মক্কা জোটের প্রথম পরীক্ষা: হুতিদের সঙ্গে সৌদির যুদ্ধে নামছে পাকিস্তান-তুরস্ক?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০: ৫৭
উপকূল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হুতিরা এখন কৌশলগত পাহাড়ি এলাকা দখলের চেষ্টায় রয়েছে। ছবি: হুতি মিলিটারি মিডিয়া/ রয়টার্স
উপকূল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হুতিরা এখন কৌশলগত পাহাড়ি এলাকা দখলের চেষ্টায় রয়েছে। ছবি: হুতি মিলিটারি মিডিয়া/ রয়টার্স

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধ যখন সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানছে, তখন রিয়াদে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক প্রধানরা। মাত্র দেড় মাস আগে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এবারই প্রথম বড় বাস্তব পরীক্ষার মুখে।

আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুক্রবার নিশ্চিত করেছে, দেশটির চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারওগ্লু সৌদি আরব যাচ্ছেন। পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও শিগগির রিয়াদে পৌঁছাবেন বলে জানা গেছে। তবে পাকিস্তানের সামরিক জনসংযোগ বিভাগ আইএসপিআর এখনো তার যাত্রা নিশ্চিত করেনি।

এই বৈঠকের পেছনে রয়েছে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। বৃহস্পতিবার হুতিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। তাদের দাবি, রিয়াদের একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তু’ এবং ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনাও হামলার আওতায় ছিল।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তায়েফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ঠেকানো হয়েছে। মক্কা, জেদ্দা ও ইয়ানবুতেও জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়।

এই পরিস্থিতিতে ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল প্রতিশ্রুতিই এখন সামনে এসেছে— সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্কের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রতিশ্রুতি কি সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে পাকিস্তান ও তুরস্ককে সৌদি আরবের পাশে দাঁড় করাবে?

এখনো তার উত্তর ‘হ্যাঁ’ নয়। তবে রিয়াদে সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠক দেখাচ্ছে, বিষয়টি আর কেবল কূটনৈতিক ঘোষণার পর্যায়ে নেই।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর দেশগুলোর সামরিক প্রধানদের বৈঠকের উদ্যোগ সামনে আসে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বৈঠক করেন।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে তিন দেশের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়।

একই বিবৃতিতে মক্কা ও সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানানো হয়। রিয়াদ জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের অধীনে আত্মরক্ষার অধিকারও পুনর্ব্যক্ত করে।

কিন্তু একই বৈঠক নিয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সংযত।

ইসহাক দার এক্সে লেখেন, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোর অধীনে আমরা চুক্তিটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিনিময় করেছি।’

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বৈঠকটিকে চুক্তির ‘কারিগরি আলোচনা’ এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করে।

অথচ এর কয়েক দিন আগে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সরাসরি।

তুরস্কের সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভিকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের চুক্তিতে জোটগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আমরা আমাদের কথার পাশে থাকব।’

তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের সামরিক প্রয়োজন যদি বিশেষ করে কারিগরি কোনো ক্ষেত্রে হয়, তাহলে তুরস্ক তা পূরণ করতে প্রস্তুত।

অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক ভাষায় এখনো ‘যুদ্ধে যোগ দেওয়া’র ঘোষণা নেই; কিন্তু আঙ্কারা যে সৌদির নিরাপত্তা সংকটকে চুক্তির আওতার মধ্যে দেখছে, ফিদানের বক্তব্যে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

হুতিদের অগ্রগতি, সৌদির উদ্বেগ

সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু সীমান্তে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রেও গত কয়েক দিনে হুতিরা বড় ধরনের অগ্রগতি করেছে।

ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে। এরপর লোহিত সাগরের প্রায় পুরো উপকূল এবং কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে গেছে।

এর ফলে বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব আরও বেড়েছে।

এই জলপথের গুরুত্ব এখন আরও বেশি। হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরব উপসাগরের বাইরে তেল পাঠাতে লোহিত সাগরের রুটের ওপর বেশি নির্ভর করছে। সেই রুটের প্রবেশপথ বাব এল-মান্দেব।

অর্থাৎ হুতিদের অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট তৈরি করছে।

এই সপ্তাহে হুতিরা ইয়েমেনের উচ্চভূমির দিকেও অগ্রসর হয়েছে। সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াইও তীব্র হয়েছে।

আর এই অগ্রগতির মধ্যেই হুতিরা পাকিস্তান ও তুরস্ককেও সরাসরি সতর্ক করেছে।

হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি চলতি সপ্তাহে একটি ইরাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেছেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক যুদ্ধে প্রবেশ করলে তাদের ‘লোহার মুষ্টি’ দিয়ে মোকাবিলা করা হবে।

ফলে সৌদির পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত পাকিস্তান ও তুরস্কের জন্য শুধু মিত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি পালটা হামলার ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে।

পাকিস্তান-তুরস্কের নিজেরও সীমাবদ্ধতা

ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন মনে করেন, চুক্তির দুই পক্ষেরই সামরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তার ভাষায়, ‘সেনা পাঠানো কঠিন হবে। কারণ বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ হুমকির কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এমনিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যস্ত।’

পাকিস্তানের জন্য আফগানিস্তান সীমান্তের সংঘাত, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা এবং দেশের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা— সব মিলিয়ে নতুন কোনো বড় সামরিক ফ্রন্টে সেনা পাঠানো সহজ নয়।

তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের হিসাব রয়েছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তুরস্কের একাধিক সামরিক দায়বদ্ধতা আছে। সিরিয়া সীমান্তও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

তাই সৌদি আরবকে সহায়তা করার অর্থ যে বিপুলসংখ্যক তুর্কি বা পাকিস্তানি সেনা ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে— এমন সিদ্ধান্ত এখনো দেখা যাচ্ছে না।

বরং সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিকস, কারিগরি সহায়তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সরঞ্জাম সরবরাহের মতো বিকল্পগুলো আগে বিবেচনায় আসতে পারে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও মক্কা চুক্তির আওতায় গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিকস বা গোলাবারুদ সহায়তার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে উন্নত সামরিক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

চুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়

এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও রয়ে গেছে।

তুরস্কের পার্লামেন্টের স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ শুক্রবার জানিয়েছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনো সংসদের অনুমোদনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়নি। ১ অক্টোবর সংসদের অবকাশ শেষ হলে এটি জমা দেওয়া হবে বলে তিনি আশা করছেন।

তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদের অনুমোদন ছাড়া কার্যকর হয় না।

অর্থাৎ সৌদি আরব যখন চুক্তির সামরিক প্রতিশ্রুতি সক্রিয় করার জন্য চাপ দিচ্ছে, তখন তুরস্কের ক্ষেত্রে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই এখনো শেষ হয়নি।

তবে তুর্কি পার্লামেন্ট স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ চুক্তিটিকে কোনোভাবেই ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে দেখছেন না।

তার বক্তব্য, ভবিষ্যতে এটি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো হয়ে উঠতে পারে এবং ইরানও এতে যোগ দিতে পারে।

অর্থাৎ আঙ্কারার প্রকাশ্য অবস্থান হলো— বর্তমান সংকটে সৌদির নিরাপত্তার পাশে দাঁড়ানো হলেও দীর্ঘমেয়াদে মক্কা চুক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোটে পরিণত করার লক্ষ্য নেই।

রিয়াদে কেন এত তাড়া?

সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বক্তব্য অবশ্য ক্রমেই কঠোর হচ্ছে।

দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ আল-ফাওজান হুতিদের বিরুদ্ধে ‘ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হুতিদের ‘বিভ্রান্ত ও বিপথগামী গোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, দেশের সীমান্ত রক্ষা এমন একটি দায়িত্ব, ‘যার জন্য জীবন ও আত্মা উৎসর্গ করা হয়।’

এর কয়েক দিন আগে বাদশাহ সালমানও হুতিদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, হুতিরা আবারও মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করেছে। জেদ্দায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোকে লক্ষ্য করা গুরুতর লঙ্ঘন।

ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলির মতে, গ্র্যান্ড মুফতির বক্তব্যের মূল লক্ষ্য সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ জনমত ও সেনাদের মধ্যে যুদ্ধের জন্য সমর্থন জোরদার করা।

তার ভাষায়, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধকে ধর্মীয় ভিত্তি দেওয়া হলে সামরিক সদস্যদের ত্যাগ স্বীকারকে গ্রহণযোগ্য করা সহজ হয়।

তবে পাকিস্তান ও তুরস্কের ক্ষেত্রে এই বক্তব্যের প্রভাব মূলত রাজনৈতিক ও প্রতীকী। দুই দেশই আগে থেকেই সৌদির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত এবং ধর্মীয় সংহতির ভাষা তাদের অবস্থানকে জোরদার করতে পারে; কিন্তু এতে চুক্তির আনুষ্ঠানিক শর্ত বদলায় না।

এক আঞ্চলিক কূটনীতিকও বলেছেন, সৌদি জনগণ হুতিদের হুমকি সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। নিয়মিত সাইরেন বাজছে, আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা এখন তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ।

তার মতে, গ্র্যান্ড মুফতির বক্তব্যের মধ্যে আরও বড় একটি বার্তাও আছে— সৌদি সরকার ও ধর্মীয় নেতৃত্ব জনগণকে এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করছে, যা দ্রুত শেষ হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না।

পাকিস্তানের জন্য সৌদি মিশন নতুন নয়

সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্কও বহু পুরোনো।

মক্কা চুক্তির দুই দিন আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নওমান মাহমুদকে চুক্তির প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

রিয়াদে গড়ে ওঠা চুক্তির সাধারণ সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবেন তিনি।

তুঘরাল ইয়ামিনের ভাষায়, ‘বাস্তবিক অর্থে পাকিস্তান এখন তিন তারকা পদমর্যাদার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলকে রিয়াদে পাঠিয়েছে যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য। তার সামনে কাজ হবে দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা এবং কিছু বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা।’

তার দাবি, সৌদি আরবে পাকিস্তানের উপদেষ্টা, প্রশিক্ষক, লজিস্টিকস কর্মকর্তা ও কারিগরি কর্মী আগে থেকেই রয়েছেন।

এপ্রিলেও সৌদি আরব নিশ্চিত করেছিল, পূর্বাঞ্চলের কিং আবদুলআজিজ বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানের একটি সামরিক দল পৌঁছেছে— যার সঙ্গে যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমান ছিল।

গত সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত সৌদি-পাকিস্তান স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্টের আওতায় ওই মোতায়েন করা হয়েছিল। সে সময় সৌদি আরব ইরানের হামলার মুখে ছিল।

১৯৬৭ সাল থেকে পাকিস্তান হাজার হাজার সৌদি সামরিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকেই সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে সৌদির পূর্বাঞ্চলের তেল অবকাঠামো সুরক্ষার দায়িত্বও ছিল।

অর্থাৎ নতুন চুক্তি পাকিস্তানের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো সামরিক সম্পর্ক তৈরি করেনি; বরং পুরোনো সম্পর্ককে একটি বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

সৌদি জোটে যুক্ত হচ্ছে ব্রিটেন-ফ্রান্সও

রিয়াদ এখন শুধু পাকিস্তান ও তুরস্কের দিকে তাকিয়ে নেই। ফ্রান্স ও ব্রিটেনও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ব্রিটেন চলতি সপ্তাহে সৌদি যুদ্ধবিমানকে প্রতিরক্ষামূলক মিশনে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করতে সম্মত হয়েছে।

আর ফ্রান্স শুক্রবার জানিয়েছে, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ইয়ানবুর প্রধান তেল টার্মিনাল পাহারা দিতে তারা সেনা পাঠাচ্ছে।

ইয়ানবু এখন সৌদি আরবের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে উপসাগরীয় রুটে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর লোহিত সাগরের এই বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে রিয়াদ।

ফলে ইয়ানবুকে লক্ষ্য করে হামলা হলে সেটি শুধু সৌদি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হবে না; দেশটির বিকল্প তেল রপ্তানি ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করবে।

সৌদির সমস্যা শুধু হুতি নয়, যুদ্ধের কাঠামোও

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলির মতে, সৌদি আরবের মূল সমস্যা সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি নয়।

‘সৌদি আরবের সম্পদ, বিমানশক্তি এবং বহু বছরের বৈদেশিক সহায়তা রয়েছে,’ বলেন তিনি। ‘আসল সমস্যা হলো ইয়েমেনের মাটিতে বিভক্ত ও বহু পক্ষের একটি জোট।’

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সামরিক সম্পৃক্ততার কারণে ইয়েমেনে সৌদি আরবকে এখন বেশি অপারেশনাল চাপ নিজের কাঁধে নিতে হচ্ছে। এতে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে।

অন্যদিকে হুতিরা একই সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে স্থলযুদ্ধ এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

এ কারণেই সৌদি আরব এখন একসঙ্গে কয়েকটি স্তরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছে— নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো অংশীদারদের সক্রিয় করা এবং ব্রিটেন-ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা নেওয়া।

মোখা হারালেও যুদ্ধ শেষ হয়নি

সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর জন্য মোখার পতন বড় ধরনের লজিস্টিক ও অপারেশনাল ধাক্কা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক আঞ্চলিক কূটনীতিক।

তবে তার মতে, এটিকে হুতিদের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

‘লড়াই যতটা মনে করা হয়, তার চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ,’ বলেন তিনি। সৌদি-সমর্থিত জোট মোখায় বড় ধরনের লজিস্টিক ও অপারেশনাল ধাক্কা খেলেও অন্যান্য ফ্রন্টে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘একটি লড়াই হয়তো হেরে যাওয়া গেছে, কিন্তু যুদ্ধ এখনো নির্ধারিত হয়নি।’

তবে হুতিদের সক্ষমতা নিয়ে তার সতর্কবার্তাও স্পষ্ট।

হুতিরা সৌদি আরবের বেসামরিক ও সামরিক— দুই ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা ও ইচ্ছা দেখিয়েছে এবং অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে।

সৌদি আরবও তাই দীর্ঘস্থায়ী ও আরও তীব্র হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে মক্কা জোট?

সব মিলিয়ে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব সামরিক সিদ্ধান্তের দূরত্ব দ্রুত কমছে।

রিয়াদে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠক হচ্ছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে জোটের মহাসচিব হিসেবে একজন অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেলকে নিয়োগ করেছে। তুরস্ক সৌদির সামরিক প্রয়োজন মেটানোর প্রস্তুতির কথা বলছে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তায় এগিয়ে এসেছে।

কিন্তু একই সময়ে তিনটি বড় প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই।

প্রথমত, পাকিস্তান ও তুরস্ক কি শুধু প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিকস ও কারিগরি সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সরাসরি সেনা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম পাঠাবে?

দ্বিতীয়ত, হুতিরা যদি পাকিস্তান বা তুরস্কের সামরিক স্থাপনা বা স্বার্থে হামলা চালায়, তখন মক্কা চুক্তির ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’ নীতি কীভাবে প্রয়োগ হবে?

তৃতীয়ত, ইয়েমেনের যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সৌদির পক্ষে দাঁড়ানো অংশীদারদের সামরিক ও রাজনৈতিক খরচ কতটা বাড়বে?

এই মুহূর্তে কোনো প্রশ্নেরই চূড়ান্ত উত্তর নেই।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন আর কেবল কাগজে থাকা একটি নতুন আঞ্চলিক জোট নয়। হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলা এবং ইয়েমেনে বদলে যাওয়া যুদ্ধের গতিপথ চুক্তিটিকে তার ঘোষণার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই বাস্তব পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

আর রিয়াদের আসন্ন সামরিক বৈঠকেই প্রথমবার বোঝা যেতে পারে— সৌদির জন্য ‘আমরা পাশে আছি’ বলার সীমা কোথায় শেষ হয়, আর সত্যিকারের যুদ্ধে পাশে দাঁড়ানোর শুরু কোথা থেকে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement