ধ্বংস করে দিতে পারে। লস অ্যাঞ্জেলেসকে ধ্বংস করতে দাও। সান দিয়েগোকেও ধ্বংস করতে দাও।’ সমাবেশে উপস্থিত সমর্থকদের কাছ থেকে এ বক্তব্যের পর করতালি শোনা যায়। ট্রাম্প একই সঙ্গে দাবি করেন, ইরান যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে।

লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগো যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই ক্যালিফোর্নিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই দাপট দেখিয়ে আসছে ডেমোক্র্যাটরা। সবশেষ নির্বাচনেও এ রাজ্যে ডেমোক্র্যাটরাই জয় পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাটদের ‘আস্তানা’ হয়ে ওঠার কারণেই এই রাজ্যের উল্লেখযোগ্য দুটি শহরকে ধ্বংস করলেও কিছু যায় আসে না বলে মনে করতে পারেন রিপাবলিকান ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এ বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর অবশ্য ছাড় পাননি। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। গভর্নর গ্যাভিন নিউসম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় ন্যাশনাল গার্ড ও মেরিন সেনা পাঠানোর পর এখন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোতে হামলা চালানোর কথা বলছেন। তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দেন।

নিউসম আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট কার্যত এক কোটির বেশি মার্কিন নাগরিকের ওপর হামলার কথা বলছেন। তার ভাষায়, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেশের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, তাদের জীবনকে যুদ্ধের ‘ছোট মূল্য’ হিসেবে বিবেচনা করা নয়।

লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাসও ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই যখন একটি বিদেশি সরকারকে লস অ্যাঞ্জেলেসে হামলার সম্ভাবনার কথা বলেন, তখন তা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ এবং শহরের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, প্রেসিডেন্টের ভূমিকা হওয়া উচিত দেশকে রক্ষা করা, মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলাকে উৎসাহিত করা নয়।

সান দিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়াও একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, সান দিয়েগোর মানুষ কোনো যুদ্ধের ‘কোল্যাটেরাল ড্যামেজ’ নয় এবং তাদের জীবন কোনোভাবেই ‘ছোট মূল্য’ হতে পারে না। তিনি ট্রাম্পকে শহরটিকে তার ‘বেপরোয়া যুদ্ধের বক্তব্য’ থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানান।

এমনকি ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকানের এক রাজনীতিকও তার বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা রিপাবলিকান জিম ডেসমন্ড বলেন, তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যের সঙ্গে ‘দৃঢ়ভাবে একমত নন’।

ডেসমন্ডের বক্তব্য, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, কিন্তু কমান্ডার ইন চিফের প্রথম দায়িত্ব হলো মার্কিন জনগণ ও দেশের ভূখণ্ডকে সুরক্ষা দেওয়া। কোনো মার্কিন শহরই ‘ত্যাজ্য’ নয় এবং কোনো পরিবারকে ‘কোল্যাটেরাল ড্যামেজ’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্পের প্রায় দেড় ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তব্যের ওই অংশটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন ব্যাখ্যাও তৈরি হয়েছে। কিছু রক্ষণশীল সমর্থক বলছেন, ট্রাম্প মূলত যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াকে ‘ছোট মূল্য’ হিসেবে বোঝাতে চেয়েছেন। তাদের মতে, তিনি সরাসরি ইরানকে মার্কিন শহরে হামলা চালানোর আহ্বান জানাননি।

তবে তার ব্যবহৃত ‘তারা একটি শহরকে ধ্বংস করে দিতে পারে— লস অ্যাঞ্জেলেসকে ধ্বংস করতে দাও, সান দিয়েগোকেও’— এই বক্তব্যের সরাসরি অর্থ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

এ বক্তব্যের আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে— ট্রাম্প কি সম্ভাব্য কোনো মার্কিন লক্ষ্য সম্পর্কে গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন, নাকি এটি ছিল রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ হিসেবে বলা অতিরঞ্জিত মন্তব্য? মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এর আগে বলেছেন, ইরানের কাছে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতা নেই।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ট্রাম্প বহুবার মার্কিন শহরগুলোর নিরাপত্তার কথা বলেছেন। এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে। এবারও তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কথা বলেছেন এবং একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য হামলার প্রসঙ্গ তুলেছেন।

নির্বাচনের এক মাস আগে নতুন বিতর্ক

ট্রাম্পের এ মন্তব্য এসেছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। নেব্রাস্কার সমাবেশে তিনি সমর্থকদের এমনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান, যেন ব্যালটে তার নিজের নামই রয়েছে। রাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থী স্টিভ হিলটন গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধের প্রশ্নেই নয়, নির্বাচনি রাজনীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির উচ্চ দাম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেভিয়ার বেসেরা বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগো কাউন্টিতে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস করেন। তাদের জীবন কোনোভাবেই ‘ছোট মূল্য’ নয় এবং রাজনৈতিক বক্তৃতার পাঞ্চলাইনও নয়।

এদিকে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগো— দুটিই ক্যালিফোর্নিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর। লস অ্যাঞ্জেলেস যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর এবং সান দিয়েগো অষ্টম। সান দিয়েগোতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোও রয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement