মতামত

সিগারেটের মহামারি

ওবায়দুল হক আকাশ
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৫, ১১: ০২

রংচটা জিন্সের প্যান্ট পরা, জ্বলন্ত সিগারেট হাতে ধরা কিংবা কোনো নায়ক বা মহানায়কের সিগারেট খাওয়ার দৃশ্য বা পাইপ টানার স্টাইল—এগুলো আবহমানকাল থেকে অনেক যুবককে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত স্মার্ট ছেলেরা, এমনকি সুন্দরী মেয়েরাও এর বাইরে নয়।

একটি চলচ্চিত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা থাকা সত্ত্বেও আমরা ফ্যাশন হিসেবে বেছে নিলাম সিগারেট। মানুষ অনুকরণপ্রিয়। সে আদিকাল থেকেই অনুকরণ করছে।

এই ছোট্ট ঢাকা শহর—যেখানে ৪ কোটি মানুষের বাস—এর অলিতে-গলিতে, ফুটপাতে, রিকশাওয়ালা, এমনকি কখনো কখনো রিকশার যাত্রী, ট্যাক্সিওয়ালা, মোটরবাইক চালক, পিছনের সঙ্গী বা যাত্রী—সবার হাতেই সিগারেট। বহু হাই অফিসিয়াল কর্পোরেট বসও সুযোগ পেলেই অফিস থেকে নিচে নেমে পড়েন ধূমপানের জন্য।

অনেক ধার্মিক ব্যক্তিকেও দেখা যায় মুখে বড় দাড়ি, অথচ হাতে সিগারেট। অথচ কোনো ধর্মেই নেশার কোনো বৈধতা নেই। মুরুব্বীরাও এর বাইরে নন। তাঁদের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ কাজ করে না।

আমরা যদি একটু লক্ষ্য করি, তাহলে হয়তো এর মূল কারণ খুঁজে পাবো। আর তা হলো—কিভাবে আমাদের চরিত্রের রূপ নেয়।

Let’s watch ourselves:

• Our thoughts transform into actions

• Our actions become our habits

• Our habits later on become our character

অর্থাৎ—

  • আসুন আমরা নিজেদের দেখি।
  • আমাদের চিন্তাগুলো কর্মে রূপান্তরিত হয়।
  • আমাদের কর্মগুলো অভ্যাসে পরিণত হয়।

আমাদের অভ্যাসগুলো পরবর্তীতে আমাদের চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়।

সিগারেট আমাদের চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে। সিগারেট খান এমন অনেকেই আছেন যারা মানুষ হিসেবে খুব ভালো এবং দায়িত্ববান। আসলে মানুষ অভ্যাসের দাস। পৃথিবীতে প্রতি চারজনের একজন সিগারেট/বিড়ি বা তামাক সেবন করেন। তাঁরা জানেন এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তারপরও কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে ধূমপান করেন।

জনাব আব্দুর রহিম দীর্ঘ ৩৫ বছর সিগারেট খান। তিনি একজন কর্পোরেট বড় কর্মকর্তা, সদালাপী ভালো মনের মানুষ। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—আপনি সিগারেট কেন খান? তিনি সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেননি। বরং হাসতে হাসতে বলেছিলেন—“এমনি খাই। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে খাই, মন খারাপ হলে খাই, বন্ধুদের সাথে দেখা হলে খাই, মন ভালো থাকলে বা কোনো খুশির সংবাদে খাই।”

তার মানে জনাব আব্দুর রহিম সিগারেট খান এমনি এমনি। ফলাফল—বয়স ৫০ না হতেই হার্টে ব্লক। এখন অবশ্য তিনি সিগারেট ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

প্রফেসর ডা. কামরুল ইসলাম, কার্ডিওলজিস্ট, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের চিকিৎসক, বলেন—“ধূমপান হৃদপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। এমনকি Obstructive Pulmonary Disease (COPD), Emphysema, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসে ক্যান্সার, প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সার, ল্যারিংস ও মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়।”

ডব্লিউএইচও’র তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১.৫০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সিগারেট খান। বিড়ি খান ৫৩ লাখ মানুষ। ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করেন। প্রতিদিন সিগারেট খাওয়া হয় ১২ কোটি ৩০ লাখ, আর বিড়ি ৭ কোটি ২০ লাখ। এভাবে দৈনিক ১৯ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি সিগারেট ও বিড়ির অবশিষ্টাংশ পরিবেশে মিশে দূষণ ঘটায়।

সিগারেটের ফিল্টার দেখতে কাগজের মতো হলেও এটি এক ধরনের প্লাস্টিক। এটি পচনশীল হলেও দীর্ঘ সময় লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন—ফিল্টারের সঙ্গে থাকে নিকোটিন, বেনজিন, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু। সিগারেট ও বিড়ির অবশিষ্টাংশ মাটি ও পানিতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুজীব ধ্বংস করে। এতে পানি ও মাটির ক্ষতি সাধিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার Tobacco Atlas এর হিসাবে, বাংলাদেশের ৩১ শতাংশ বন ধ্বংসের কারণ তামাক। উন্নয়ন বিকল্পের নীতি গবেষণা অনুযায়ী, এক মৌসুমে প্রতি তন্দুরের জন্য লাগে ২৪০ মণ কাঠ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় তামাক গ্রহণের কারণে। এর মধ্যে ১২ লাখ মানুষ প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। শিশু থেকে বয়স্ক—সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। গর্ভবতী মায়েরাও সিগারেটের ধোঁয়ায় নানা জটিলতায় ভুগছেন।

সিগারেটের পরোক্ষ ধোঁয়ায় সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যার মধ্যে ৭০টি ক্যান্সার সৃষ্টি করে। কেবল পরোক্ষ ধূমপানের কারণে আমাদের দেশে প্রতিবছর ৬৫ হাজার শিশু মারা যাচ্ছে।

প্রতি বছর ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন করা হয়। ১৯৭৪ সালে জেনেভা কনভেনশনে মাদকবিরোধী চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে।

২০২০–২১ অর্থবছরে বিভিন্ন তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও, এর কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগ, অকাল মৃত্যু, শিশু মৃত্যু, পরিবেশের ক্ষতি, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, চিকিৎসার জন্য বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়—কোনোটাই আমাদের পক্ষে যায় না। বরং এর ব্যয় রাজস্ব আয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতির হিসাব আমাদের অজানা। আর এই সুযোগটাই ব্যবহার করছে বিভিন্ন বহুজাতিক ও দেশীয় তামাক কোম্পানি।

এটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তাই আসুন—তামাককে না বলি। এর জন্য আপনার একটি ইচ্ছাই যথেষ্ট। আর তা হলো—“আমি সিগারেট/বিড়ি/জর্দা খাব না।” এবং ঘরে ঘরে এর প্রতিরোধ শুরু হওয়া দরকার নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে।

লেখক: কবি ও গীতিকার

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে