রাশিয়া-ইউক্রেনে হ্যাকারদের হানা, সতর্কতা অ্যাপ থেকে ছড়াল ভুয়া পারমাণবিক হামলার বার্তা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
রাশিয়া ও ইউক্রেনে জরুরি সতর্কর্তা অ্যাপে পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়েছে হ্যাকাররা। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়া ও ইউক্রেনে জরুরি সতর্কর্তা অ্যাপে পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়েছে হ্যাকাররা। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা জানানোর মোবাইল অ্যাপে সাইবার হামলা চালিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ভুয়া বার্তা ছড়িয়েছে হ্যাকাররা। দুই দেশের অ্যাপেই বিমান হামলা, রাসায়নিক অস্ত্রের আক্রমণ ও পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এমনকি রাশিয়ার অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিক পারমাণবিক ওয়ারহেড নিয়ে হামলা চালিয়েছে বলেও ভুয়া বার্তা ছড়ানো হয় ইউক্রেনে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে দুই দেশের জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থায় রোববার (১ নভেম্বর) রাতে এমন সাইবার হামলার ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে কারা এই হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। এর আগে যুদ্ধ চলাকালে দুপক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাইবার হামলার ঘটনায় সক্রিয়তাবাদী হ্যাকার গোষ্ঠী ও গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে।

খবরে বলা হয়, রোববার রাত ১১টার কিছু আগে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় দেশটির বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপে ভুয়া বার্তা আসতে শুরু করে। এসব বার্তায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া, রাসায়নিক হামলা এবং কোনো কোনো এলাকায় সড়কে লড়াইয়ের আশঙ্কা জানানো হয়। একটি বার্তায় বলা হয়, রাশিয়া পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম হাইপারসনিক ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং দেশে পারমাণবিক সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনী টেলিগ্রামে জানায়, সতর্কতা ব্যবস্থাটি শত্রুপক্ষের সাইবার হামলার শিকার হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, সতর্কবার্তাগুলো রুশ ভাষায় প্রচার করা হয়েছে, অথচ ইউক্রেনে সব সরকারি যোগাযোগে ইউক্রেনীয় ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

বিমানবাহিনী জানায়, তেজস্ক্রিয়তার কোনো হুমকি নেই। নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক বার্তা অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিটি সতর্কবার্তার বিপরীতে বিপদ কেটে যাওয়ার বার্তা পাঠানো হয়। ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রণালয় জানায়, অ্যাপটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সাইরেনসহ জনসাধারণকে সতর্ক করার অন্যান্য ব্যবস্থা সচল ছিল।

ভুয়া বার্তায় আতঙ্কিত হননি কিয়েভের বাসিন্দারা

কিয়েভের বাসিন্দাদের অনেকেই প্রথমে বিস্মিত হলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, সতর্কবার্তাগুলো ভুয়া হতে পারে। ৩৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আর্তেম পিন্দিক জানান, বার্তাগুলো দেখে প্রথমে কিছুটা চমকে গেলেও পরে বিষয়টি বুঝতে পারেন। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি জানতে পারেন, কেউ আতঙ্কিত হননি।

পিন্দিক বলেন, সমাজে হ্যাকাররা যে ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে চেয়েছিল, তা হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করা গেলেও তারা যে অ্যাপটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশ করে সেটি হ্যাক করতে পেরেছে, তা উদ্বেগজনক।

৪৮ বছর বয়সী পিৎজার দোকানের কর্মী ওকসানা ভস্ত্রিকোভাও জানান, তিনি শুরু থেকেই বার্তাগুলোকে ভুয়া বলে সন্দেহ করেছিলেন। নিজের চেয়ে আশপাশে থাকা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েই তার উদ্বেগ বেশি ছিল।

রাশিয়ার অ্যাপেও পারমাণবিক হামলার ভুয়া বার্তা

ইউক্রেনের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, দেশটির জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের মোবাইল অ্যাপেও সাইবার হামলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বরাতে সংস্থাটি জানায়, হ্যাকাররা অ্যাপটির মাধ্যমে ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়েছে।

ইউক্রেনপন্থি হ্যাকার গোষ্ঠী আতেশ সোমবার সকালে নিজেদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে রাশিয়ার অ্যাপে পাঠানো একটি সতর্কবার্তার স্ক্রিনশট প্রকাশ করে। সেখানে তারা দাবি করে, জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের অ্যাপটি হ্যাক করা হয়েছে।

হ্যাকারদের ছড়ানো বার্তায় দাবি করা হয়, রাশিয়ার সব অঞ্চলে পারমাণবিক ওয়ারহেড ছোড়া হয়েছে। নাগরিকদের তিন সপ্তাহের খাবার মজুত করে বেজমেন্টে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়। বার্তাটিতে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলকে অবমাননাকর ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে সেটি সরকারি কোনো বিজ্ঞপ্তির অনুকরণে তৈরি ছিল না।

তবে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয় হামলার প্রভাবকে গুরুত্বহীন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। তাদের ভাষ্য, অ্যাপটি জনসাধারণকে সতর্ক করার প্রধান মাধ্যম নয়, বরং তথ্য সরবরাহের একটি অতিরিক্ত উৎস। অ্যাপটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন বলেও জানানো হয়। একই সঙ্গে নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

এ ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি ছোট এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটিই ছিল দুপক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ স্থানীয় যুদ্ধবিরতি।

এদিকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরের সংকট প্রকট। শুক্রবার ইউক্রেনকে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সরবরাহে ২১০ কোটি ডলারের চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে পৌঁছাতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে বলে সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad