ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন মেরামত, ফের হরমুজের বিকল্প পথে তেল রপ্তানি সৌদির

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
হরমুজ প্রণালিকে বাইপাস করে তেল সরবরাহে সৌদি আরবের পাইপলাইন। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিকে বাইপাস করে তেল সরবরাহে সৌদি আরবের পাইপলাইন। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে আবারও রপ্তানি শুরু হয়েছে। ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত শেষে পাইপলাইনটি চালু করেছে সৌদি আরামকো। এর ফলে পারস্য উপসাগর এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি অপরিশোধিত তেল পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ পথটি আবার সচল হলো।

সৌদি গেজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বরের ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মেরামতের কাজ শেষ হওয়ার পর আরামকো গত সপ্তাহে পাইপলাইনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও চাপ পরীক্ষা করে। এরপর রোববার থেকে লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবু থেকে রপ্তানির জন্য জাহাজে তেল তোলা শুরু হয়।

প্রাথমিকভাবে অবশ্য পাইপলাইনটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে ডাও জোন্স জানিয়েছে, বর্তমানে এতে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। এর একটি অংশ সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের শোধনাগারগুলোতে যাবে। অর্থাৎ পাইপলাইন চালু হলেও এর সর্বোচ্চ সক্ষমতার পুরোটা এখনই আন্তর্জাতিক রপ্তানিতে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের নামমাত্র সক্ষমতা প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল। পূর্বাঞ্চলের আবকাইক থেকে প্রায় ১২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছেছে। সাধারণ সময়ে পাইপলাইনটির প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পশ্চিমাঞ্চলের শোধনাগারগুলোতে যায়। ফলে বাকি সক্ষমতা প্রয়োজন অনুযায়ী রপ্তানিতে ব্যবহার করা সম্ভব।

হরমুজের বিকল্প কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় সৌদি আরবকে তার তেল রপ্তানির পথ পুনর্বিন্যাস করতে হয়। সেই পরিস্থিতিতে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি তেলের জন্য কার্যত একটি হরমুজ-বাইপাস রুটে পরিণত হয়।

এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের তেল সরাসরি লোহিত সাগরে নেওয়া যায়। ফলে পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজে তেল নিয়ে হরমুজ পার হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যুদ্ধের সময় এই বিকল্প রুট সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রয়টার্সের হিসাবে, পাইপলাইনটি সচল থাকলে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ এড়িয়ে পরিবহন করা সম্ভব, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।

কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বরের ড্রোন হামলা সেই বিকল্প ব্যবস্থাকেও বড় ধাক্কা দেয়। সৌদি আরব হামলার জন্য ইরাকভিত্তিক মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে। হামলার পর নিরাপত্তার কারণে পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলায় কয়েকজন আহত হন এবং জরুরি ও বিশেষায়িত কারিগরি দল পাইপলাইন নিরাপদ করা ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ শুরু করে।

হামলার পর বদলে যায় সৌদির রপ্তানি কৌশল

পাইপলাইন বন্ধ থাকায় সৌদি আরবকে আবার পারস্য উপসাগরীয় টার্মিনালগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে হরমুজ দিয়ে সৌদি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইয়ানবু থেকে রপ্তানি কমে যাওয়ায় এই পরিবর্তন আসে।

এর অর্থ— পাইপলাইন আবার চালু হলেও সৌদি আরব এখনই হরমুজের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে ফেলতে পারছে না। বরং দুই পথই ব্যবহার করে সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। উপসাগরীয় জলপথে ঝুঁকি অব্যাহত থাকায় কোন পথে কত পরিমাণ তেল পাঠানো হবে, সেটিই এখন বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পাইপলাইনটি পুরো সক্ষমতায় ফিরতেও সময় লাগবে। রয়টার্সের ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হামলায় পাইপলাইনের ১১টি পাম্পিং স্টেশনের মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো ৭০ লাখ ব্যারেল সক্ষমতায় ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তেলের বাজারে কী প্রভাব

পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়ার খবর এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত। সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি পথ সচল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে হরমুজে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, ইয়েমেনে হুতিদের তৎপরতা এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা এখনো বাজারকে অস্থির করে রাখছে।

সোমবার সৌদি গেজেট যখন পাইপলাইন দিয়ে আবার রপ্তানি শুরুর খবর দেয়, সেদিন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে ছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের অবসান নিয়ে মতপার্থক্যও বজায় ছিল। ফলে পাইপলাইন চালু হওয়াকে বাজারের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হলেও, এটি একাই বৈশ্বিক তেল সরবরাহ সংকটের সমাধান করছে না।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement