মোদির পতন এখনই নয়, তবে পরিবর্তন স্পষ্ট

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ভারতের মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা। ২৪ জুলাই ২০২৬। ফাইল ছবি: এএফপি
ভারতের মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা। ২৪ জুলাই ২০২৬। ফাইল ছবি: এএফপি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতার অবসান এখনই ঘটবে, এমন সম্ভাবনা নেই। তবে তার দীর্ঘদিনের অজেয় ভাবমূর্তি ও দক্ষ প্রশাসকের পরিচয়ে চিড় ধরেছে। একসময় দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এখন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছে। সব মিলিয়ে ভারতের রাজনীতিতে পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে গত ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন সাংবাদিক লিডিয়া পোলগ্রিন। তিনি সংবাদমাধ্যমটির কলামিস্ট এবং ‘ম্যাটার অব ওপিনিয়ন’ পডকাস্টের সহ-সঞ্চালক। ‘Lessons From the Shattering of Modi’s Aura’ শীর্ষক ওই মতামত নিবন্ধে পোলগ্রিন লিখেছেন, ২০২৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনে মোদিকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে না। তা সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক অবস্থান আগের মতো অটুট নেই।

পোলগ্রিন লিখেছেন, বিশাল, বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ ভারতের রাজনীতি সব সময়ই কোলাহলপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। পোলগ্রিনের মতে, ভারতের সমাজে ধর্ম, জাতপাত ও সামাজিক অবস্থানভিত্তিক বৈষম্যও দীর্ঘদিনের। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরও এসব বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে।

তবে ভারতের প্রথম এবং একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার স্বল্পকালীন ব্যতিক্রম ছাড়া ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রায় আট দশক ধরে দেশটির সাংবিধানিক গণতন্ত্র টিকে আছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তা তৈরি হয়েছে গণতন্ত্রের দুটি মৌলিক স্তম্ভ— পরীক্ষা ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

রাজনীতিবিজ্ঞানী প্রতাপ ভানু মেহতা বলেছেন, পরীক্ষা দেওয়া ও নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার ব্যক্তির ক্ষমতায়ন এবং নাগরিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পরীক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ পান। অন্যদিকে নির্বাচন নাগরিককে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের অধিকার দেয়।

সাংবাদিক পোলগ্রিন লিখেছেন, ভারতের সংবিধানে জাতপাত, আত্মীয়তা ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক নাগরিকের সমান রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গত ১২ বছরে সংবিধানের প্রতিশ্রুত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় স্বার্থের নামে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এখন নতুন প্রজন্মের একটি অংশ সেই গণতান্ত্রিক অধিকার ও মূল্যবোধ রক্ষায় আবারও সোচ্চার হচ্ছে।

দিল্লি থেকে তিরানা, মিলান থেকে মাদ্রিদ— বিভিন্ন শহরের তরুণেরা প্রতিবাদে রাস্তায় নামছেন। ভারতের তরুণেরাও এই প্রতিবাদী প্রজন্মের অংশ। তাদের আন্দোলন বলছে, দেশটি এখনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা হারায়নি। আর সেই পরিবর্তনের পথে তরুণেরা নতুন নেতৃত্বের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারেন।

তরুণদের প্রতিবাদে মোদির অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ক্ষমতাধর নেতা নরেন্দ্র মোদির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ২০ বছর বয়সী এক তরুণী— মদিনা মজুমদার। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষার্থীকে দেখে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার মতো কাউকে মনে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তিনি এখন কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতিবাদের অন্যতম মুখ।

অক্টোবরের শুরুর দিকে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে একটি বিক্ষোভস্থলের কাছে মদিনার সঙ্গে দেখা হয় লিডিয়া পোলগ্রিনের। তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মান্ডি হাউসের দিকে যাচ্ছিলেন। কয়েক দশক ধরে দিল্লিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পরিচিত কেন্দ্র এই এলাকা। এর আগে ভারতের লাখ লাখ তরুণের মতো তারাও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মোদির শাসনামলে জনবিক্ষোভের চাপে কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগের এটিই প্রথম ঘটনা।

পোলগ্রিনের মতে, এবার শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ ছিল আরও বড়। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওপর মোদির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তারা। ৯০ কোটির বেশি ভোটারের দেশে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে।

মদিনা পোলগ্রিনকে বলেছিলেন, ‘ভারত সত্যিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র কি না, তা প্রমাণ করার সময় এসেছে। এখানে সবকিছুই রাজনৈতিক, আর রাজনীতির সবকিছুই এখন আমাদের জীবনের অংশ।’

তবে সেদিন তার আর মিছিলে অংশ নেওয়া হয়নি। কথা বলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছদ্মবেশী পোশাক পরা একদল পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে এসে শিক্ষার্থীদের ধাক্কাধাক্কি করে একটি বাসে তুলে নেন। প্রায় ৪০ মিনিট দূরের একটি থানায় নিয়ে যাওয়ার পর অন্ধকার হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আন্দোলন দমাতে সরকার ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে। সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আন্তরাজ্য বাস ও দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিক্ষোভের দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হলুদ ব্যারিকেড বসিয়ে মানুষের চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

সাংবাদিক পোলগ্রিনের মতে, এসব পদক্ষেপের পরও মোদিকে ক্ষমতায় আসার পর যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দুর্বল মনে হচ্ছে। মদিনার মতো শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও হিন্দু তরুণ-তরুণীরা— যে প্রজন্মের সমর্থন তাকে ক্ষমতায় যেতে সহায়তা করেছিল— এখন তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করছেন। শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ক্ষুব্ধ এই তরুণেরা গ্রেপ্তার ও পুলিশের লাঠিপেটার ঝুঁকি নিয়েও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

পোলগ্রিন লিখেছেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে মোদির শাসনকে অটল মনে হয়েছিল। ব্রেক্সিট, ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া কিংবা ইউরোপে ডানপন্থিদের উত্থানের আগেই ভারত জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদের পথে এগিয়েছিল। মোদি ভারতকে জাতীয় গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন ভারত আবারও বিশ্বরাজনীতির আলোচনায়, তবে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির বিনিময়ে অধিকার বিসর্জনের ভুল সমীকরণ

২০০৯ সালে ভারতে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করার সময় দেশটিকে বিপুল সম্ভাবনা ও আশাবাদে ভরপুর মনে হয়েছিল লিডিয়া পোলগ্রিনের। তিনি লিখেছেন, সে সময় নির্বাচনে জয়ের পর কংগ্রেস মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে শক্তিশালী জোট সরকার গঠন করেছিল। প্রত্যাশা ছিল, বামপন্থি জোটসঙ্গীদের বাধা থেকে মুক্ত হয়ে সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেবে। কিন্তু বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ভারতের সমৃদ্ধির স্বপ্নে ধাক্কা লাগে। দুর্নীতি ও স্বজনতোষণের অভিযোগে সরকার চাপে পড়ে। এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় আসে মোদির ডানপন্থি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল।

পোলগ্রিন লেখেন, তখন মোদি নিজেকে সংযমী ও ধর্মপ্রাণ জনসেবক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তার দাবি ছিল, ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, দেশের মানুষের উন্নয়নই তার লক্ষ্য। বহু হিন্দুর কাছে হিন্দু গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে তার বক্তব্য আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

২০০২ সালে গুজরাটে ধর্মীয় দাঙ্গায় শত শত মুসলমান নিহত হওয়ার সময় মোদি নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় তিনি রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ওই ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নয় বছর তাকে সে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তবে রাজনৈতিকভাবে এ বিতর্ক অধিকাংশ সময় উপেক্ষিত থেকেছে।

সাংবাদিক পোলগ্রিন লেখেন, মোদিকে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের একজন দিল্লির মোটরচালিত রিকশাচালক সুরেন্দর কুমার। ২০১৪ সালে দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবর্তনের আশায় তিনি বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এক যুগ পর তিনি হতাশ। কুমার বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন আমরা কী দেখছি? সরকারি কর্মকর্তাদের আশ্রয়ে থাকা লোকজনই শিশুদের মারধর করছে।’

দিনমজুর বাবা-মায়ের সন্তান কুমার এখন মাসে প্রায় ৩০০ ডলার আয় করেন। কিন্তু মোদির শাসনামলে বড় হওয়া তার সন্তানদের জীবনমানের তেমন উন্নতি হয়নি। বেসরকারি স্কুলে পড়ানো কিংবা আলাদা কোচিং করানোর সামর্থ্য না থাকায় তারা কেউ কলেজে পড়তে পারেননি। তার মেয়ে কসমেটোলজির প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোট একটি বিউটি পারলার খুলেছেন। ছেলে কাজ করেন ম্যাকডোনাল্ডসে। কুমারের ভাষায়, তাদের আয় যেন হাতখরচের টাকামাত্র। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, রিকশার জ্বালানি গ্যাসের দাম হয়েছে দ্বিগুণ। তিনি বলেন, ‘যে জিনিসের দাম একবার বেড়েছে, তা আর কখনো আগের জায়গায় ফিরে আসে না।’

অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারগুলোর অনেকেও সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ ক্রমেই সংকুচিত ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

শিক্ষাব্যবস্থার চাপ ও তরুণদের হতাশা

দিল্লির উত্তর প্রান্তের একটি আবাসিক এলাকায় থাকেন শিক্ষক শিবানী শর্মা। তার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে সংস্কৃতিকে একটি ভালো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো এবং তার জন্য সম্মানজনক কর্মজীবনের সুযোগ তৈরি করাই এখন তার প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য মেয়ের গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতা বাড়াতে ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুল ও কোচিংয়ের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন।

শিবানী শর্মা পোলগ্রিনকে বলেন, ‘ভালো ফল করতে হবে। তাহলেই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যাবে।’ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সেখানে ভর্তির সুযোগ অনেকটা লটারিতে জেতার মতো। সংস্কৃতি সেখানে ভর্তি হতে না পারলে বেসরকারি কলেজে পড়ানোর জন্য পরিবারকে বছরে ১৫ হাজার ডলারের বেশি খরচ করতে হতে পারে।

স্বামীর সঙ্গে একটি স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিবেশী শিশুদের পড়িয়ে বাড়তি আয় করেন শর্মা। তার স্বামীও একটি পোশাকের শোরুমে খণ্ডকালীন কাজ করেন। শর্মা বলেন, ‘আমরা সাধারণভাবে জীবনযাপন করি। বিদেশে বেড়াতে যাই না, দামি পোশাক কিনি না, এখানে-সেখানে অপ্রয়োজনীয় খরচ করি না। মেয়ের পড়াশোনার জন্য টাকা জমাতে চেষ্টা করি।’

তার বড় পরিবারে পাঁচ বোন ও এক ভাই। তাদের কারও দুইয়ের বেশি সন্তান নেই। কারণ, দুটি সন্তানকে ভালো জীবন ও শিক্ষা দেওয়াও তাদের জন্য কঠিন।

শিক্ষাব্যবস্থার এই চাপের মধ্যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা শর্মাকে আরও উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি বলেন, ‘কিছু শিশু আত্মহত্যা করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে পারে কেবল ভেতরের লোকজন। আর কে প্রশ্নপত্র ফাঁস করবে? এটি ভয়াবহ দুর্নীতি।’

মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পরও চাকরির নিশ্চয়তা নেই। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। খাদ্য সরবরাহের মতো কাজে নিয়োজিত অনেক তরুণ প্রকৌশল ডিগ্রিধারীদের চেয়েও বেশি আয় করছেন।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শর্মা এখন বিদেশে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার কথাও ভাবছেন। কিন্তু সে জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা পরিবারকে ঋণের বোঝায় ফেলতে পারে। দেশজুড়ে তরুণেরা এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে ঋণ বাড়ছে, অথচ উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা নেই। তারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন না।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদের ২৯ বছর বয়সী সভাপতি অদিতি পোলগ্রিনকে বলেন, ‘মানুষ মোদির বয়ান শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।’

জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের একটি অংশ হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিশ্রুতিতে আর আস্থা রাখতে পারছে না বলে মনে করেন সাংবাদিক পোলগ্রিন।

মোদির কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই এখন তার জন্য ফাঁদ

পোলগ্রিন লিখেছেন, ভারতের গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি থেকে মোদি ক্রমেই দূরে সরে গেছেন। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত তার নিজের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে।

মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে স্বাধীন ও নতুন ধারার সাংবাদিকতার উত্থান ঘটেছে।

পরীক্ষা পরিচালনার ব্যবস্থাও কেন্দ্রীভূত করেছিলেন মোদি। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এর দায় এড়ানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগও তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

পোলগ্রিনের মতে, বিশ্বের দরবারে ভারতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও মোদির জন্য প্রত্যাশিত সাফল্য বয়ে আনেনি। ভারতকে বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তাকে কয়েকবার বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

দেশটিতে অভিবাসনের ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের বিদেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর স্বপ্ন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অনিশ্চয়তা অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় গ্রহণকারী দেশগুলোর একটি ভারত। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশ আসে প্রবাসী আয় থেকে। ফলে এই খাতের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও রপ্তানির ওপর শুল্কের চাপ।

সব মিলিয়ে সাংবাদিক পোলগ্রিন মনে করেন, মোদির ক্ষমতার অবসান এখনই ঘটবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই। তবে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও ক্ষমতার ভিত্তিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা স্পষ্ট। তরুণদের প্রতিবাদ, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন— এসবই ভারতের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad