ফ্রান্সে ‘অবৈধ’ বিক্ষোভ নিষিদ্ধের ঘোষণা ম্যাখোঁর

ফ্রান্সে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সহিংসতার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ‘অবৈধ’ বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। বলেছেন, বৈধ কর্তৃত্ব বা স্বীকৃত সংগঠনের অনুমোদন ছাড়া আয়োজিত বিক্ষোভ আগামী কয়েক দিনে নিষিদ্ধ করা হবে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর ম্যাখোঁ এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ট্রেড ইউনিয়নের মতো স্বীকৃত সংগঠনগুলো বিক্ষোভ আয়োজন করলে আইন অনুযায়ী তাদের আবেদন পর্যালোচনা করা হবে। সেসব কর্মসূচি অনুমোদন পেলেও প্রয়োজনে নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করে দেওয়া হতে পারে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, শহরের কেন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে এই ব্যবস্থা প্রয়োজন। নিয়মগুলোকে ‘সহজ এবং সাধারণ বোধবুদ্ধির বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আগামী কয়েক দিনে বিক্ষোভ না করার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান ম্যাখোঁ। বলেন, ‘অগ্রাধিকার হলো শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা।’
শনিবারের বিক্ষোভ নিয়ে কড়াকড়ি
ম্যাখোঁর ঘোষণা এসেছে শনিবার নতুন করে ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেওয়ার পর। শুক্রবার প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে বসে শনিবার ও পরবর্তী দিনগুলোর সম্ভাব্য বিক্ষোভ মোকাবিলায় পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবেন তিনি।
এরই মধ্যে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁর কেন্দ্রস্থলে শনিবার ‘সব ধরনের বিক্ষোভ’ নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে শহরটিতে ২০০ থেকে ৩০০টি দোকান লুটপাট করা হয় এবং পর্যটন দপ্তরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
মার্সেই, নিস ও তুলোঁতেও শনিবারের জন্য একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসে অবশ্য বাস্তিল চত্বর থেকে শনিবার পূর্বাঞ্চলীয় একটি এলাকায় যাওয়ার নির্ধারিত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সেটিকে শহরের কেন্দ্রের দিকে যেতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কয়েকজন সদস্যের অংশগ্রহণে রাজধানীতে আলাদা একটি মিছিলের পরিকল্পনা ছিল। সেটি অনুমোদন পায়নি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ফ্রান্স জুড়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন।
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফও শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে জানালা-দরজা কাঠ দিয়ে বন্ধ করতে শুরু করেছে। অনেক ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীও নিয়োগ করছেন বলে জানিয়েছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম।
আদালতে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা বাতিল
বৃহস্পতিবার প্যারিসে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছিল পুলিশ। তবে আদালত সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে ম্যাখোঁ সরকারের ‘বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ’ নীতির সঙ্গে জনসমাবেশের অধিকার নিয়ে আইনি প্রশ্নও সামনে এসেছে।
একই দিনে গ্রেনোবল, রুয়াঁ, ল্য হাভর ও তুলোঁতে নির্ধারিত কয়েকটি মিছিল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর মধ্যে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এলিসি প্রাসাদ, পার্লামেন্ট ভবন ও রাজধানীর প্রধান রেলস্টেশনগুলোর আশপাশের এলাকা রয়েছে। কয়েকটি শহরে রাতের আংশিক কারফিউও জারি করা হয়েছে।
সহিংসতার দায় কার?
গত সপ্তাহের বিক্ষোভ ও পরবর্তী লুটপাটের জন্য ম্যাখোঁ মূলত দুই ধরনের গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, কিছু মানুষ শুরু থেকেই লুটপাটের উদ্দেশ্যে রাস্তায় নেমেছিল। আর সবচেয়ে গুরুতর সহিংসতার পেছনে ছিল ‘অতি-বামপন্থি’ গোষ্ঠীগুলোর ‘রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড’।
ম্যাখোঁর ভাষ্য, এসব গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ছিল ‘প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করা’।
তবে আন্দোলনের শুরুটা ছিল অন্য ইস্যুতে। গত মাসে প্যারিসের দক্ষিণপূর্বে ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীর ঘাটতি ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ধর্মঘট, সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় গত সপ্তাহের বিক্ষোভে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন শহরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফলে সরকার এখন আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিকেও সামনে আনছে।
গ্রেপ্তার আড়াই হাজার, হেফাজতে ১৭৪
ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের দাঙ্গার পর এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭৪ জনকে হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং ৯০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারপ্রক্রিয়া চলছে।
লিমোজ শহরের টাউন হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের মতামত নেওয়া এবং সহযোগিতা নিশ্চিত করাই বৈঠকের উদ্দেশ্য। পরে বড় শহরগুলোর মেয়রদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে তার।
নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
ফ্রান্সের বর্তমান অস্থিরতার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ম্যাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস আগে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।
ম্যাখোঁর প্রশাসন একদিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে অনুমোদনহীন বা ‘অবৈধ’ বিক্ষোভ ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে। শনিবারের নতুন কর্মসূচিগুলোকে কেন্দ্র করে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ আরও স্পষ্ট হবে।













-a70378-256x144.webp)




