
বিবিসি বাংলা

ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করতে যে সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হয়েছিল, শুক্রবার রাতে তা ভোটাভুটিতে পরাজিত হয়েছে। ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় এই সংবিধান সংশোধনী বিল এনেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার।
নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের এই প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হতো, আর তার জন্য সভার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দরকার ছিল।
তবে সেই সংখ্যক ভোট পেতে ভারতের ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট ব্যর্থ হয়েছে। বিলটির পক্ষে ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়েছে।
সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, বাকি দুটি সংশোধনী বিল নিয়ে আর অগ্রসর না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংসদে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ প্রদানকারী আইনের সংশোধন এবং নির্বাচনি আসনের সীমানা নির্ধারণ সম্পর্কিত বিলগুলো নিয়ে শাসক ও বিরোধী সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিতর্কের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় বিরোধীদের জবাব দেন এবং তারপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়।
লোকসভায় বিতর্ক চলাকালীনই প্রায় আড়াই বছর আগে পাশ হয়ে যাওয়া নারী সংরক্ষণ আইনটি হঠাৎ করেই কার্যকর করে দেওয়া হয় বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থেকে। এই আইনে সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে, সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬-এ বলা হয়েছে যে, আসন সংরক্ষণ কার্যকর করা হবে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ভিত্তিতে।
এই পদক্ষেপের বিরোধীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কেবল বর্তমানের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের জন্যই করা উচিত, সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে সৃষ্ট বর্ধিত আসনগুলোর জন্য নয়।
অমিত শাহের নিশানায় বিরোধীরা
সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে বিতর্কের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অভিযোগ করেছেন যে বিরোধী দল নারী সংরক্ষণের বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, "ইন্ডিয়া জোটের সকল সদস্যই নানা রকম অজুহাত দেখিয়ে নারী সংরক্ষণের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছেন। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে যে, আমাদের লক্ষ্যের চেয়ে বরং আমাদের বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিরুদ্ধে রয়েছেন বিরোধীরা।"
অমিত শাহ বলেন, "এই বিলের উদ্দেশ্য হলো নারীর ক্ষমতায়ন। কিছু সংসদীয় আসনে ৩৯ লক্ষ ভোটার রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্য কীভাবে এত মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন?
"যারা আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে তারা তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধিরও বিরোধিতা করছেন। সংবিধানে আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে," মন্তব্য অমিত শাহের।
তিনি বলেন, "কিছু মানুষ উত্তর-দক্ষিণ বিভেদের আখ্যান তৈরি করছে। তারা বলছে যে দক্ষিণ ভারতের আসন সংখ্যা কমে যাবে। অন্য যেকোনো অঞ্চলের মতোই দক্ষিণ ভারতেরও সংসদে সমান অধিকার রয়েছে। এই ব্যক্তিরা একটি অহেতুক আখ্যান ছড়াচ্ছেন।"
অমিত শাহ বিরোধীদের আরও আক্রমণ করে বলেছেন, "বিরোধী দলের সদস্যরা এখানকার হট্টগোল থেকে রেহাই পাবেন, কিন্তু মা-বোনেদের রোষ থেকে রেহাই পাবেন না। যখন তারা নির্বাচনি লড়াইয়ে নামবেন, তখন বেরোনোর কোনো পথ খুঁজে পাবেন না।"
অমিত শাহ বলেন যে কংগ্রেস 'অন্যান্য অনগ্রসর জাতি' বা ওবিসিদের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
তিনি বলেন, "কংগ্রেস চৌধুরী চরণ সিং এবং সীতারাম কেশরীকে তাদের কাজ শেষ করতে দেয়নি। ১৯৫৭ সালে, ওবিসিদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়ে কাকা কালেলকর কমিটির সুপারিশগুলো চাপা দেওয়া হয়েছিল।
"১৯৮০ সালে, মন্ডল কমিশনের সুপারিশগুলো চাপা দেওয়া হয়েছিল। মন্ডল কমিশনের সুপারিশগুলো ভিপি সিং-এর আমলে বাস্তবায়িত হয়েছিল। রাজীব গান্ধী মন্ডল কমিশনের বিরোধিতা করে একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৫১ এবং ১৯৭১ সালের জাতিগত আদমশুমারির বিরোধিতা করেছিলেন," মন্তব্য অমিত শাহের।
তিনি বলেন, "এখন কংগ্রেস হারছে বলে তারা অনগ্রসর শ্রেণির কথা বলছে। কংগ্রেস একজনও অনগ্রসর শ্রেণির প্রধানমন্ত্রী তৈরি করতে পারেনি। বিজেপি চরম অনগ্রসর শ্রেণির নেতা নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে।"
'দেশের নির্বাচনি মানচিত্র পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা'
নারী সংরক্ষণ আইন এবং সীমানা নির্ধারণ কমিশন বিলের ওপর ভোটের আগে লোকসভায় বিতর্কের সময় বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, "প্রথম সত্যটি হলো, এটি কোনো নারী সংরক্ষণ বিল নয়।"
তিনি বলেন যে নারী সংরক্ষণ বিলটি ২০২৩ সালে পাশ হয়েছিল।
রাহুল গান্ধী বলেন, "এই বিলটি দেশের নির্বাচনি মানচিত্র পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা। এই বিলটি তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির বিরুদ্ধে, এর উদ্দেশ্য হলো তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া।"
এই বিলের সঙ্গে নারী ক্ষমতায়নের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন রাহুল গান্ধী। তার মতে, বিজেপি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, "এই বিলটি দেশবিরোধী। আমরা সরকারকে এটা করতে দেবো না। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতে বৈষম্য করা হচ্ছে। দলিত ও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ কমছে।"
রাহুল গান্ধী বলেন, "নারীরা আমাদের জাতীয় চেতনার চালিকাশক্তি। আমরা সবাই আমাদের জীবনে নারীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি এবং তাদের কাছ থেকে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি।"
প্রবল বিরোধিতা 'ইন্ডিয়া' জোটের
লোকসভায় বিতর্কের সময়ে সংখ্যার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন 'ইন্ডিয়া' জোটের অন্তর্ভুক্ত বিরোধী দলের সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিতর্কে অংশ নিয়ে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, "যখন বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন, তখন হঠাৎ তিনি একটি বিশেষ অধিবেশন ডেকে বসলেন। এভাবে বিরোধীদের আলোচনা করার সময়ও দিলেন না। আবার বিরোধীদের রাজনীতির ঊর্ধে উঠে দেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করার কথা বলেন।"
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কথা শুনে সংসদেই মুচকি হেসে ফেলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তা দেখে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, "আমি একদম ঠিক বলেছি বলেই উনি হাসছেন।"
কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে জানানো হয়েছে যে তারা নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ সমর্থন করলেও ডিলিমিটেশনের সঙ্গে এটিকে জুড়ে দেওয়ার বিরোধী।
"নারী সংরক্ষণের বিষয়টি ডিলিমিটেশনের সঙ্গে জুড়ে দিলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধ হবে। তখন বিরোধীরা নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার বলবে যে বিরোধীরা নারীদের অধিকার হরণ করতে চায়," ১৬ই এপ্রিল রাতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ ও ডেরেক ও'ব্রায়ান।
ডিলিমিটেশনের বিরোধিতায় রাজ্যবাসীকে ইতোমধ্যেই কালো পতাকা তোলার অনুরোধ করেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন।
তামিলনাড়ুর শাসক দল ডিএমকের সংসদ সদস্য কানিমোঝি করুণানিধি সংসদে বলেন, "ভারতের ইতিহাসে যতবার ডিলিমিটেশন হয়েছে, তার সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল। যেহেতু উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে এই সাফল্য আসেনি, তাই ইন্দিরা গান্ধী ও অটল বিহারী বাজপেয়ী— উভয় সরকারই ডিলিমিটেশন হতে দেয়নি। আসন সংখ্যা স্থির করে দিয়েছিল।"
কানিমোঝি করুণানিধি পরিসংখ্যান দেখিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, "এই বিল আইনে পরিণত হলে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলো অধিক সুবিধা পাবে। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য থাকা স্বত্বেও তামিলনাড়ুকে বঞ্চিত করা হবে আসন সংখ্যার নিরিখে প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে।"
কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের বক্তব্য, "কার্যত, ভারতীয় নারীদের স্বপ্নগুলো আমাদের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। ভবিষ্যতের ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ায়, যে রাজ্যগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলো অধিকতর রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করবে। আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি এই বার্তাই দিতে চাই যে, উন্নততর শাসনের ফলে রাজনৈতিক গুরুত্বহীনতা দেখা দেয়?"
এই দুদিন সব বিরোধী দলই নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণকে নৈতিকভাবে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যেভাবে এটিকে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে সেটি সমর্থন করেন না তারা।
ডিলিমিটেশন কেন করা হয়?
'সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬'-এ প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, নিম্নকক্ষে সর্বোচ্চ ৮৫০টি আসন থাকবে, যার মধ্যে ৮১৫টি আসন হবে বিভিন্ন রাজ্যের এবং ৩৫টি আসন হবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর।
বর্তমানে লোকসভায় সদস্য সংখ্যা ৫৪৩ জন এবং সংবিধান অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ সদস্যসীমা ৫৫০-এ নির্ধারিত রয়েছে।
সরকারের এই প্রস্তাবের বিরোধীরা বলছেন যে, শুধুমাত্র ৫৪৩টি আসনেই ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া উচিত, আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সেগুলোতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া নয়।
এই বিলে সংবিধানের ৮১তম অনুচ্ছেদ সংশোধনেরও প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে লোকসভার আসন সংখ্যাকে স্থির বা 'ফ্রিজ' করে রাখার সিদ্ধান্তটি বাতিল করার কথা বলা হয়েছিল।
ডিলিমিটেশন বিলে বলা হয়েছিল, কোন সালের আদমশুমারিকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হবে সেটা পার্লামেন্ট ঠিক করবে। এই বিষয়টি নিয়ে সংসদের বিরোধী সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের বক্তব্য, আসন বন্টন করতেই হলে, সর্বশেষ আদমশুমারির ভিত্তিতেই আসন ভাগ করা উচিৎ। তা না হলে ক্ষমতাসীন দল নিজের রাজনৈতিক সুবিধা মতো ভবিষ্যৎ আদমশুমারির বছর নির্বাচন করে সেটাকেই ডিলিমিটেশন ও নারী আসন-সংখ্যার ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবে।
ভারতে ১০ বছর অন্তর আদমশুমারি করা হয়। শেষ আদমশুমারিটি হয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু তার পর ২০২১ সালে আর আদমশুমারি হয়নি। সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের অনেকটা অংশ জুড়ে চলবে আদমশুমারির কাজ। অর্থাৎ বর্তমানে ভারতে জনবিন্যাস সম্পর্কে অনেক ধারণাই দেড় দশক পুরনো।
এই বিল দুটি যেহেতু সংবিধান সংশোধনী বিল, তাই পাশ করার জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা আবশ্যক। অর্থাৎ শাসকদল একা এই বিল পাশ করতে পারত না। অন্যান্য দলের একটি বড় অংশের সমর্থন দরকার ছিল তাদের।
তবে সেই সমর্থন জোটাতে ব্যর্থ হল সরকার।

ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করতে যে সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হয়েছিল, শুক্রবার রাতে তা ভোটাভুটিতে পরাজিত হয়েছে। ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় এই সংবিধান সংশোধনী বিল এনেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার।
নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের এই প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হতো, আর তার জন্য সভার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দরকার ছিল।
তবে সেই সংখ্যক ভোট পেতে ভারতের ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট ব্যর্থ হয়েছে। বিলটির পক্ষে ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়েছে।
সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, বাকি দুটি সংশোধনী বিল নিয়ে আর অগ্রসর না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংসদে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ প্রদানকারী আইনের সংশোধন এবং নির্বাচনি আসনের সীমানা নির্ধারণ সম্পর্কিত বিলগুলো নিয়ে শাসক ও বিরোধী সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিতর্কের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় বিরোধীদের জবাব দেন এবং তারপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়।
লোকসভায় বিতর্ক চলাকালীনই প্রায় আড়াই বছর আগে পাশ হয়ে যাওয়া নারী সংরক্ষণ আইনটি হঠাৎ করেই কার্যকর করে দেওয়া হয় বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থেকে। এই আইনে সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে, সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬-এ বলা হয়েছে যে, আসন সংরক্ষণ কার্যকর করা হবে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ভিত্তিতে।
এই পদক্ষেপের বিরোধীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কেবল বর্তমানের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের জন্যই করা উচিত, সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে সৃষ্ট বর্ধিত আসনগুলোর জন্য নয়।
অমিত শাহের নিশানায় বিরোধীরা
সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে বিতর্কের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অভিযোগ করেছেন যে বিরোধী দল নারী সংরক্ষণের বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, "ইন্ডিয়া জোটের সকল সদস্যই নানা রকম অজুহাত দেখিয়ে নারী সংরক্ষণের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছেন। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে যে, আমাদের লক্ষ্যের চেয়ে বরং আমাদের বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিরুদ্ধে রয়েছেন বিরোধীরা।"
অমিত শাহ বলেন, "এই বিলের উদ্দেশ্য হলো নারীর ক্ষমতায়ন। কিছু সংসদীয় আসনে ৩৯ লক্ষ ভোটার রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্য কীভাবে এত মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন?
"যারা আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে তারা তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধিরও বিরোধিতা করছেন। সংবিধানে আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে," মন্তব্য অমিত শাহের।
তিনি বলেন, "কিছু মানুষ উত্তর-দক্ষিণ বিভেদের আখ্যান তৈরি করছে। তারা বলছে যে দক্ষিণ ভারতের আসন সংখ্যা কমে যাবে। অন্য যেকোনো অঞ্চলের মতোই দক্ষিণ ভারতেরও সংসদে সমান অধিকার রয়েছে। এই ব্যক্তিরা একটি অহেতুক আখ্যান ছড়াচ্ছেন।"
অমিত শাহ বিরোধীদের আরও আক্রমণ করে বলেছেন, "বিরোধী দলের সদস্যরা এখানকার হট্টগোল থেকে রেহাই পাবেন, কিন্তু মা-বোনেদের রোষ থেকে রেহাই পাবেন না। যখন তারা নির্বাচনি লড়াইয়ে নামবেন, তখন বেরোনোর কোনো পথ খুঁজে পাবেন না।"
অমিত শাহ বলেন যে কংগ্রেস 'অন্যান্য অনগ্রসর জাতি' বা ওবিসিদের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
তিনি বলেন, "কংগ্রেস চৌধুরী চরণ সিং এবং সীতারাম কেশরীকে তাদের কাজ শেষ করতে দেয়নি। ১৯৫৭ সালে, ওবিসিদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়ে কাকা কালেলকর কমিটির সুপারিশগুলো চাপা দেওয়া হয়েছিল।
"১৯৮০ সালে, মন্ডল কমিশনের সুপারিশগুলো চাপা দেওয়া হয়েছিল। মন্ডল কমিশনের সুপারিশগুলো ভিপি সিং-এর আমলে বাস্তবায়িত হয়েছিল। রাজীব গান্ধী মন্ডল কমিশনের বিরোধিতা করে একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৫১ এবং ১৯৭১ সালের জাতিগত আদমশুমারির বিরোধিতা করেছিলেন," মন্তব্য অমিত শাহের।
তিনি বলেন, "এখন কংগ্রেস হারছে বলে তারা অনগ্রসর শ্রেণির কথা বলছে। কংগ্রেস একজনও অনগ্রসর শ্রেণির প্রধানমন্ত্রী তৈরি করতে পারেনি। বিজেপি চরম অনগ্রসর শ্রেণির নেতা নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে।"
'দেশের নির্বাচনি মানচিত্র পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা'
নারী সংরক্ষণ আইন এবং সীমানা নির্ধারণ কমিশন বিলের ওপর ভোটের আগে লোকসভায় বিতর্কের সময় বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, "প্রথম সত্যটি হলো, এটি কোনো নারী সংরক্ষণ বিল নয়।"
তিনি বলেন যে নারী সংরক্ষণ বিলটি ২০২৩ সালে পাশ হয়েছিল।
রাহুল গান্ধী বলেন, "এই বিলটি দেশের নির্বাচনি মানচিত্র পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা। এই বিলটি তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির বিরুদ্ধে, এর উদ্দেশ্য হলো তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া।"
এই বিলের সঙ্গে নারী ক্ষমতায়নের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন রাহুল গান্ধী। তার মতে, বিজেপি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, "এই বিলটি দেশবিরোধী। আমরা সরকারকে এটা করতে দেবো না। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতে বৈষম্য করা হচ্ছে। দলিত ও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ কমছে।"
রাহুল গান্ধী বলেন, "নারীরা আমাদের জাতীয় চেতনার চালিকাশক্তি। আমরা সবাই আমাদের জীবনে নারীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি এবং তাদের কাছ থেকে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি।"
প্রবল বিরোধিতা 'ইন্ডিয়া' জোটের
লোকসভায় বিতর্কের সময়ে সংখ্যার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন 'ইন্ডিয়া' জোটের অন্তর্ভুক্ত বিরোধী দলের সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিতর্কে অংশ নিয়ে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, "যখন বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন, তখন হঠাৎ তিনি একটি বিশেষ অধিবেশন ডেকে বসলেন। এভাবে বিরোধীদের আলোচনা করার সময়ও দিলেন না। আবার বিরোধীদের রাজনীতির ঊর্ধে উঠে দেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করার কথা বলেন।"
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কথা শুনে সংসদেই মুচকি হেসে ফেলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তা দেখে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, "আমি একদম ঠিক বলেছি বলেই উনি হাসছেন।"
কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে জানানো হয়েছে যে তারা নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ সমর্থন করলেও ডিলিমিটেশনের সঙ্গে এটিকে জুড়ে দেওয়ার বিরোধী।
"নারী সংরক্ষণের বিষয়টি ডিলিমিটেশনের সঙ্গে জুড়ে দিলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধ হবে। তখন বিরোধীরা নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার বলবে যে বিরোধীরা নারীদের অধিকার হরণ করতে চায়," ১৬ই এপ্রিল রাতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ ও ডেরেক ও'ব্রায়ান।
ডিলিমিটেশনের বিরোধিতায় রাজ্যবাসীকে ইতোমধ্যেই কালো পতাকা তোলার অনুরোধ করেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন।
তামিলনাড়ুর শাসক দল ডিএমকের সংসদ সদস্য কানিমোঝি করুণানিধি সংসদে বলেন, "ভারতের ইতিহাসে যতবার ডিলিমিটেশন হয়েছে, তার সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল। যেহেতু উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে এই সাফল্য আসেনি, তাই ইন্দিরা গান্ধী ও অটল বিহারী বাজপেয়ী— উভয় সরকারই ডিলিমিটেশন হতে দেয়নি। আসন সংখ্যা স্থির করে দিয়েছিল।"
কানিমোঝি করুণানিধি পরিসংখ্যান দেখিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, "এই বিল আইনে পরিণত হলে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলো অধিক সুবিধা পাবে। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য থাকা স্বত্বেও তামিলনাড়ুকে বঞ্চিত করা হবে আসন সংখ্যার নিরিখে প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে।"
কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের বক্তব্য, "কার্যত, ভারতীয় নারীদের স্বপ্নগুলো আমাদের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। ভবিষ্যতের ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ায়, যে রাজ্যগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলো অধিকতর রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করবে। আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি এই বার্তাই দিতে চাই যে, উন্নততর শাসনের ফলে রাজনৈতিক গুরুত্বহীনতা দেখা দেয়?"
এই দুদিন সব বিরোধী দলই নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণকে নৈতিকভাবে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যেভাবে এটিকে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে সেটি সমর্থন করেন না তারা।
ডিলিমিটেশন কেন করা হয়?
'সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬'-এ প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, নিম্নকক্ষে সর্বোচ্চ ৮৫০টি আসন থাকবে, যার মধ্যে ৮১৫টি আসন হবে বিভিন্ন রাজ্যের এবং ৩৫টি আসন হবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর।
বর্তমানে লোকসভায় সদস্য সংখ্যা ৫৪৩ জন এবং সংবিধান অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ সদস্যসীমা ৫৫০-এ নির্ধারিত রয়েছে।
সরকারের এই প্রস্তাবের বিরোধীরা বলছেন যে, শুধুমাত্র ৫৪৩টি আসনেই ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া উচিত, আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সেগুলোতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া নয়।
এই বিলে সংবিধানের ৮১তম অনুচ্ছেদ সংশোধনেরও প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে লোকসভার আসন সংখ্যাকে স্থির বা 'ফ্রিজ' করে রাখার সিদ্ধান্তটি বাতিল করার কথা বলা হয়েছিল।
ডিলিমিটেশন বিলে বলা হয়েছিল, কোন সালের আদমশুমারিকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হবে সেটা পার্লামেন্ট ঠিক করবে। এই বিষয়টি নিয়ে সংসদের বিরোধী সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের বক্তব্য, আসন বন্টন করতেই হলে, সর্বশেষ আদমশুমারির ভিত্তিতেই আসন ভাগ করা উচিৎ। তা না হলে ক্ষমতাসীন দল নিজের রাজনৈতিক সুবিধা মতো ভবিষ্যৎ আদমশুমারির বছর নির্বাচন করে সেটাকেই ডিলিমিটেশন ও নারী আসন-সংখ্যার ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবে।
ভারতে ১০ বছর অন্তর আদমশুমারি করা হয়। শেষ আদমশুমারিটি হয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু তার পর ২০২১ সালে আর আদমশুমারি হয়নি। সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের অনেকটা অংশ জুড়ে চলবে আদমশুমারির কাজ। অর্থাৎ বর্তমানে ভারতে জনবিন্যাস সম্পর্কে অনেক ধারণাই দেড় দশক পুরনো।
এই বিল দুটি যেহেতু সংবিধান সংশোধনী বিল, তাই পাশ করার জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা আবশ্যক। অর্থাৎ শাসকদল একা এই বিল পাশ করতে পারত না। অন্যান্য দলের একটি বড় অংশের সমর্থন দরকার ছিল তাদের।
তবে সেই সমর্থন জোটাতে ব্যর্থ হল সরকার।

ইরান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক মন্তব্যকে সরাসরি ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের একের পর এক দাবির প্রতিক্রিয়ায় সব দাবিই ‘ভিত্তিহীন’ বলে জানিয়েছে তেহরান।
৫ ঘণ্টা আগে
পাকিস্তানের জাতীয় ভূকম্পন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪৪ মিনিটে রাজধানীসহ পেশওয়ার, সোয়াত, চিত্রাল ও মালাকান্দসহ অন্তত ডজনখানেক শহরে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। গভীর উৎপত্তিস্থল হওয়ায় ভূমিকম্পটি বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
৬ ঘণ্টা আগে
নির্বাচনি জনসভা থেকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে আর যাই হোক, গরুর মাংস খাওয়া চলবে না। অনেকেই মনে করছেন, মেরূকরণের রাজনীতিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতেই গরুর মাংসকে হাতিয়ার করছে গেরুয়া শিবির।
৮ ঘণ্টা আগে
প্রেসিডেন্ট আউন জানান, তারা এখন এমন এক ধাপে প্রবেশ করেছে যেখানে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি স্থায়ী চুক্তিতে উপনীত হতে হবে। যা দেশের জনগণের অধিকার, ভূমির অখণ্ডতা এবং জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে।
৯ ঘণ্টা আগে