ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার মুখে ইইউয়ের সর্বোচ্চ মানবাধিকার পুরস্কারে ভূষিত আইসিসি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপে ফেলে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক তখনই আদালতটিকে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘সাখারভ পুরস্কার’ দিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। শুধু আইসিসির কাজের স্বীকৃতি নয়, বরং এ পুরস্কারকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষায় ওয়াশিংটনের চাপের বিপরীতে ইউরোপের সমর্থনের প্রতীক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আইসিসিকে ২০২৬ সালের সাখারভ পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর এ পুরস্কার দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট।
বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে পার্লামেন্টের অধিবেশনে পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে আদালতের নাম ঘোষণা করেন পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্তা মেতসোলা। ঘোষণার সময় উপস্থিত আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে করতালি দেন।
মেতসোলা বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখতে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি এই পুরস্কার।’
আইসিসির প্রেসিডেন্ট বিচারপতি তোমোকো আকানে বলেন, আদালত ও এর কর্মকর্তারা যখন নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন এ স্বীকৃতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তার মতে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে আদালতের দায়িত্ব পালনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমর্থন অব্যাহত রাখা জরুরি।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে ইউরোপের বার্তা
আইসিসিকে এ পুরস্কার দেওয়ার ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের যোগসূত্র দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। এর লক্ষ্য আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির মুখে থাকা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধে চাপ তৈরি করা।
আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষোভের বড় কারণ, ২০২৪ সালে আদালতটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। গাজা যুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই পরোয়ানা জারি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আদালতটি মার্কিন নাগরিক ও মিত্রদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে আইসিসি তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ‘ইটের পর ইট খুলে’ আদালতটিকে ভেঙে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় মার্কিন আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ডলারের লেনদেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আদালতটি বড় বাধার মুখে পড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আইসিসির সঙ্গে কাজ করা মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সাখারভ পুরস্কার আইসিসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী সমর্থন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের স্বীকৃতি জানিয়ে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও ইউরোপের কাছে আন্তর্জাতিক আইন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব অটুট। তবে পুরস্কারটি নিজে থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে পারবে না, আদালতের কার্যক্রম সচল রাখতে আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন হবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, বিশ্বের গুরুতর অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আইসিসিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। কোনো ধরনের চাপ বা ভয়ভীতি ছাড়াই আদালতকে তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ইউরোপের অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে বলেছে, আইসিসির কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে আদালত এবং এর সঙ্গে কাজ করা ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতে ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করছে ব্রাসেলস। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কিছু প্রভাব ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করে। জাতীয় আদালত যথাযথভাবে বিচার করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হলে নির্দিষ্ট শর্তে আন্তর্জাতিক আদালতটি হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয় এবং আদালতটির এখতিয়ার ও মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে।
এবারের সাখারভ পুরস্কারের জন্য আইসিসির পাশাপাশি তানজানিয়ার বিরোধী নেতা টুন্ডু লিসু এবং ইরান সরকারের দমন-পীড়নের শিকার দুই বোন তারানেহ ও রোমিনা রহিমিও চূড়ান্ত তালিকায় ছিলেন। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে সাবেক সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী আন্দ্রেই সাখারভের নামে। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হবে ডিসেম্বরে।
আইসিসিকে ঘিরে এ স্বীকৃতি এমন সময়ে এলো, যখন আদালতের সাবেক বিচারপতি নাভি পিল্লাই এ মাসেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। তার পুরস্কারও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে আইসিসিকে সাখারভ পুরস্কার দেওয়া ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের কার্যক্রম সীমিত করতে নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিয়েছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্বাধীন বিচারপ্রক্রিয়া ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন জোরালো করছে। এখন বড় প্রশ্ন— প্রতীকী স্বীকৃতিকে বাস্তব সহায়তায় রূপান্তর করে ইউরোপ আইসিসিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য অভিঘাত থেকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে।




-01d514.jpg)








-10b8d5-256x144.webp)



