
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

বাংলা বছর বা বাংলা সন অথবা বঙ্গাব্দ— যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অহংকার। এই বাংলা সনের প্রবর্তক মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট মির্জা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। সম্রাট রাজ্যের খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১৫৫৬) হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয়ে এ নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করেন, যা প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ শিরাজী এটি তৈরি করেন এবং আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় (১৫৫৬ সাল বা ৯৬৩ হিজরি) থেকে এর গণনা শুরু হয়।
মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর সিংহাসনে আরোহণ করেন, যা হিজরি ৯৬৩ সাল। কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কাটার পর কর আদায়ের সুবিধার্থে তিনি এই নতুন সন চালু করেন। সম্রাটের নিযুক্ত জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজী হিজরি চান্দ্র বর্ষ এবং ভারতীয় সৌর বর্ষপঞ্জির সমন্বয় করে ‘তারিখ-ই-এলাহি’ বা ফসলি সন তৈরি করেন।
১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই সন প্রবর্তন করা হলেও এটি সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ বা ৯৬৩ হিজরি) থেকে কার্যকর করা হয়। ফলে শুরুর বছর থেকেই বাংলা সন ৯৬৩ বছর এগিয়ে থাকে।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হয়, কারণ ৯৬৩ হিজরি বছরের মহরম মাস বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিলেছিল। সেই হিজরি ও সৌর সনের সংমিশ্রণে তৈরি ‘ফসলি সন’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতি ও কৃষির সঙ্গে মিশে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন নামে পরিচিতি পায়।
আজকের বাংলা তারিখটা কত— প্রশ্নটি প্রায় সব বাঙালিকেই নাকানিচুবানি খাওয়ায়। বুশের ইরাক আক্রমণ, ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ নানা তথ্য জিভের ডগায়। প্লেটোর পলায়ন থেকে বেনিংটনের আত্মহত্যা— গড়গড় করে বলা যাবে ঘণ্টা দেড়েক। অথচ এই একটি প্রশ্নে অস্বস্তিতে পড়তে হয় না, এমন বাঙালি বাংলা মুলুকে খুব কমই আছে।
হাঁড়ির খবর ঘাঁটতে গেলে হয়তো তেতো অভিজ্ঞতার উদাহরণও কম পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাতে বাঙালিকে ‘বেখবর জাতি’ তকমা দেওয়া বিষম রকমের ভুল হবে। এই যে বসন্তবরণ, পহেলা বৈশাখ, মাঘ সংক্রান্তির মতো উৎসব যাপন— সে তো আর জোর-জবরদস্তিতে করানো হয় না, সদিচ্ছাতেই পালন করে বাঙালিরা।
রাজস্ব আদায়ের জন্য সম্রাটের পক্ষ থেকে চাপ আসত প্রায়ই। সাধারণ মানুষ ফসল না কেটে তো আর খাজনা দিতে পারত না। অনেকটা সে কারণেই নবাবরা পুণ্যাহের প্রবর্তন করেন। নবাবের বাড়িতে উৎসব ও খাবারদাবারের আয়োজন থাকত, আর সাধারণ মানুষ তাতে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব পরিশোধ করত।
নবাবের বাড়িতে মেহমান হিসেবে আপ্যায়িত হওয়াটা তো কম কথা নয়। রীতিমতো উৎসবে পরিণত হয়ে যায় দিনটি। নববর্ষ চালুর ইতিহাসে এই পুণ্যাহের তাৎপর্য ব্যাপক। খুব সম্ভবত ব্যবসায়ীরা সেখান থেকেই হালখাতার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
মোটামুটি সেভাবেই চলেছে ইতিহাস। ১৯৫২ সালে প্রখ্যাত জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও তার কমিটি ভারতের অন্যান্য সালের সঙ্গে বাংলা সনেও সংস্কারের প্রস্তাব করেন। ভারত সরকার তার প্রস্তাব গ্রহণ করে ১৯৫৭ সালে। সেই সংস্কারের কথা মাথায় রেখে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। কমিটির প্রধান ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।
বাংলাদেশের জন্মের পর তাজউদ্দিন আহমদ সরকারি নথিতে বাংলা তারিখের প্রথা চালু করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে তা আরও দৃঢ় হয়। অবশেষে ১৯৮৭ সাল থেকে সরকারি কাজে খ্রিষ্টাব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি বাংলা সন লেখার নির্দেশনা আসে। বাংলা ক্যালেন্ডার আধুনিকায়নে মেঘনাদ সাহা ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-এর ভূমিকা অগ্রগণ্য। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে শহীদুল্লাহ্ কমিটির প্রস্তাবনায় উন্নয়ন আনা হয়। ১৯৯৫ সালের ১৩ আগস্ট ও ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত পরপর দুই সভায় প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
মুসলমানদের আগমনের আগে ভারতের মানুষ পঞ্জিকা ব্যবহার করত। আল-বিরুনির ‘ভারততত্ত্ব’ অনুযায়ীই নানা সন প্রচলিত ছিল। উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের নামে বিক্রমাব্দ, চতুর্থ শতকের দিকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নামে গুপ্তাব্দ, উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধনের নামে হর্ষাব্দ এবং শক-ক্ষত্রপদের নামে শকাব্দ ছিল সবচেয়ে পরিচিত। তাছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক সনও ছিল।
সেন রাজাদের আমলেই বাংলার মানুষ শকাব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়। বখতিয়ার খলজির বাংলা অভিযানের পর হিজরি ও শকাব্দ— দুটিরই ব্যবহার দেখা যায়। সেই সঙ্গে ছিল পরগণাতি নামে আরেক ধরনের সাল গণনা। সেন বংশের পতনকাল থেকে এই সনের উত্থান বলে ধারণা করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ার শিলালিপিতে প্রাপ্ত সপ্তম খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকের শকাব্দসহ অন্যান্য সনের উৎস যতটা সহজে নির্ধারণ করা যায়, বঙ্গাব্দের ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা সহজ নয়। ‘বঙ্গ’ তো কোনো শাসকের নাম নয়, এটি একটি আঞ্চলিক পরিচয়— হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এক জনপদের নাম।
প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় মানুষ জীবনযাপনের তাগিদে ঋতুর হিসাব রাখত— তেমন ভাবনা স্বাভাবিক। তারপরও বঙ্গাব্দের জন্মকথায় চারজন শাসকের দাবি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে— তিব্বতের রাজা স্রং-সন, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ ও সম্রাট আকবর।
১৫৮৪ সালে— অর্থাৎ ১৫৫৬ থেকে ৯ বছর তিন মাসের ব্যবধানের কারণে ফসল ওঠার মৌসুম আসার আগেই খাজনা আদায়ের সময় চলে আসত। তাই রাজস্ব আদায় সহজ করা ও প্রজাদের কষ্ট লাঘব— এই দুইয়ের সমন্বয়ে রাজদরবারের জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত আমির ফতে উল্লাহ শিরাজী বঙ্গাব্দ উদ্ভাবন করেন।
পূর্ব প্রচলিত শকাব্দের মাস ও দিনের নামগুলো তিনি বাংলা সনে প্রায় অপরিবর্তিত রাখেন। আকবর ১৫৮৫ সাল থেকে সুবে বাংলায় পুরোপুরি বঙ্গাব্দ চালু করেন, যা স্থানীয় পরিবেশের অনুকূল ও গণউপযোগী হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ কারণে আকবরের অর্থমন্ত্রী টোডরমল কর্তৃক প্রবর্তিত ইলাহী সন পরিত্যাজ্য হয়ে বাংলা সন প্রতিষ্ঠা পায়।
বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা এই দিনটি উদ্যাপন করে পারিবারিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। ডিজিটাল যুগে এ উৎসব বিশ্ব জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়, ছবি-ভিডিও শেয়ার, ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান— সব মিলিয়ে নববর্ষের উদযাপন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে প্রযুক্তির এ অগ্রযাত্রা আমাদের যেন শেকড় থেকে আলগা না করে ফেলে। আগে যেখানে নববর্ষ মানে ছিল পারিবারিক মিলনমেলা, গ্রামীণ উৎসব ও ব্যক্তিগত উপস্থিতি; সেখানে এখন অনেকেই কেবল ভার্চুয়াল বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকেন। প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের এই ভারসাম্য বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলা নববর্ষ শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন বসন্তের দহনকাল পেরিয়ে গ্রীষ্মের উদারতায় প্রকৃতি ভরে ওঠে বিচিত্র রসাল ফলসম্ভারে। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি ফলের মুকুল সবুজ কাঁচা থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হতে শুরু করে। পহেলা বৈশাখ যেন প্রকৃতির এই রূপান্তরের প্রতীক— একটি নবযাত্রা।
বৈশাখের অর্থই যেন নতুনকে বরণ করে নেওয়া, পুরাতন ক্ষত মুছে নতুন সম্ভাবনার পথে পা বাড়ানো। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উচ্চারণ করেন— ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ এ আহ্বান কেবল ঋতু পরিবর্তনের নয়, এটি এক আত্মিক শুদ্ধি ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণেরও সংকেত।
বাংলা নববর্ষ শুধুই বর্ষপঞ্জির পাতায় একটি নতুন সংখ্যা নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত বহির্প্রকাশ। বৈশাখ আমাদের শেখায় মিলেমিশে থাকতে, নতুন করে শুরু করতে। তাই বাহ্যিক উৎসবের বাইরেও এর অন্তর্নিহিত চেতনা লালন করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব— এটি শুধু নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মিলনের প্রতীক। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে বাংলার আকাশ-বাতাস ভরে ওঠে নতুন আশায় ও আনন্দে। শহর থেকে গ্রাম— সবখানে এই দিনটি পালিত হয় উৎসবের আমেজে, যা আমাদের জাতিসত্তার রঙিন প্রকাশ।
এক সময় নববর্ষ ছিল মূলত কৃষিনির্ভর একটি উৎসব। কালের পরিক্রমায় তা হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। এখন বর্ষবরণের আয়োজনে বাংলা গান, কবিতা, লোকনৃত্য ও নাটক পরিবেশিত হয়, যা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। মূলত বাংলা নববর্ষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— আমরা এক বৃহত্তর ধারার অংশ। আমরা আলাদা কেউ নই।
প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগুক বা না লাগুক, বাংলা নববর্ষ আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঐতিহ্যের মধ্যেই আমরা নিজেদের খুঁজে পাই। নিজেকে চেনার এই প্রক্রিয়াটিই সবচেয়ে জরুরি। সময় এখন সৌহার্দ্যের, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের। সকলের শুভ হোক। শুভ নববর্ষ।
তথ্যসূত্র: শামসুজ্জামান খান (সম্পাদনা) (২০১৪)। বাংলা সন ও পঞ্জিকার ইতিহাস-চর্চা এবং বৈজ্ঞানিক সংস্কার। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
লেখক: রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলা বছর বা বাংলা সন অথবা বঙ্গাব্দ— যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অহংকার। এই বাংলা সনের প্রবর্তক মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট মির্জা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। সম্রাট রাজ্যের খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১৫৫৬) হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয়ে এ নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করেন, যা প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ শিরাজী এটি তৈরি করেন এবং আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় (১৫৫৬ সাল বা ৯৬৩ হিজরি) থেকে এর গণনা শুরু হয়।
মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর সিংহাসনে আরোহণ করেন, যা হিজরি ৯৬৩ সাল। কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কাটার পর কর আদায়ের সুবিধার্থে তিনি এই নতুন সন চালু করেন। সম্রাটের নিযুক্ত জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজী হিজরি চান্দ্র বর্ষ এবং ভারতীয় সৌর বর্ষপঞ্জির সমন্বয় করে ‘তারিখ-ই-এলাহি’ বা ফসলি সন তৈরি করেন।
১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই সন প্রবর্তন করা হলেও এটি সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ বা ৯৬৩ হিজরি) থেকে কার্যকর করা হয়। ফলে শুরুর বছর থেকেই বাংলা সন ৯৬৩ বছর এগিয়ে থাকে।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হয়, কারণ ৯৬৩ হিজরি বছরের মহরম মাস বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিলেছিল। সেই হিজরি ও সৌর সনের সংমিশ্রণে তৈরি ‘ফসলি সন’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতি ও কৃষির সঙ্গে মিশে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন নামে পরিচিতি পায়।
আজকের বাংলা তারিখটা কত— প্রশ্নটি প্রায় সব বাঙালিকেই নাকানিচুবানি খাওয়ায়। বুশের ইরাক আক্রমণ, ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ নানা তথ্য জিভের ডগায়। প্লেটোর পলায়ন থেকে বেনিংটনের আত্মহত্যা— গড়গড় করে বলা যাবে ঘণ্টা দেড়েক। অথচ এই একটি প্রশ্নে অস্বস্তিতে পড়তে হয় না, এমন বাঙালি বাংলা মুলুকে খুব কমই আছে।
হাঁড়ির খবর ঘাঁটতে গেলে হয়তো তেতো অভিজ্ঞতার উদাহরণও কম পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাতে বাঙালিকে ‘বেখবর জাতি’ তকমা দেওয়া বিষম রকমের ভুল হবে। এই যে বসন্তবরণ, পহেলা বৈশাখ, মাঘ সংক্রান্তির মতো উৎসব যাপন— সে তো আর জোর-জবরদস্তিতে করানো হয় না, সদিচ্ছাতেই পালন করে বাঙালিরা।
রাজস্ব আদায়ের জন্য সম্রাটের পক্ষ থেকে চাপ আসত প্রায়ই। সাধারণ মানুষ ফসল না কেটে তো আর খাজনা দিতে পারত না। অনেকটা সে কারণেই নবাবরা পুণ্যাহের প্রবর্তন করেন। নবাবের বাড়িতে উৎসব ও খাবারদাবারের আয়োজন থাকত, আর সাধারণ মানুষ তাতে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব পরিশোধ করত।
নবাবের বাড়িতে মেহমান হিসেবে আপ্যায়িত হওয়াটা তো কম কথা নয়। রীতিমতো উৎসবে পরিণত হয়ে যায় দিনটি। নববর্ষ চালুর ইতিহাসে এই পুণ্যাহের তাৎপর্য ব্যাপক। খুব সম্ভবত ব্যবসায়ীরা সেখান থেকেই হালখাতার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
মোটামুটি সেভাবেই চলেছে ইতিহাস। ১৯৫২ সালে প্রখ্যাত জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও তার কমিটি ভারতের অন্যান্য সালের সঙ্গে বাংলা সনেও সংস্কারের প্রস্তাব করেন। ভারত সরকার তার প্রস্তাব গ্রহণ করে ১৯৫৭ সালে। সেই সংস্কারের কথা মাথায় রেখে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। কমিটির প্রধান ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।
বাংলাদেশের জন্মের পর তাজউদ্দিন আহমদ সরকারি নথিতে বাংলা তারিখের প্রথা চালু করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে তা আরও দৃঢ় হয়। অবশেষে ১৯৮৭ সাল থেকে সরকারি কাজে খ্রিষ্টাব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি বাংলা সন লেখার নির্দেশনা আসে। বাংলা ক্যালেন্ডার আধুনিকায়নে মেঘনাদ সাহা ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-এর ভূমিকা অগ্রগণ্য। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে শহীদুল্লাহ্ কমিটির প্রস্তাবনায় উন্নয়ন আনা হয়। ১৯৯৫ সালের ১৩ আগস্ট ও ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত পরপর দুই সভায় প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
মুসলমানদের আগমনের আগে ভারতের মানুষ পঞ্জিকা ব্যবহার করত। আল-বিরুনির ‘ভারততত্ত্ব’ অনুযায়ীই নানা সন প্রচলিত ছিল। উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের নামে বিক্রমাব্দ, চতুর্থ শতকের দিকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নামে গুপ্তাব্দ, উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধনের নামে হর্ষাব্দ এবং শক-ক্ষত্রপদের নামে শকাব্দ ছিল সবচেয়ে পরিচিত। তাছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক সনও ছিল।
সেন রাজাদের আমলেই বাংলার মানুষ শকাব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়। বখতিয়ার খলজির বাংলা অভিযানের পর হিজরি ও শকাব্দ— দুটিরই ব্যবহার দেখা যায়। সেই সঙ্গে ছিল পরগণাতি নামে আরেক ধরনের সাল গণনা। সেন বংশের পতনকাল থেকে এই সনের উত্থান বলে ধারণা করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ার শিলালিপিতে প্রাপ্ত সপ্তম খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকের শকাব্দসহ অন্যান্য সনের উৎস যতটা সহজে নির্ধারণ করা যায়, বঙ্গাব্দের ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা সহজ নয়। ‘বঙ্গ’ তো কোনো শাসকের নাম নয়, এটি একটি আঞ্চলিক পরিচয়— হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এক জনপদের নাম।
প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় মানুষ জীবনযাপনের তাগিদে ঋতুর হিসাব রাখত— তেমন ভাবনা স্বাভাবিক। তারপরও বঙ্গাব্দের জন্মকথায় চারজন শাসকের দাবি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে— তিব্বতের রাজা স্রং-সন, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ ও সম্রাট আকবর।
১৫৮৪ সালে— অর্থাৎ ১৫৫৬ থেকে ৯ বছর তিন মাসের ব্যবধানের কারণে ফসল ওঠার মৌসুম আসার আগেই খাজনা আদায়ের সময় চলে আসত। তাই রাজস্ব আদায় সহজ করা ও প্রজাদের কষ্ট লাঘব— এই দুইয়ের সমন্বয়ে রাজদরবারের জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত আমির ফতে উল্লাহ শিরাজী বঙ্গাব্দ উদ্ভাবন করেন।
পূর্ব প্রচলিত শকাব্দের মাস ও দিনের নামগুলো তিনি বাংলা সনে প্রায় অপরিবর্তিত রাখেন। আকবর ১৫৮৫ সাল থেকে সুবে বাংলায় পুরোপুরি বঙ্গাব্দ চালু করেন, যা স্থানীয় পরিবেশের অনুকূল ও গণউপযোগী হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ কারণে আকবরের অর্থমন্ত্রী টোডরমল কর্তৃক প্রবর্তিত ইলাহী সন পরিত্যাজ্য হয়ে বাংলা সন প্রতিষ্ঠা পায়।
বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা এই দিনটি উদ্যাপন করে পারিবারিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। ডিজিটাল যুগে এ উৎসব বিশ্ব জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়, ছবি-ভিডিও শেয়ার, ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান— সব মিলিয়ে নববর্ষের উদযাপন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে প্রযুক্তির এ অগ্রযাত্রা আমাদের যেন শেকড় থেকে আলগা না করে ফেলে। আগে যেখানে নববর্ষ মানে ছিল পারিবারিক মিলনমেলা, গ্রামীণ উৎসব ও ব্যক্তিগত উপস্থিতি; সেখানে এখন অনেকেই কেবল ভার্চুয়াল বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকেন। প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের এই ভারসাম্য বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলা নববর্ষ শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন বসন্তের দহনকাল পেরিয়ে গ্রীষ্মের উদারতায় প্রকৃতি ভরে ওঠে বিচিত্র রসাল ফলসম্ভারে। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি ফলের মুকুল সবুজ কাঁচা থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হতে শুরু করে। পহেলা বৈশাখ যেন প্রকৃতির এই রূপান্তরের প্রতীক— একটি নবযাত্রা।
বৈশাখের অর্থই যেন নতুনকে বরণ করে নেওয়া, পুরাতন ক্ষত মুছে নতুন সম্ভাবনার পথে পা বাড়ানো। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উচ্চারণ করেন— ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ এ আহ্বান কেবল ঋতু পরিবর্তনের নয়, এটি এক আত্মিক শুদ্ধি ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণেরও সংকেত।
বাংলা নববর্ষ শুধুই বর্ষপঞ্জির পাতায় একটি নতুন সংখ্যা নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত বহির্প্রকাশ। বৈশাখ আমাদের শেখায় মিলেমিশে থাকতে, নতুন করে শুরু করতে। তাই বাহ্যিক উৎসবের বাইরেও এর অন্তর্নিহিত চেতনা লালন করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব— এটি শুধু নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মিলনের প্রতীক। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে বাংলার আকাশ-বাতাস ভরে ওঠে নতুন আশায় ও আনন্দে। শহর থেকে গ্রাম— সবখানে এই দিনটি পালিত হয় উৎসবের আমেজে, যা আমাদের জাতিসত্তার রঙিন প্রকাশ।
এক সময় নববর্ষ ছিল মূলত কৃষিনির্ভর একটি উৎসব। কালের পরিক্রমায় তা হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। এখন বর্ষবরণের আয়োজনে বাংলা গান, কবিতা, লোকনৃত্য ও নাটক পরিবেশিত হয়, যা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। মূলত বাংলা নববর্ষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— আমরা এক বৃহত্তর ধারার অংশ। আমরা আলাদা কেউ নই।
প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগুক বা না লাগুক, বাংলা নববর্ষ আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঐতিহ্যের মধ্যেই আমরা নিজেদের খুঁজে পাই। নিজেকে চেনার এই প্রক্রিয়াটিই সবচেয়ে জরুরি। সময় এখন সৌহার্দ্যের, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের। সকলের শুভ হোক। শুভ নববর্ষ।
তথ্যসূত্র: শামসুজ্জামান খান (সম্পাদনা) (২০১৪)। বাংলা সন ও পঞ্জিকার ইতিহাস-চর্চা এবং বৈজ্ঞানিক সংস্কার। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
লেখক: রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলকাতার গণমাধ্যম আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, ওড়িশা রাজ্যের তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ের সেটে রোববার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ঘটেছে এমন ঘটনা। অভিনেতার মরদেহ দিঘা হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সেখানেই তার ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
১৫ দিন আগে
ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর কণ্ঠশিল্পী, একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
১৮ দিন আগে
ঈদের উৎসবমুখর আবহে প্রেক্ষাগৃহে নতুন প্রাণ ফিরিয়েছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। বড় বাজেটের অ্যাকশনধর্মী সিনেমার ভিড়েও ভিন্নধর্মী গল্প আর শক্তিশালী অভিনয়ের জোরে সিনেমাটি দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটিকে ঘিরে চলছে ইতিবাচক আলোচনা, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বক্সঅফিসের আয়েও।
১৯ দিন আগে
বরাবরের মতোই সামাজিক অসংগতি ও গ্রামীণ জীবনের নানা সমস্যা ফুটে উঠবে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন নাট্যাংশে। এ ছাড়াও থাকছে মিউজিক্যাল ড্রামা, দর্শকদের নিয়ে বিশেষ প্রতিযোগিতা এবং বিদেশিদের অংশগ্রহণে একটি ব্যতিক্রমী পর্ব। সমসাময়িক প্রসঙ্গের পাশাপাশি বিনোদনের সব রসদ নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের পর্বটি।
২৪ দিন আগে