

টিম রাজনীতি ডটকম

নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী একজন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ। গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু ড. আবদুল হান্নানের। শিক্ষকতা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৫ সালে দেশে ফিরে তিনি যোগ দেন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পর ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতায় যুক্ত এই শিক্ষাবিদের পর্যবেক্ষণ, বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষা, বিশেষত উচ্চশিক্ষা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। তবে এই অবনতির দায় কোনো ব্যক্তির ঘাড়ে চাপাতে রাজি নন, বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী।
রাজনীতি ডটকমের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েও আলোকপাত করেছেন তিনি। রাজনীতি ডটকমের নিউজপোর্টাল, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় গত ১৪ জানুয়ারি, রাজধানীর বসুন্ধরায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু ও নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম হৃদয়। ভিডিও সম্পাদনা করেছেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রায়হান হক।
রাজনীতি ডটকম: বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু মানসম্মত?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: শুরুতেই উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গটি আনা যাক। এ বিষয়ে আমি বৈশ্বিক কিছু প্রেক্ষাপট বা রেফারেন্স উল্লেখ করতে চাই। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাদের মতে, বৈশ্বিক মানের তুলনায় আমাদের শিক্ষার স্তর প্রায় চার শ্রেণি নিচে অবস্থান করছে। অর্থাৎ আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থী যখন ১৬তম গ্রেড বা মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী তার দক্ষতা বা ‘অ্যাপটিটিউড লেভেল’ ১২তম গ্রেড বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সমান।
রাজনীতি ডটকম: এই পিছিয়ে পড়ার কারণ কী? শিক্ষকদের মান বা শিক্ষাব্যবস্থার কোন জায়গাগুলোতে সমস্যা রয়েছে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: শিক্ষক বা শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই তাকাই। কিন্তু আমার মতে, আমাদের নজর দেওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষার দিকে। কারণ এটিই দেশের শিশুদের ভিত্তি গড়ার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। সেই ভিত্তিপ্রস্তরেই সমস্যা সেখানেই আমাদের হাত দিতে হবে।
প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষা যেন কোনোভাবেই রাজনীতিকরণ না হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তার আঁতুড়ঘর। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশু তার নিজের ভালো লাগা অনুযায়ী বিকশিত হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা তা পারিনি। আমার প্রস্তাব খুব স্পষ্ট, যদি প্রাইমারি স্কুলের কোনো শিক্ষক পড়াতে অক্ষম হন, প্রয়োজনে তাকে আমি বাড়িতে বসিয়ে বেতন দিতে রাজি আছি, তবু তাকে ক্লাসরুমে যেতে দেব না।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘নর্থ সাউথের মতো নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কেন ভালো লিখতে বা পড়তে পারে না?’ আমার উত্তর— বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীকে চার বছরের জন্য পায়, যার আগের ১২ বছর সে অন্য কোথাও গড়ে উঠেছে। এই অল্প সময়ে তাকে আমূল বদলে ফেলা কঠিন। তাই আমাদের কাজ করতে হবে একেবারে তৃণমূল বা ‘গ্রাসরুট’ পর্যায়ে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মূল পার্থক্যটা এখানেই।

রাজনীতি ডটকম: শিক্ষার মান নিয়ে কথা বললেই তো আমরা অবকাঠামো বা বই বিতরণের পরিসংখ্যান দেখি। এই যে বছরের শুরুতে বই উৎসব নিয়ে এত মাতামাতি, একে আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমরা জাতি হিসেবে নিজেদের কোথায় নামিয়ে এনেছি, ভাবুন তো! আপনারা সাংবাদিকরাও প্রতি বছর ডিসেম্বরে একটা খবর খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেন— ‘এত কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে।’ যেকোনো সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেখা যায়, ফিতা কেটে বই উৎসব করা হচ্ছে এবং সেটাই বড় খবর। আমাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো দেশ দেখান, যারা বই বিতরণ নিয়ে এমন উৎসব বা গল্প ফাঁদে! শুধু তাই নয়, রেজাল্টের জন্যও ফিতা কাটা হয়।
আমি আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড থেকে শুরু করে জাপানের মতো দেশে দেখেছি, স্কুলের প্রথম দিন যখন একটি শিশু ক্লাসে যায়, তার ডেস্কের ওপর সব বই আগে থেকেই সাজানো থাকে। শুধু বই নয়; খাতা-রং পেনসিল, এমনকি খেলার ক্লে বা মাটিও টেবিলের নিচে প্রস্তুত থাকে। স্কুল হয়ে ওঠে আনন্দের জায়গা, যেখানে শিশু স্কুলে গিয়ে দেখবে যে গতকাল সে যেখান থেকে ছবি আঁকা শেষ করেছিল, আজও সেখান থেকেই শুরু করতে পারছে। কিন্তু আমরা সেই জায়গায় নেই, আমরা আছি ‘বইয়ের ব্যবসায়’, কনটেন্ট নিয়ে অহেতুক বিতর্কে।
আমাদের এখানে মুক্তচিন্তার সুযোগ রাখা হয়নি। আমরা ধরে নিয়েছি, বইয়ে যা ছাপা হয়েছে সেটাই বেদবাক্য। অথচ জ্ঞান বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান ছড়িয়ে আছে সবখানে। সমাজ, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, এমনকি আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চর্চা থেকেও জ্ঞান অর্জিত হয়। পারিবারিক শিক্ষা বা কালচার থেকেও জ্ঞান আসে।
রাজনীতি ডটকম: আপনি কারিকুলাম বা কাঠামোগত যে ত্রুটির কথা বললেন, সেখান থেকে উত্তরণের উপায় কী?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: সমাধানের শুরুটা খুব মৌলিক জায়গা থেকে করতে হবে। ধরুন, আপনার নিজের সন্তানের জন্য আপনি কেমন শিক্ষক চান? সেটিই মূল প্রশ্ন। বাংলাদেশের এখন প্রধান কাজ হওয়া উচিত ঠিক সেই মানের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া, তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং যথাযথ জায়গায় পদায়ন করা।
আমরা যদি আজই এই প্রক্রিয়া শুরু করি, তবু উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষ শিক্ষার্থীদের একটি মানসম্মত ‘সাপ্লাই চেইন’ তৈরি করতে অন্তত ২০ বছর সময় লাগবে। এই ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতিকে বিশ্বাস করতে হবে যে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানো অপরিহার্য। একইসঙ্গে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত যত ‘নন-কোয়ালিটি এলিমেন্ট’ বা অযোগ্য উপাদান ও ব্যক্তি আছে, তাদের সরিয়ে দিতে হবে বা ‘সাইডলাইন’ করতে হবে। তাদের এই ব্যবস্থার মধ্যে রেখে আপনি কখনোই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবেন না।

রাজনীতি ডটকম: বাজেট বাড়ানোর কথা তো সবাই বলেন। কিন্তু বর্তমানে যে বাজেট বরাদ্দ থাকে, সেটারও তো সঠিক ব্যবহার আমরা করতে পারি না।
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: না, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। আমাদের বাজেটের মূল ফোকাস অবকাঠামো উন্নয়ন। আমরা দালানকোঠা বানাচ্ছি, নতুন নতুন প্রযুক্তি কিনছি এবং এগুলো দেখিয়েই বলছি যে শিক্ষার পেছনে খরচ করছি। কিন্তু এই অবকাঠামো বা প্রযুক্তি যারা ব্যবহার করবেন, সেই ‘হিউম্যান রিসোর্স’ বা মানবসম্পদের উন্নয়নে আমরা কার্যকর কিছুই করতে পারিনি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা নেতিবাচক দিক হলো— আমরা শিক্ষকদের অবহেলা করেছি। অথচ শিক্ষার যেকোনো পরিবর্তন বা ‘ট্রান্সফরমেশন’ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শিক্ষকেরই থাকার কথা।
রাজনীতি ডটকম: এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে আটকে আছে? আমরা কেন আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো— আমরা একে পুরোদস্তুর একটি ‘ফলাফলমুখী’ বা ‘রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড’ ব্যবস্থায় পরিণত করেছি। আমাদের চর্চার মধ্যে এমন অনেক কিছুই ঢুকে গেছে, যা আসলে সভ্যতার সাথে মানানসই নয় এবং এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা আমাদের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি। আমাদের দেশে একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তাকে ভবিষ্যতের শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে শিক্ষক হিসেবে ভাবা হচ্ছে তার একাডেমিক ফলাফল বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অ্যালাইনমেন্টের ওপর ভিত্তি করে। ফলে শিক্ষকদের যোগ্যতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

বাইরের দেশে বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের সবার জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সমান ও উন্মুক্ত থাকে, সে লিবারেল আর্টস পড়ুক বা বিজ্ঞান। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এলেও একটা পর্যায়ে তাদের একীভূত হওয়ার সুযোগ থাকে। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এই ইন্টিগ্রেশনটা করতে পারিনি। উলটো আমরা মাদরাসা শিক্ষাকে পছন্দ করছি না, ইংরেজি মাধ্যমকে বাঁকা চোখে দেখছি, আবার বাংলা ও ইংরেজির মিশ্র মাধ্যমকেও কাজের মনে করছি না। এমনকি আমাদের মূলধারা বা বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষাও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারছে না।
এই ব্যর্থতার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে আমাদের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের। ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে আমরা পুরো জাতি একটি রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড ব্যবস্থার মধ্যে আটকে গেছি, যেখানে ভালো জিপিএ পাওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য, যা দিনশেষে আমাদের কেবল একটি মিথ্যে তৃপ্তি দিচ্ছে।
রাজনীতি ডটকম: ফলাফল প্রসঙ্গে আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। টপ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিজিপিএ-৪ পেতে হলে ৯০-এর বেশি নম্বর পেতে হয়। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৮০ পেলেই চলে। এতে কি চাকরির বাজারে কি কোনো বৈষম্য তৈরি হয়?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আসলে ৯০-এর বেশি না, আমাদের এখানে সিজিপিএ-৪ পেতে ৯৩ নম্বর লাগে। আমরা এই মানের ব্যাপারে কোনো আপস করতে চাই না, যদিও আমাদের ওপর রাষ্ট্রের কিছুটা চাপ আছে। এখন প্রশ্ন হলো— এতে চাকরিতে বৈষম্য হয় কি না?
আমার মতে, একদমই না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা কম সিজিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও অনেক ভালো ভালো জায়গায় কাজ করছে। কারণ নিয়োগকর্তারা জানেন, একটি প্রতিষ্ঠানের ‘সি প্লাস’ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ‘এ মাইনাস’-এর চেয়ে গুণগত মানে ভিন্ন হতে পারে। একে বলা হয় ‘আমেরিকান মেথড’, যেখানে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা বা অ্যাপটিটিউড যাচাই করা হয়, কেবল নম্বর নয়।
আমাদের মূল সমস্যা হলো— আমরা লেটার গ্রেড বা সিজিপিএকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছি। লেটার গ্রেড কোনো সাধারণ সংখ্যার রূপান্তর নয়, এটি একটি ‘রিলেটিভ গ্রেডিং’ বা আপেক্ষিক মূল্যায়ন। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এমন শিক্ষক বা ফ্যাকাল্টি মেম্বার পাওয়া কঠিন যারা এই ‘রিলেটিভ গ্রেডিং’ বা আপেক্ষিক মূল্যায়নের বিষয়টি পুরোপুরি বোঝেন।

প্রশ্ন: পাস করার পর শিক্ষার্থীদের চাকরির নিশ্চয়তা বা প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা কীভাবে দেখেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: প্লেসমেন্ট বা কর্মসংস্থানের ধারণাটি আমাদের দেশ এখনো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ২০১৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমস একটি শিরোনাম করেছিল— ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হ্যাজ আ প্রবলেম, দেয়ার আর টু মেনি ইয়াংস।’ অর্থাৎ বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সংকট তরুণ জনসংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া। আর এই তরুণদের বিশাল অংশের বাস আমাদের সাউথ এশিয়া বা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এ।
এখানে আমরা ‘গ্লোবাল নর্থ’ ও ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য দেখছি। একদিকে উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটছে, এআই, ডিপ লার্নিং, মেশিন লার্নিং এবং স্মার্ট টেকনোলজির মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৩২ লাখ তরুণকে এক প্রকার ‘পার্ক’ করে রেখেছি।
আমি কোনো বিষয়কে ছোট করছি না বা অবমাননা করছি না। কিন্তু প্রশ্ন হলো— বর্তমান বাজারের চাকরির চাহিদা অনুযায়ী কি আমরা গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি? প্রকৃতপক্ষে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ‘ফলস ইগো’ বা ভ্রান্ত অহংবোধ তৈরি করে দিচ্ছে।
আমরা শিক্ষার্থীদের এমন মানসিকতা দিতে পারিনি যে মাস্টার্স পাস করার পর প্রয়োজনে সে কোনো সামাজিক কাজে যুক্ত হবে বা ছোট কোনো উদ্যোগ নেবে। বরং এই ব্যবস্থা পাইকারি হারে মাস্টার্স ডিগ্রি দিচ্ছে। শিক্ষার্থীও ভাবছে, যেহেতু এই ডিগ্রিই তার সম্বল, তাই তাকে বিসিএস ক্যাডার বা বড় কোনো পদে চাকরিই করতে হবে। এই মানসিকতাই তাদের কর্মক্ষম বা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে বড় বাধা।
রাজনীতি ডটকম: মেধাবীদের দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়ছে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের আমরা যেমন ধরে রাখতে পারছি না, তেমনি ফিরিয়েও আনতে পারছি না। সমস্যাটা আসলে কোথায়?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: যারা বিদেশে যাচ্ছে, তাদের জোর করে দেশে রেখে দিলে কী হতো? বাস্তবতা হলো— তারা এখানে পুরোপুরি অব্যবহৃত বা ‘আনইউটিলাইজড’ অবস্থায় থাকত। তাদের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত শিল্পখাত বা করপোরেট কাঠামো আমাদের দেশে এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
এ ক্ষেত্রে চীন, ভারত, তুরস্ক বা মালয়েশিয়াকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়। এই দেশগুলো একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছে। পরে তারা যখন উন্নত বিশ্বের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তখন রাষ্ট্রগুলো সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে তাদের ফিরিয়ে এনেছে। চীন অনেক পরে এই কৌশল নিয়েছে, ভারতও তাদের এনআরআই (নন-রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান) পলিসির মাধ্যমে শত বছর পর তাদের মেধাবীদের ফিরিয়ে আনছে।
এখানেই আমাদের দুর্বলতাটা বড়। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনো বিদেশফেরত দক্ষ পেশাজীবীদের বরণ করে নেওয়ার মতো উদার বা ‘ওপেন’ হতে পারেনি। তাদের ক্যারিয়ার গড়ার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ রাষ্ট্রের মধ্যে কম। তবু দেশের করপোরেট সেক্টর বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে তাকালে দেখবেন, বিদেশফেরত অনেকেই সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা সর্বাধুনিক জ্ঞান-প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। দুর্ভাগ্যবশত সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো দ্বার উন্মুক্ত রেখেছে।

রাজনীতি ডটকম: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বা রাজনৈতিক সচেতনতা কীভাবে বিকশিত হবে বলে মনে করেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমার ব্যক্তিগত মত— প্রতিটি ছাত্রের বা মানুষেরই রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা উচিত। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে প্রতিবাদ করে। তারা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে সোচ্চার। কিন্তু আমাদের দেশে ক্যাম্পাসের ভেতরে যে ধাঁচের রাজনীতি হয়, আমেরিকায় সেটা নেই বললেই চলে। তারা দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ক্যাম্পাসের ভেতরে চর্চা করে না।
আমাদের দেশে একসময় ধারণা করা হতো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বোধহয় দেশপ্রেমিক নয় বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয়। তারা দেশের কোনো সংকটে এগিয়ে আসে না। কিন্তু আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে উলটো কথা। কোটা সংস্কার আন্দোলন বা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দাবির ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ও প্রকাশের ভঙ্গিটি হয়তো আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক প্র্যাকটিসের চেয়ে ভিন্ন, কিন্তু তাদের সচেতনতার কোনো অভাব নেই।
রাজনীতি ডটকম: রাজনীতি ছাড়া কি রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠা সম্ভব? প্রস্তাবিত আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালুর যে কথা বলা হয়েছে, আপনি কি তা সমর্থন করেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমরা ক্যাম্পাসে কে বামপন্থি বা কে ডানপন্থি— এসব নিয়ে তর্কে যাই না। আমরা মনে করি, যে শিক্ষার্থী পড়তে এসেছে তার পড়ার অধিকারটাই প্রধান। সে যদি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করতে চায়, সেটা ক্যাম্পাসের বাইরে করুক, তাতে আমাদের বাধা নেই। কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে দলীয় রাজনীতি চর্চাকে আমরা সমর্থন করি না। আমাদের ক্যাম্পাস সবার জন্য উন্মুক্ত। আমরা যদি কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা বয়ান সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চাই, তবে কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়া সম্ভব হবে না।

রাজনীতি ডটকম: নর্থ সাউথসহ দেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার খরচ অনেক বেশি। যাদের এই ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য আপনাদের দরজা কি বন্ধ?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: নর্থ সাউথ বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি— এটি সত্য। টিউশন ফি’র দিক থেকে আমরা হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে আছি। কিন্তু খরচের উলটো পিঠে আরেকটি চিত্রও আছে। আমরাই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়িয়েছি। এই সংখ্যা প্রায় ১৮০০।
আমি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আর্থিক সহায়তার পরিধি অনেক বাড়িয়েছি। আগে সেমিস্টারে এ সংক্রান্ত মিটিং হতো একটি, এখন আমরা তিনটি করে মিটিং করি। প্রতি মিটিংয়ে ২০০-৩০০ আবেদন আসে এবং যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রায় ৯৫ শতাংশ আবেদনই আমরা মঞ্জুর করি।
আমাদের সহায়তা মূলত দুই ধরনের, মেধাভিত্তিক ও প্রয়োজনভিত্তিক। পড়ালেখা চলাকালে কোনো শিক্ষার্থী যদি মা-বাবার কোনো একজনকে হারায়, আমাদের নিয়মে তার টিউশন ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫০ শতাংশ মওকুফ হয়ে যায়। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১০০ শিক্ষার্থীকে আমরা ফান্ডিং করেছি, ৩৫০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে অ্যাপোলোসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।

রাজনীতি ডটকম: গবেষণার দিক থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগতি কতদূর? কমিউনিটি বা সমাজের জন্য এই গবেষণাগুলো কতটা কাজে আসবে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: নর্থ সাউথ এখন কেবল পাঠদান নয়, বরং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। গত ১০ বছরে আমরা গবেষণায় যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা সত্যিই গর্ব করার মতো।
আমরা কানাডিয়ান ফান্ডিংয়ে বঙ্গোপসাগরের ‘সুনামি আর্লি রেসপন্স সিস্টেম’ বা সুনামির আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের গবেষকরা মেশিন লার্নিং বা এআই ব্যবহার করে নারীদের স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন। ব্রেইন সার্জারির সময় নিউরাল ফাংশন কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
এমনকি ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়েও আমরা কাজ করছি। এগুলো সবই ‘কমিউনিটি ড্রিভেন রিসার্চ’ বা জনকল্যাণমুখী গবেষণা, যা দেশের মানুষের কাজে আসবে।

রাজনীতি ডটকম: নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এখন একটি ব্র্যান্ড। এ অবস্থানে পৌঁছে আপনারা কি সন্তুষ্ট?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: এটি একটি ৩২ বছরের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়, যা একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা এখানে নেই। বরং আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের জন্য কাজ করছি। কিউএস র্যাংকিংয়ে ১০০ ধাপ এগোনোসহ আমরা কিছু সাফল্যের গল্প হয়তো বলি, কিন্তু কখনোই দাবি করি না যে আমরা সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে গেছি। কারণ সেটি বলার অর্থই হলো অগ্রগতির চাকা থেমে যাওয়া।
আমি বিশ্বাস করি, উন্নতি একটি চলমান যাত্রা। এটি একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া। আপনি যেখানেই পৌঁছান না কেন, সবসময়ই দেখবেন উন্নতির আরও অবকাশ বা সুযোগ রয়ে গেছে। তাই থেমে যাওয়ার বা তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।

রাজনীতি ডটকম: বর্তমানে সবাই উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বলছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ বিষয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের দেশে ‘সিড মানি’ বা প্রারম্ভিক পুঁজির সংকট এবং বিভিন্ন বাধার কারণে স্টার্টআপ বা ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়া কঠিন। শুধু উৎসাহ দিয়ে কি এই সমস্যার সমাধান হবে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: অধ্যাপক ইউনূস কিন্তু শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের সামনে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তার কথার মূল সুরটা বুঝতে হবে। তিনি মূলত তরুণদের ভবিষ্যৎ চাহিদায় জোর দিয়েছেন। তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে ছুটবে না, তাদের কিছু করার সুযোগ করে দিতে হবে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমরা সে চেষ্টাটা করছি। গত ছয় মাসে আমাদের ক্যাম্পাস থেকে বেশ কয়েকটি বিজনেস বা স্টার্টআপ তৈরি হয়েছে, যারা এখন নিজেরাই ‘এমপ্লয়ার’ হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বের নামকরা কোম্পানিগুলো তাদের আইডিয়া দেখে ফান্ডিং দিচ্ছে। এগুলোকে আমরা বলি ‘এনএসইউ স্টার্টআপ’। কিন্তু সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই তরুণদের তাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজনীতি ডটকম: ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক বা জোবরা গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে শুরু করেছিলেন। কিন্তু যাদের পারিবারিক সমর্থন নেই, সেই প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণরা কীভাবে অফিস বা প্রাথমিক খরচ মেটাবে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: এখানে দুটি দিক আছে— এক, ড. ইউনূসের ‘নবীন উদ্যোক্তা’ কনসেপ্ট। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের সন্তানরা যখন নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে আসে, তাদের সিড ফান্ডিং বা ক্যাপিটাল দেওয়া হয়। এটি বেশ সফল।
দুই, নর্থসাউথের উদাহরণ দিই। আমাদের কোনো ছাত্র বা ছাত্রদের দল যখন কোনো ‘ক্রিয়েটিভ আইডিয়া’ নিয়ে আসে, বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রথমে একটি অফেরতযোগ্য সিড ফান্ড দেয়। এরপর আমরা তাদের শেখাই কীভাবে গ্লোবাল বডি বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে ফান্ড ‘অ্যাট্রাক্ট’ করতে হয়।
আমাদের ক্যাম্পাস থেকে উঠে আসা প্রায় ৪০-৪২ জন সফল উদ্যোক্তা আছেন। আপনারা চালডাল, শেয়ারট্রিপ, নগদ, হাঙ্গরিনাকি বা পাঠাওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম শুনেছেন। এদের অনেকেই ৭০০-৮০০ বা ১০০০ কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। অর্থাৎ এরা শুধু নিজেরা স্বাবলম্বী হয়নি, অন্যের কর্মসংস্থানও করেছে।

রাজনীতি ডটকম: কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কি উদ্যোক্তা তৈরিতে বা নীতিগত জায়গায় কোনো মৌলিক অগ্রগতি হয়েছে? নাকি শুধুই কথা বা আওয়াজ শুনেছি?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: মৌলিক কোনো অগ্রগতি হয়নি, এটা সত্য। ড. ইউনূস যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চালাচ্ছেন, আমার মনে হয় তিনি সচেতনভাবেই তার ‘প্রমোটেড’ কোনো কনসেপ্ট রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চাপিয়ে দিতে চাননি, যেন রাজনৈতিক বিতর্ক না হয়। কিন্তু তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন।
তবে হ্যাঁ, আপনারা বিনিয়োগ বোর্ডের বা অন্য কিছু ক্ষেত্রে যা দেখেছেন, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই ফানুস বা শুধুই প্রেজেন্টেশন ছিল। কাজের কাজ খুব একটা হয়নি।
রাজনীতি ডটকম: তাহলে এই পরিস্থিতি বদলাবে কীভাবে? শিক্ষাব্যবস্থায় কি কোনো পরিবর্তন দরকার?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: অবশ্যই। আমরা যারা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, আমরা বলছি শিক্ষাব্যবস্থায় ইনোভেশন ও এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ যুক্ত করতে হবে। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বা ‘স্কিল’ দিতে হবে। তাদের আমাদের দেশের চাহিদা অনুযায়ী খাতগুলোর জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের একাধিক উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, আমাদের শেকড় কৃষির সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাতে পারলে দারুণ কিছু সম্ভব।
দিন শেষে আমি বলব, রাষ্ট্রের যত সমস্যা, তার প্রধান দায়ভার আমাদের বা শিক্ষাব্যবস্থার। কারণ আমরা সার্টিফিকেটধারী লোক তৈরি করছি বটে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত বা দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারছি না। এই সার্টিফিকেটগুলো একজন ব্যক্তিকে কেবল এক ধরনের ‘ফলস প্রাইড’ বা মিথ্যা গর্ব ছাড়া আর কিছুই দিচ্ছে না।
রাজনীতি ডটকম: রাজনীতি ডটকমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আপনাদের এবং রাজনীতি ডটকমের পাঠক-দর্শকদেরও ধন্যবাদ।

নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী একজন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ। গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু ড. আবদুল হান্নানের। শিক্ষকতা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৫ সালে দেশে ফিরে তিনি যোগ দেন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পর ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতায় যুক্ত এই শিক্ষাবিদের পর্যবেক্ষণ, বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষা, বিশেষত উচ্চশিক্ষা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। তবে এই অবনতির দায় কোনো ব্যক্তির ঘাড়ে চাপাতে রাজি নন, বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী।
রাজনীতি ডটকমের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েও আলোকপাত করেছেন তিনি। রাজনীতি ডটকমের নিউজপোর্টাল, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় গত ১৪ জানুয়ারি, রাজধানীর বসুন্ধরায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু ও নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম হৃদয়। ভিডিও সম্পাদনা করেছেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রায়হান হক।
রাজনীতি ডটকম: বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু মানসম্মত?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: শুরুতেই উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গটি আনা যাক। এ বিষয়ে আমি বৈশ্বিক কিছু প্রেক্ষাপট বা রেফারেন্স উল্লেখ করতে চাই। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাদের মতে, বৈশ্বিক মানের তুলনায় আমাদের শিক্ষার স্তর প্রায় চার শ্রেণি নিচে অবস্থান করছে। অর্থাৎ আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থী যখন ১৬তম গ্রেড বা মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী তার দক্ষতা বা ‘অ্যাপটিটিউড লেভেল’ ১২তম গ্রেড বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সমান।
রাজনীতি ডটকম: এই পিছিয়ে পড়ার কারণ কী? শিক্ষকদের মান বা শিক্ষাব্যবস্থার কোন জায়গাগুলোতে সমস্যা রয়েছে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: শিক্ষক বা শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই তাকাই। কিন্তু আমার মতে, আমাদের নজর দেওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষার দিকে। কারণ এটিই দেশের শিশুদের ভিত্তি গড়ার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। সেই ভিত্তিপ্রস্তরেই সমস্যা সেখানেই আমাদের হাত দিতে হবে।
প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষা যেন কোনোভাবেই রাজনীতিকরণ না হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তার আঁতুড়ঘর। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশু তার নিজের ভালো লাগা অনুযায়ী বিকশিত হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা তা পারিনি। আমার প্রস্তাব খুব স্পষ্ট, যদি প্রাইমারি স্কুলের কোনো শিক্ষক পড়াতে অক্ষম হন, প্রয়োজনে তাকে আমি বাড়িতে বসিয়ে বেতন দিতে রাজি আছি, তবু তাকে ক্লাসরুমে যেতে দেব না।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘নর্থ সাউথের মতো নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কেন ভালো লিখতে বা পড়তে পারে না?’ আমার উত্তর— বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীকে চার বছরের জন্য পায়, যার আগের ১২ বছর সে অন্য কোথাও গড়ে উঠেছে। এই অল্প সময়ে তাকে আমূল বদলে ফেলা কঠিন। তাই আমাদের কাজ করতে হবে একেবারে তৃণমূল বা ‘গ্রাসরুট’ পর্যায়ে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মূল পার্থক্যটা এখানেই।

রাজনীতি ডটকম: শিক্ষার মান নিয়ে কথা বললেই তো আমরা অবকাঠামো বা বই বিতরণের পরিসংখ্যান দেখি। এই যে বছরের শুরুতে বই উৎসব নিয়ে এত মাতামাতি, একে আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমরা জাতি হিসেবে নিজেদের কোথায় নামিয়ে এনেছি, ভাবুন তো! আপনারা সাংবাদিকরাও প্রতি বছর ডিসেম্বরে একটা খবর খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেন— ‘এত কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে।’ যেকোনো সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেখা যায়, ফিতা কেটে বই উৎসব করা হচ্ছে এবং সেটাই বড় খবর। আমাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো দেশ দেখান, যারা বই বিতরণ নিয়ে এমন উৎসব বা গল্প ফাঁদে! শুধু তাই নয়, রেজাল্টের জন্যও ফিতা কাটা হয়।
আমি আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড থেকে শুরু করে জাপানের মতো দেশে দেখেছি, স্কুলের প্রথম দিন যখন একটি শিশু ক্লাসে যায়, তার ডেস্কের ওপর সব বই আগে থেকেই সাজানো থাকে। শুধু বই নয়; খাতা-রং পেনসিল, এমনকি খেলার ক্লে বা মাটিও টেবিলের নিচে প্রস্তুত থাকে। স্কুল হয়ে ওঠে আনন্দের জায়গা, যেখানে শিশু স্কুলে গিয়ে দেখবে যে গতকাল সে যেখান থেকে ছবি আঁকা শেষ করেছিল, আজও সেখান থেকেই শুরু করতে পারছে। কিন্তু আমরা সেই জায়গায় নেই, আমরা আছি ‘বইয়ের ব্যবসায়’, কনটেন্ট নিয়ে অহেতুক বিতর্কে।
আমাদের এখানে মুক্তচিন্তার সুযোগ রাখা হয়নি। আমরা ধরে নিয়েছি, বইয়ে যা ছাপা হয়েছে সেটাই বেদবাক্য। অথচ জ্ঞান বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান ছড়িয়ে আছে সবখানে। সমাজ, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, এমনকি আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চর্চা থেকেও জ্ঞান অর্জিত হয়। পারিবারিক শিক্ষা বা কালচার থেকেও জ্ঞান আসে।
রাজনীতি ডটকম: আপনি কারিকুলাম বা কাঠামোগত যে ত্রুটির কথা বললেন, সেখান থেকে উত্তরণের উপায় কী?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: সমাধানের শুরুটা খুব মৌলিক জায়গা থেকে করতে হবে। ধরুন, আপনার নিজের সন্তানের জন্য আপনি কেমন শিক্ষক চান? সেটিই মূল প্রশ্ন। বাংলাদেশের এখন প্রধান কাজ হওয়া উচিত ঠিক সেই মানের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া, তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং যথাযথ জায়গায় পদায়ন করা।
আমরা যদি আজই এই প্রক্রিয়া শুরু করি, তবু উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষ শিক্ষার্থীদের একটি মানসম্মত ‘সাপ্লাই চেইন’ তৈরি করতে অন্তত ২০ বছর সময় লাগবে। এই ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতিকে বিশ্বাস করতে হবে যে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানো অপরিহার্য। একইসঙ্গে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত যত ‘নন-কোয়ালিটি এলিমেন্ট’ বা অযোগ্য উপাদান ও ব্যক্তি আছে, তাদের সরিয়ে দিতে হবে বা ‘সাইডলাইন’ করতে হবে। তাদের এই ব্যবস্থার মধ্যে রেখে আপনি কখনোই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবেন না।

রাজনীতি ডটকম: বাজেট বাড়ানোর কথা তো সবাই বলেন। কিন্তু বর্তমানে যে বাজেট বরাদ্দ থাকে, সেটারও তো সঠিক ব্যবহার আমরা করতে পারি না।
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: না, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। আমাদের বাজেটের মূল ফোকাস অবকাঠামো উন্নয়ন। আমরা দালানকোঠা বানাচ্ছি, নতুন নতুন প্রযুক্তি কিনছি এবং এগুলো দেখিয়েই বলছি যে শিক্ষার পেছনে খরচ করছি। কিন্তু এই অবকাঠামো বা প্রযুক্তি যারা ব্যবহার করবেন, সেই ‘হিউম্যান রিসোর্স’ বা মানবসম্পদের উন্নয়নে আমরা কার্যকর কিছুই করতে পারিনি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা নেতিবাচক দিক হলো— আমরা শিক্ষকদের অবহেলা করেছি। অথচ শিক্ষার যেকোনো পরিবর্তন বা ‘ট্রান্সফরমেশন’ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শিক্ষকেরই থাকার কথা।
রাজনীতি ডটকম: এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে আটকে আছে? আমরা কেন আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো— আমরা একে পুরোদস্তুর একটি ‘ফলাফলমুখী’ বা ‘রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড’ ব্যবস্থায় পরিণত করেছি। আমাদের চর্চার মধ্যে এমন অনেক কিছুই ঢুকে গেছে, যা আসলে সভ্যতার সাথে মানানসই নয় এবং এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা আমাদের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি। আমাদের দেশে একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তাকে ভবিষ্যতের শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে শিক্ষক হিসেবে ভাবা হচ্ছে তার একাডেমিক ফলাফল বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অ্যালাইনমেন্টের ওপর ভিত্তি করে। ফলে শিক্ষকদের যোগ্যতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

বাইরের দেশে বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের সবার জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সমান ও উন্মুক্ত থাকে, সে লিবারেল আর্টস পড়ুক বা বিজ্ঞান। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এলেও একটা পর্যায়ে তাদের একীভূত হওয়ার সুযোগ থাকে। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এই ইন্টিগ্রেশনটা করতে পারিনি। উলটো আমরা মাদরাসা শিক্ষাকে পছন্দ করছি না, ইংরেজি মাধ্যমকে বাঁকা চোখে দেখছি, আবার বাংলা ও ইংরেজির মিশ্র মাধ্যমকেও কাজের মনে করছি না। এমনকি আমাদের মূলধারা বা বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষাও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারছে না।
এই ব্যর্থতার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে আমাদের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের। ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে আমরা পুরো জাতি একটি রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড ব্যবস্থার মধ্যে আটকে গেছি, যেখানে ভালো জিপিএ পাওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য, যা দিনশেষে আমাদের কেবল একটি মিথ্যে তৃপ্তি দিচ্ছে।
রাজনীতি ডটকম: ফলাফল প্রসঙ্গে আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। টপ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিজিপিএ-৪ পেতে হলে ৯০-এর বেশি নম্বর পেতে হয়। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৮০ পেলেই চলে। এতে কি চাকরির বাজারে কি কোনো বৈষম্য তৈরি হয়?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আসলে ৯০-এর বেশি না, আমাদের এখানে সিজিপিএ-৪ পেতে ৯৩ নম্বর লাগে। আমরা এই মানের ব্যাপারে কোনো আপস করতে চাই না, যদিও আমাদের ওপর রাষ্ট্রের কিছুটা চাপ আছে। এখন প্রশ্ন হলো— এতে চাকরিতে বৈষম্য হয় কি না?
আমার মতে, একদমই না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা কম সিজিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও অনেক ভালো ভালো জায়গায় কাজ করছে। কারণ নিয়োগকর্তারা জানেন, একটি প্রতিষ্ঠানের ‘সি প্লাস’ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ‘এ মাইনাস’-এর চেয়ে গুণগত মানে ভিন্ন হতে পারে। একে বলা হয় ‘আমেরিকান মেথড’, যেখানে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা বা অ্যাপটিটিউড যাচাই করা হয়, কেবল নম্বর নয়।
আমাদের মূল সমস্যা হলো— আমরা লেটার গ্রেড বা সিজিপিএকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছি। লেটার গ্রেড কোনো সাধারণ সংখ্যার রূপান্তর নয়, এটি একটি ‘রিলেটিভ গ্রেডিং’ বা আপেক্ষিক মূল্যায়ন। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এমন শিক্ষক বা ফ্যাকাল্টি মেম্বার পাওয়া কঠিন যারা এই ‘রিলেটিভ গ্রেডিং’ বা আপেক্ষিক মূল্যায়নের বিষয়টি পুরোপুরি বোঝেন।

প্রশ্ন: পাস করার পর শিক্ষার্থীদের চাকরির নিশ্চয়তা বা প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা কীভাবে দেখেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: প্লেসমেন্ট বা কর্মসংস্থানের ধারণাটি আমাদের দেশ এখনো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ২০১৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমস একটি শিরোনাম করেছিল— ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হ্যাজ আ প্রবলেম, দেয়ার আর টু মেনি ইয়াংস।’ অর্থাৎ বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সংকট তরুণ জনসংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া। আর এই তরুণদের বিশাল অংশের বাস আমাদের সাউথ এশিয়া বা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এ।
এখানে আমরা ‘গ্লোবাল নর্থ’ ও ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য দেখছি। একদিকে উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটছে, এআই, ডিপ লার্নিং, মেশিন লার্নিং এবং স্মার্ট টেকনোলজির মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৩২ লাখ তরুণকে এক প্রকার ‘পার্ক’ করে রেখেছি।
আমি কোনো বিষয়কে ছোট করছি না বা অবমাননা করছি না। কিন্তু প্রশ্ন হলো— বর্তমান বাজারের চাকরির চাহিদা অনুযায়ী কি আমরা গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি? প্রকৃতপক্ষে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ‘ফলস ইগো’ বা ভ্রান্ত অহংবোধ তৈরি করে দিচ্ছে।
আমরা শিক্ষার্থীদের এমন মানসিকতা দিতে পারিনি যে মাস্টার্স পাস করার পর প্রয়োজনে সে কোনো সামাজিক কাজে যুক্ত হবে বা ছোট কোনো উদ্যোগ নেবে। বরং এই ব্যবস্থা পাইকারি হারে মাস্টার্স ডিগ্রি দিচ্ছে। শিক্ষার্থীও ভাবছে, যেহেতু এই ডিগ্রিই তার সম্বল, তাই তাকে বিসিএস ক্যাডার বা বড় কোনো পদে চাকরিই করতে হবে। এই মানসিকতাই তাদের কর্মক্ষম বা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে বড় বাধা।
রাজনীতি ডটকম: মেধাবীদের দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়ছে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের আমরা যেমন ধরে রাখতে পারছি না, তেমনি ফিরিয়েও আনতে পারছি না। সমস্যাটা আসলে কোথায়?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: যারা বিদেশে যাচ্ছে, তাদের জোর করে দেশে রেখে দিলে কী হতো? বাস্তবতা হলো— তারা এখানে পুরোপুরি অব্যবহৃত বা ‘আনইউটিলাইজড’ অবস্থায় থাকত। তাদের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত শিল্পখাত বা করপোরেট কাঠামো আমাদের দেশে এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
এ ক্ষেত্রে চীন, ভারত, তুরস্ক বা মালয়েশিয়াকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়। এই দেশগুলো একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছে। পরে তারা যখন উন্নত বিশ্বের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তখন রাষ্ট্রগুলো সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে তাদের ফিরিয়ে এনেছে। চীন অনেক পরে এই কৌশল নিয়েছে, ভারতও তাদের এনআরআই (নন-রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান) পলিসির মাধ্যমে শত বছর পর তাদের মেধাবীদের ফিরিয়ে আনছে।
এখানেই আমাদের দুর্বলতাটা বড়। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনো বিদেশফেরত দক্ষ পেশাজীবীদের বরণ করে নেওয়ার মতো উদার বা ‘ওপেন’ হতে পারেনি। তাদের ক্যারিয়ার গড়ার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ রাষ্ট্রের মধ্যে কম। তবু দেশের করপোরেট সেক্টর বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে তাকালে দেখবেন, বিদেশফেরত অনেকেই সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা সর্বাধুনিক জ্ঞান-প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। দুর্ভাগ্যবশত সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো দ্বার উন্মুক্ত রেখেছে।

রাজনীতি ডটকম: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বা রাজনৈতিক সচেতনতা কীভাবে বিকশিত হবে বলে মনে করেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমার ব্যক্তিগত মত— প্রতিটি ছাত্রের বা মানুষেরই রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা উচিত। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে প্রতিবাদ করে। তারা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে সোচ্চার। কিন্তু আমাদের দেশে ক্যাম্পাসের ভেতরে যে ধাঁচের রাজনীতি হয়, আমেরিকায় সেটা নেই বললেই চলে। তারা দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ক্যাম্পাসের ভেতরে চর্চা করে না।
আমাদের দেশে একসময় ধারণা করা হতো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বোধহয় দেশপ্রেমিক নয় বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয়। তারা দেশের কোনো সংকটে এগিয়ে আসে না। কিন্তু আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে উলটো কথা। কোটা সংস্কার আন্দোলন বা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দাবির ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ও প্রকাশের ভঙ্গিটি হয়তো আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক প্র্যাকটিসের চেয়ে ভিন্ন, কিন্তু তাদের সচেতনতার কোনো অভাব নেই।
রাজনীতি ডটকম: রাজনীতি ছাড়া কি রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠা সম্ভব? প্রস্তাবিত আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালুর যে কথা বলা হয়েছে, আপনি কি তা সমর্থন করেন?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আমরা ক্যাম্পাসে কে বামপন্থি বা কে ডানপন্থি— এসব নিয়ে তর্কে যাই না। আমরা মনে করি, যে শিক্ষার্থী পড়তে এসেছে তার পড়ার অধিকারটাই প্রধান। সে যদি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করতে চায়, সেটা ক্যাম্পাসের বাইরে করুক, তাতে আমাদের বাধা নেই। কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে দলীয় রাজনীতি চর্চাকে আমরা সমর্থন করি না। আমাদের ক্যাম্পাস সবার জন্য উন্মুক্ত। আমরা যদি কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা বয়ান সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চাই, তবে কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়া সম্ভব হবে না।

রাজনীতি ডটকম: নর্থ সাউথসহ দেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার খরচ অনেক বেশি। যাদের এই ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য আপনাদের দরজা কি বন্ধ?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: নর্থ সাউথ বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি— এটি সত্য। টিউশন ফি’র দিক থেকে আমরা হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে আছি। কিন্তু খরচের উলটো পিঠে আরেকটি চিত্রও আছে। আমরাই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়িয়েছি। এই সংখ্যা প্রায় ১৮০০।
আমি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আর্থিক সহায়তার পরিধি অনেক বাড়িয়েছি। আগে সেমিস্টারে এ সংক্রান্ত মিটিং হতো একটি, এখন আমরা তিনটি করে মিটিং করি। প্রতি মিটিংয়ে ২০০-৩০০ আবেদন আসে এবং যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রায় ৯৫ শতাংশ আবেদনই আমরা মঞ্জুর করি।
আমাদের সহায়তা মূলত দুই ধরনের, মেধাভিত্তিক ও প্রয়োজনভিত্তিক। পড়ালেখা চলাকালে কোনো শিক্ষার্থী যদি মা-বাবার কোনো একজনকে হারায়, আমাদের নিয়মে তার টিউশন ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫০ শতাংশ মওকুফ হয়ে যায়। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১০০ শিক্ষার্থীকে আমরা ফান্ডিং করেছি, ৩৫০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে অ্যাপোলোসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।

রাজনীতি ডটকম: গবেষণার দিক থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগতি কতদূর? কমিউনিটি বা সমাজের জন্য এই গবেষণাগুলো কতটা কাজে আসবে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: নর্থ সাউথ এখন কেবল পাঠদান নয়, বরং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। গত ১০ বছরে আমরা গবেষণায় যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা সত্যিই গর্ব করার মতো।
আমরা কানাডিয়ান ফান্ডিংয়ে বঙ্গোপসাগরের ‘সুনামি আর্লি রেসপন্স সিস্টেম’ বা সুনামির আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের গবেষকরা মেশিন লার্নিং বা এআই ব্যবহার করে নারীদের স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন। ব্রেইন সার্জারির সময় নিউরাল ফাংশন কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
এমনকি ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়েও আমরা কাজ করছি। এগুলো সবই ‘কমিউনিটি ড্রিভেন রিসার্চ’ বা জনকল্যাণমুখী গবেষণা, যা দেশের মানুষের কাজে আসবে।

রাজনীতি ডটকম: নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এখন একটি ব্র্যান্ড। এ অবস্থানে পৌঁছে আপনারা কি সন্তুষ্ট?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: এটি একটি ৩২ বছরের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়, যা একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা এখানে নেই। বরং আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের জন্য কাজ করছি। কিউএস র্যাংকিংয়ে ১০০ ধাপ এগোনোসহ আমরা কিছু সাফল্যের গল্প হয়তো বলি, কিন্তু কখনোই দাবি করি না যে আমরা সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে গেছি। কারণ সেটি বলার অর্থই হলো অগ্রগতির চাকা থেমে যাওয়া।
আমি বিশ্বাস করি, উন্নতি একটি চলমান যাত্রা। এটি একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া। আপনি যেখানেই পৌঁছান না কেন, সবসময়ই দেখবেন উন্নতির আরও অবকাশ বা সুযোগ রয়ে গেছে। তাই থেমে যাওয়ার বা তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।

রাজনীতি ডটকম: বর্তমানে সবাই উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বলছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ বিষয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের দেশে ‘সিড মানি’ বা প্রারম্ভিক পুঁজির সংকট এবং বিভিন্ন বাধার কারণে স্টার্টআপ বা ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়া কঠিন। শুধু উৎসাহ দিয়ে কি এই সমস্যার সমাধান হবে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: অধ্যাপক ইউনূস কিন্তু শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের সামনে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তার কথার মূল সুরটা বুঝতে হবে। তিনি মূলত তরুণদের ভবিষ্যৎ চাহিদায় জোর দিয়েছেন। তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে ছুটবে না, তাদের কিছু করার সুযোগ করে দিতে হবে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমরা সে চেষ্টাটা করছি। গত ছয় মাসে আমাদের ক্যাম্পাস থেকে বেশ কয়েকটি বিজনেস বা স্টার্টআপ তৈরি হয়েছে, যারা এখন নিজেরাই ‘এমপ্লয়ার’ হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বের নামকরা কোম্পানিগুলো তাদের আইডিয়া দেখে ফান্ডিং দিচ্ছে। এগুলোকে আমরা বলি ‘এনএসইউ স্টার্টআপ’। কিন্তু সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই তরুণদের তাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজনীতি ডটকম: ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক বা জোবরা গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে শুরু করেছিলেন। কিন্তু যাদের পারিবারিক সমর্থন নেই, সেই প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণরা কীভাবে অফিস বা প্রাথমিক খরচ মেটাবে?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: এখানে দুটি দিক আছে— এক, ড. ইউনূসের ‘নবীন উদ্যোক্তা’ কনসেপ্ট। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের সন্তানরা যখন নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে আসে, তাদের সিড ফান্ডিং বা ক্যাপিটাল দেওয়া হয়। এটি বেশ সফল।
দুই, নর্থসাউথের উদাহরণ দিই। আমাদের কোনো ছাত্র বা ছাত্রদের দল যখন কোনো ‘ক্রিয়েটিভ আইডিয়া’ নিয়ে আসে, বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রথমে একটি অফেরতযোগ্য সিড ফান্ড দেয়। এরপর আমরা তাদের শেখাই কীভাবে গ্লোবাল বডি বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে ফান্ড ‘অ্যাট্রাক্ট’ করতে হয়।
আমাদের ক্যাম্পাস থেকে উঠে আসা প্রায় ৪০-৪২ জন সফল উদ্যোক্তা আছেন। আপনারা চালডাল, শেয়ারট্রিপ, নগদ, হাঙ্গরিনাকি বা পাঠাওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম শুনেছেন। এদের অনেকেই ৭০০-৮০০ বা ১০০০ কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। অর্থাৎ এরা শুধু নিজেরা স্বাবলম্বী হয়নি, অন্যের কর্মসংস্থানও করেছে।

রাজনীতি ডটকম: কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কি উদ্যোক্তা তৈরিতে বা নীতিগত জায়গায় কোনো মৌলিক অগ্রগতি হয়েছে? নাকি শুধুই কথা বা আওয়াজ শুনেছি?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: মৌলিক কোনো অগ্রগতি হয়নি, এটা সত্য। ড. ইউনূস যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চালাচ্ছেন, আমার মনে হয় তিনি সচেতনভাবেই তার ‘প্রমোটেড’ কোনো কনসেপ্ট রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চাপিয়ে দিতে চাননি, যেন রাজনৈতিক বিতর্ক না হয়। কিন্তু তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন।
তবে হ্যাঁ, আপনারা বিনিয়োগ বোর্ডের বা অন্য কিছু ক্ষেত্রে যা দেখেছেন, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই ফানুস বা শুধুই প্রেজেন্টেশন ছিল। কাজের কাজ খুব একটা হয়নি।
রাজনীতি ডটকম: তাহলে এই পরিস্থিতি বদলাবে কীভাবে? শিক্ষাব্যবস্থায় কি কোনো পরিবর্তন দরকার?
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: অবশ্যই। আমরা যারা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, আমরা বলছি শিক্ষাব্যবস্থায় ইনোভেশন ও এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ যুক্ত করতে হবে। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বা ‘স্কিল’ দিতে হবে। তাদের আমাদের দেশের চাহিদা অনুযায়ী খাতগুলোর জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের একাধিক উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, আমাদের শেকড় কৃষির সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাতে পারলে দারুণ কিছু সম্ভব।
দিন শেষে আমি বলব, রাষ্ট্রের যত সমস্যা, তার প্রধান দায়ভার আমাদের বা শিক্ষাব্যবস্থার। কারণ আমরা সার্টিফিকেটধারী লোক তৈরি করছি বটে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত বা দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারছি না। এই সার্টিফিকেটগুলো একজন ব্যক্তিকে কেবল এক ধরনের ‘ফলস প্রাইড’ বা মিথ্যা গর্ব ছাড়া আর কিছুই দিচ্ছে না।
রাজনীতি ডটকম: রাজনীতি ডটকমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী: আপনাদের এবং রাজনীতি ডটকমের পাঠক-দর্শকদেরও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ নামক পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করিলেই মানুষ অতি অল্প বয়সে দুইটি মৌলিক শিক্ষা লাভ করে। প্রথমত, লাইনে দাঁড়াইয়া কাজ আদায় একটি কাব্যিক কল্পনামাত্র; বাস্তব জীবনে ইহার কার্যকর অস্তিত্ব নাই। দ্বিতীয়ত, যন্ত্র হউক বা মানুষ— উভয়ের ক্ষেত্রেই সামান্য তৈল না ঢালিলে চাক্র ঘূর্ণায়মান হয় না। এই তৈলই হইল চাটুকা
৭ দিন আগে
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন থেকে অন্য কোনো বেতনের চাকরি বা অর্থপ্রাপ্তির কাজে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। নীতিমালার ১১ নম্বর ধারা এবং ১৭ উপধারা (ক) ও (খ)-এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আর
৮ দিন আগে
খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায়।
১০ দিন আগে
প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?
১১ দিন আগে