রাষ্ট্র মানুষের সৃষ্টি, মানুষ রাষ্ট্রের নয়

এম ডি মাসুদ খান
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ৩২

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত ক্ষমতা, দায়িত্ব ও অধিকারের সম্পর্কের ইতিহাস। আদিম সমাজে মানুষ ছিল স্বাধীন; প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। সময়ের সঙ্গে তারা বুঝতে শিখল— একসঙ্গে থাকা, নিয়ম তৈরি করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। এভাবেই ধীরে ধীরে সমাজ, শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের ধারণার জন্ম হয়।

কিন্তু বাস্তবতা সবসময় দর্শনের মতো সরল ছিল না। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, জনগণের প্রতিনিধি ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রশাসন, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সেবা করার বদলে অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ কিংবা আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো— সব জায়গায় একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে: রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাষ্ট্রের জন্য?

এই লেখাটি সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতীকী রূপ। এখানে একটি ভূখণ্ড, কিছু সাধারণ মানুষ, তাদের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর গল্পের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন, বৈধতার মুখোশ, এবং নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের গভীর রাজনীতি তুলে ধরা হয়েছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সময়ের গল্প নয়; বরং প্রতিটি সমাজে সময়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক চিরন্তন সত্যের প্রতিফলন।

এই প্রেক্ষাপটে নিচের গল্পটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— রাষ্ট্র কোনো অলৌকিক শক্তি নয়; বরং মানুষের সম্মিলিত চুক্তির ফল। তাই প্রশ্ন, জবাবদিহি ও সচেতনতার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি টিকে থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষই রাষ্ট্রের উৎস, এবং রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ।

এক বিশাল ভূখণ্ড। নদী বয়ে যায়, ফসল লালিত হয়, মানুষের ঘাম আর স্বপ্নে উর্বর হয়ে ওঠে মাটি। এই জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন সাধারণ মানুষ— নিঃশব্দ, পরিশ্রমী এবং আশাবাদী। তারা বিশ্বাস করত, এই মাটি তাদের; এই ভবিষ্যৎও তাদের।

কিন্তু মানুষ একা সব কাজ করতে পারে না। তাই তারা নিজেদের মধ্য থেকে কিছু প্রতিশ্রুতিশীল মানুষকে বেছে নিল। বলল,

“তোমরা আমাদের প্রতিনিধি হও। জমি দেখাশোনা করো, হিসাব রাখো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করো। আমরা কাজ করব, তোমরা শাসন করবে— কিন্তু আমাদের হয়ে, আমাদের স্বার্থে।”

এভাবেই প্রতিনিধিত্বের ধারণা জন্ম নিল। প্রথমে তারা ছিল বিনয়ী ও দায়িত্বপরায়ণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্ষমতার ভাষা শিখতে লাগল। ধীরে ধীরে তারা বুঝল— ক্ষমতা শুধু দায়িত্ব নয়, এক ধরনের আসক্তিও।

কাজের সুবিধার জন্য প্রতিনিধিরা কিছু কর্মচারী নিয়োগ দিল— বেতন দিয়ে। যাদের আমরা কখনও দাস, কখনও চাকর, কখনও কর্মচারী বলি। বলা হলো,

“তোমরা নিয়ম মেনে কাজ করবে। নথি রাখবে। ফসলের পাহারা দেবে। জনগণের সেবা করাই তোমাদের কর্তব্য।”

প্রথমে তারা মাথা নিচু করে কাজ করত। তারপর তারা পেল চেয়ার। এরপর কলম। অবশেষে সিলমোহর। এই তিনটি জিনিস আনল এক অদ্ভুত পরিবর্তন—

চেয়ার দিল ক্ষমতার স্বাদ।

কলম দিল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।

সিল দিল বৈধতার মুখোশ।

মালিক ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। প্রতিনিধি উপরে উঠে গেল। আর কর্মচারীরা হয়ে উঠল শক্তির মধ্যবর্তী দরজা।

একদিন দেখা গেল, জমির প্রকৃত মালিক নিজের জমিতে ঢোকার জন্য অনুমতি চাইছে।

প্রতিনিধি বলল,

“রাষ্ট্রের স্বার্থ আছে।”

কর্মচারী বলল,

“নিয়ম আছে।”

মালিক বলল,

“আমি তো মালিক!”

কর্মচারী শান্ত গলায় বলল,

“কাগজ দেখান।”

এরপর শুরু হলো এক নতুন বাস্তবতা—

কাগজই হয়ে গেল সত্য,

সিল হয়ে গেল সার্বভৌমত্বের প্রতীক,

চেয়ার হয়ে গেল ন্যায়ের প্রতীক।

প্রতিনিধিরা ধীরে ধীরে জনগণের প্রতিনিধি থেকে ক্ষমতার মালিকে পরিণত হলো। সেবকরা সেবক থেকে নিয়ন্ত্রকে রূপ নিল।

আর মালিকেরা? তারা সভায় হাততালি দেয়, লাইনে দাঁড়ায়, কর দেয়, নিয়ম মানে, ভয় পায়—এবং কখনও কখনও নিজের অধিকার ভিক্ষা চায়।

সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল মানুষকে বোঝানো— এটাই স্বাভাবিক। নাগরিক হওয়া মানে শুধু দায়িত্ব পালন, প্রশ্ন না করা। রাষ্ট্র মানে দূরের এক অদৃশ্য শক্তি, যার কাছে জবাবদিহি চাওয়ার সুযোগ নেই।

একসময় কর্মচারীরাই বলল,

“আমরাই রাষ্ট্র।”

মালিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে আমরা কে?”

উত্তর এলো,

“তোমরা নাগরিক।”

নাগরিক— অর্থাৎ অধিকার আছে, কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। কণ্ঠ আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। মালিকানা আছে, কিন্তু কাগজের ভেতরে সীমাবদ্ধ।

এইভাবে ইতিহাসের এক অদ্ভুত প্রহসনে মালিক হয়ে গেল প্রজা, প্রজা হয়ে গেল শাসিত, আর সেবক হয়ে গেল সার্বভৌম।

কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ নয়। মাটি সব মনে রাখে। ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। যেদিন মানুষ বুঝবে— রাষ্ট্র তাদের সৃষ্টি; যেদিন তারা প্রশ্ন করতে শিখবে, জবাবদিহি চাইতে শিখবে, আইনকে ভয় না পেয়ে নিজের অধিকার বুঝবে—

সেদিন ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাবে।

সেদিন প্রতিনিধি আবার প্রতিনিধি হবে।

সেবক আবার সেবক হবে।

আর রাষ্ট্র আবার মানুষের সেবার যন্ত্র হয়ে উঠবে।

শেষ সত্য একটাই—

মানুষ রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্র মানুষ সৃষ্টি করেনি।

লেখক: ব‍্যবসায়ী ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বিনম্র শ্রদ্ধা: বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ শংকর

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬— ৯৩ বছরের দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন অনন্তলোকের পথে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই কথাশিল্পী রেখে গেলেন তার কালজয়ী সাহিত্যকর্মের বিশাল ভান্ডার, অসংখ্য চরিত্র, অগণিত পাঠকের আবেগ এবং কয়েক প্রজন্মের মানসগঠনে গভীর ছাপ।

৭ দিন আগে

বাংলা ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশ

বাঙালির জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি ঘটনা যা এ দেশের বহু মানুষকে বিভিন্নভাবে ছুঁয়ে গেছে এবং সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা ও তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

৭ দিন আগে

বাংলা ভাষা কি স্বদেশে প্রবাসী?

আমাদের বড় পরিচয়— আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও বোধ একসূত্রে গাঁথা। বাঙালি হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আজ আমাদের গর্বিত পরিচয়— মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি; আমরা একুশের উত্তরাধিকার।

৭ দিন আগে

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানী

ভাসানী বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘আমি বর্তমান মুসলিম লীগওয়ালাদের মতো মনে করি না যে ভারতের মুসলমানদের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নাই। পাকিস্তানের প্রতি আমাদের দেশপ্রেমের জন্য খাজা নাজিমউদ্দীনের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়ে না। এ দেশের জনসাধারণ ভালো করিয়াই জানেন, বিগত ১৯৪৬ সালে যখন পাকিস্তান ইস্যুর ওপর নির্বাচন

৯ দিন আগে