মতামত

বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

মো. ফেরদাউস মোবারক

১ আগস্ট থেকে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক কার্যকর করেছে, যা আগে প্রস্তাবিত ছিল ৩৭ শতাংশ। এই হ্রাসপ্রাপ্ত শুল্ক হার বাংলাদেশের জন্য কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা আনলেও ভবিষ্যতে এটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষত দেশের পোশাক-নির্ভর অর্থনীতির জন্য।

এই নতুন শুল্ক হার ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কিছুটা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে।

শুল্ক আরোপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের পণ্য ২৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ছে, পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে অতিরিক্ত জরিমানাও গুনতে হচ্ছে। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ-সমান ২০ শতাংশ শুল্ক থাকলেও, অবৈধভাবে অন্য দেশের পণ্য নিজেদের নামে পাঠানোর অভিযোগে তাদের ওপর ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর চীনা পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা সেদিকে কম ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ার ফলে ক্রেতারা বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন, কারণ এখানে শ্রম খরচ কম।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশ ৯ শতাংশ, আর বছরে বাংলাদেশ সেদেশে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পণ্য রপ্তানি করে। থাইল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে শুল্ক ৩৬ শতাংশ, সেখান থেকে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিলে বাংলাদেশ সুবিধা পেতে পারে। এই শুল্ক হ্রাস কূটনৈতিকভাবেও একটি সাফল্য, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা মুহাম্মদ ইউনুস ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। এছাড়া তুলনামূলকভাবে মাঝারি এই শুল্ক হার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতেও সহায়ক হতে পারে, কারণ অনেক ব্র্যান্ড এখন চীনের বিকল্প খুঁজছে।

তবে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। ২০ শতাংশ শুল্ক থাকা মানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। ফলে ওয়ালমার্টের মতো খুচরা বিক্রেতারা হয়তো এই বাড়তি খরচ নিজেরা নেবেন না, বরং তা ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন, এতে বিক্রি কমার ঝুঁকি থাকবে।

মোহাম্মদ হাতেম সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ববাজারে বাণিজ্য খরচ বাড়ছে, দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে সম্ভাব্য লাভও হাতছাড়া হতে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোকে বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশ যদি বড় কৌশলগত জোটের বাইরে থেকে যায়, তাহলে সে সুবিধা পাবে না। আর যেহেতু বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ রপ্তানি পোশাক নির্ভর, তাই বাজারের ওঠানামায় বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তুলনায়, ভিয়েতনাম শুধু পোশাক নয়, ইলেকট্রনিকস আর জুতা রপ্তানি করে, আর ভারতের রপ্তানি খাত আরও বৈচিত্র্যময়—ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি, এবং একইসঙ্গে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারও অনেক বড়।

শুল্ক হার ভিয়েতনামের সমান হলেও, তারা বেশি টেকসই। ভারতের রপ্তানি খাত যেমন বহুমুখী, তেমনি তারা নিজস্ব বাজার থেকেও চাহিদা সামলাতে পারে। ভিয়েতনাম শিল্পে বেশি বৈচিত্র্য এনেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রচুর পাচ্ছে।

তবে ভিয়েতনামের ওপর আরোপিত ট্রানশিপমেন্ট জরিমানা বাংলাদেশের মতো নিয়ম মেনে চলা দেশের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। আবার, ভারতের রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। সে তুলনায় বাংলাদেশ নিরপেক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে পেরেছে।

সংক্ষিপ্ত মেয়াদে বাংলাদেশের পোশাক বাজারে অংশীদারিত্ব বাড়তে পারে, তবে একটি মাত্র খাতে অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকির বিষয়। তাই নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে প্রবেশ করা জরুরি, যাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশের উচিত উচ্চমূল্যের টেক্সটাইল পণ্য—যেমন টেকনিক্যাল ফেব্রিক, টেকসই উপাদান ও হোম ফার্নিশিংস—এ নজর দেওয়া, কারণ এগুলো পশ্চিমা ভোক্তাদের চাহিদার সঙ্গে মেলে। চামড়া ও জুতার খাতেও বড় সম্ভাবনা আছে, যদি বাংলাদেশ ভিয়েতনামের মতো রপ্তানি সফলতা অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি হালকা ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল অ্যাসেম্বলিং খাতেও সুযোগ রয়েছে, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান চীনের বাইরে উৎপাদন স্থান খুঁজছে। ওষুধ শিল্পও দ্রুত বাড়ছে—স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ইতিমধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে।

এসব খাতকে এগিয়ে নিতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা দরকার—যেমনটা ভিয়েতনাম স্যামসাংয়ের সঙ্গে করছে। বাংলাদেশ যদি নিজেকে একটি টেকসই উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে তা বিশ্ব জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের দিকেও ভূমিকা রাখবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ খরচ কমাবে এবং পরিবেশ বান্ধব উৎপাদনের ধারণার সঙ্গে মানিয়ে নেবে।

বাজার বৈচিত্র্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ চীন, ভারত এবং আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য জোরদার করতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা—বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও নাইজেরিয়ায় সস্তা পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।

বাংলাদেশের উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধাকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ কাজে লাগানো এবং এরপর ‘জিএসপি প্লাস’ স্কিমে নির্বিঘ্নে রূপান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার গ্রহণ করে।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ব্যক্তি নয়, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো দুর্বলতায় উচ্চশিক্ষার মান অবনতি

শুরুতেই উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গটি আনা যাক। এ বিষয়ে আমি বৈশ্বিক কিছু প্রেক্ষাপট বা রেফারেন্স উল্লেখ করতে চাই। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাদের মতে, বৈশ্বিক মানের তুলনায় আমাদের শিক্ষার স্তর প্রায় চার শ্রেণি নিচে অবস্থান করছে। অর্থাৎ আমাদের দেশে একজন শিক্ষ

৪ দিন আগে

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার সমর্থন কেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ— অন্তর্বর্তী সরকারের রয়েছে সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট; প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা; ও ভোটারদের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতি।

৫ দিন আগে

নোবেলের এক বিশ্বকাঙাল

ভেনিজুয়েলার জনমানুষ যখন নিজ দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে রাজপথে মুখর, সেই সময়ই সে দেশের নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে নিজের নোবেল উৎসর্গ করে ষড়যন্ত্রের মুখোশ খুলে দিলেন। পুরস্কার ও তিরস্কারের পারস্পরিক ভাব-মিলনের

৭ দিন আগে

মধ্যবিত্তের পতন: রাষ্ট্রের অদৃশ্য হৃদযন্ত্রের থমকে যাওয়া

ইতিহাস প্রমাণ করে, পশ্চিম ইউরোপে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতির কারণে রাজনৈতিক সংহতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সুসংগঠন বজায় ছিল (Tocqueville, ১৯৫১)। বিপরীতে, মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দ্রুতই ঝুঁকির মুখে পড়ে। মধ্যবিত্তের শক্ত অবস্থান রাষ্ট্রকে দীর্ঘমে

৯ দিন আগে