অধ্যাপক সাখাওয়াতের জীবন ও উত্তরাধিকার— নিভে গেলেও পথ দেখাবে আলোর বাতিঘর

বিল্লাল বিন কাশেম

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষা ও গণমাধ্যমচর্চার ইতিহাসে কিছু নাম চিরস্থায়ী আলোর মতো জ্বলজ্বল করে। তাদের জীবন শুধু একটি পেশার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একটি সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক হয়ে ওঠে। তেমনই একজন আলোকিত মানুষ ছিলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। তার ইন্তেকালের সংবাদ আমাদের গণমাধ্যম জগৎ, বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ এবং অসংখ্য ছাত্র-শিষ্যের হৃদয়ে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না; ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক, একজন বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাতা ও নৈতিক সাংবাদিকতার এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর।

রোববার (৮ মার্চ) রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক সাখাওয়াত। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। কয়েক দিন আগে স্ট্রোক করার পর চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়েছে এই শিক্ষাগুরুকে। তিনি রেখে গেছেন তার স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, দুই নাতি ও হাজার হাজার ছাত্র-শিষ্যকে, যারা তার আদর্শ, শিক্ষা ও মূল্যবোধের উত্তরাধিকার বহন করে চলবে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষা যেভাবে একটি শক্তিশালী একাডেমিক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার পেছনে যাঁদের অবদান অগ্রগণ্য, তাদের মধ্যে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান অন্যতম। তার জীবনকে একটি বাক্যে সংক্ষেপ করা যায় এভাবে— তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল সেতুবন্ধন।

১৯৪১ সালের ৩০ নভেম্বর নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধনুয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, অনুসন্ধিৎসু ও সত্যসন্ধানী মননের অধিকারী। ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এবং ঢাকা কলেজে তার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো অতিক্রান্ত হয়।

পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাজীবনের এই বহুমাত্রিকতা তাকে গড়ে তোলে এক গভীর চিন্তাশীল ও বিশ্লেষণধর্মী ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

ছাত্র অবস্থাতেই সাংবাদিকতায় যুক্ত হন অধ্যাপক সাখাওয়াত। প্রায় এক দশক ধরে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছেন। প্রতিবেদক থেকে শুরু করে সম্পাদনা— সংবাদপত্রের প্রতিটি স্তরে পেশাদারি দক্ষতা তাকে একজন প্রাজ্ঞ সংবাদকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ অভিজ্ঞতা পরে তার শিক্ষকতা জীবনের জন্য হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ। তিনি ছাত্রদের শুধু তত্ত্ব শেখাননি, বরং বাস্তব সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও সাহসের শিক্ষা দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত ছিলেন সবার কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। ১৯৬২ সালে যখন এ বিভাগের যাত্রা শুরু হয়, তখন তিনি ছিলেন এর প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের একজন। ১৯৬৩ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একই বছরে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৭০ সালে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেই থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, যা প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন নির্মাতা। তার হাতে গড়ে ওঠে সাংবাদিকতা বিভাগের নতুন এক একাডেমিক ভিত্তি। তার উদ্যোগেই সাংবাদিকতা বিভাগে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

তার সময়েই বিভাগটির নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ’ হয়। তার আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল ডিপ্লোমা কোর্সের পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালু করা। পরে সেটিই চার বছর মেয়াদি অনার্স প্রোগ্রামে রূপ নেয়। এ পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংযুক্ত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যার ক্লাস শুধু একটি পাঠ নয়, ছিল একটি অনবদ্য অভিজ্ঞতা। তার শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বলতেন, তার ক্লাস ছিল ‘আনন্দপাঠ’। কারণ শ্রেণিকক্ষে তিনি কেবল বক্তৃতা দিতেন না, তিনি প্রশ্ন করতেন, বিতর্ক সৃষ্টি করতেন, চিন্তার দরজা খুলে দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন— সাংবাদিকতার শিক্ষা মানে কেবল তথ্য সংগ্রহের দক্ষতা নয়; এটি নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা।

অধ্যাপক সাখাওয়াত বলতেন, ‘সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।’ এ দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার জীবনও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে তার বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ঘাঁটিতে পরিণত হয়। তিনি শুধু দর্শক হয়ে থাকেননি, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর তার লেখা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা অধ্যাপক সাখাওয়াতের সাংবাদিকতা দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি বারবার বলেছেন, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন একজন গবেষকও। দেশি-বিদেশি জার্নালে তার ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল ‘সাংবাদিকতা ও রাজনীতির মিথস্ক্রিয়া’।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে কাজ করেছেন। বিশ্বের অন্তত ১৫টি দেশে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষা ও গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে।

অধ্যাপক খান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ছিলেন। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সমাজ সচেতনাতেও পিছিয়ে ছিলেন না অধ্যাপক সাখাওয়াত। তিনি কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক সংগঠন সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল ও প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

একজন শিক্ষককে তার ছাত্রদের সাফল্য দিয়ে বিচার করা হয়। সে বিবেচনাতেও অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের উত্তরাধিকার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তার ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন উপাচার্য, রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী, সচিব, সম্পাদক, বিচারক এবং দেশের গণমাধ্যম জগতের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এ সব কৃতী মানুষদের সাফল্যের পেছনে কোথাও না কোথাও তার শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা কাজ করেছে।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মৃত্যু তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি একটি যুগের অবসান। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন একটি নৈতিক আন্দোলন হিসেবে; যেখানে সত্য, মানবিকতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। আজকের পৃথিবীতে যখন গণমাধ্যম নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন তার মতো শিক্ষকের আদর্শ আরও বেশি প্রয়োজন।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার চিন্তা, তার শিক্ষা ও তার আদর্শ আমাদের সঙ্গে থাকবে। তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার শিক্ষক, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা— তিনি ছিলেন সত্যের শিক্ষক।

আজ তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। কিন্তু একই সঙ্গে কৃতজ্ঞও; কারণ তিনি আমাদের একটি আলোকিত উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন। সত্য, নৈতিকতা ও মানবিকতার সেই আলো হয়তো একদিনও নিভে যাবে না। কারণ আলোর মানুষরা চলে গেলেও তাদের আলো থেকে যায়— প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখানোর জন্য।

লেখক: কবি, গল্পকার ও গণসংযোগবিদ

[email protected]

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ‘সার-বিদ্যুৎ রাজনীতি’: ইতিহাস কি আবার ফিরে আসছে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময়গুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বড় যুদ্ধের সময়কাল মিলে গেছে, যার প্রভাব দেশের কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে অনুভূত হয়েছে। ফলে এসব সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।

৪ দিন আগে

বেলুচ সমস্যা ও তার সমাধান

বেলুচরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা। ইংরেজ আমলেও তাদের শাসন করা হতো পরোক্ষ স্বাধীনতা বা সমঝোতার মাধ্যমে। এই পরোক্ষ স্বাধীনতার অর্থ ‘পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন’ও হতে পারে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কালে তার মর্যাদা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের। কিছুদিন পর একে অনেকটা বলপূর্বক পাকিস্তানের অংশ করে নেওয়া

৫ দিন আগে

৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার প্রতিবাদে উত্তাল মুক্তিপাগল বাঙালি

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির শেষ পর্ব একাত্তরের মার্চ মাস। ১৯৬২ সালে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে গঠিত হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। ছাত্রলীগের ভেতরের এই গোপন সংগঠন প্রতিটি আন্দোলনেই সক্রিয়। ধাপে ধাপে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে স্বাধীনতার পথে।

৫ দিন আগে

অগ্নিঝরা মার্চ জুড়েই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ৪ তারিখও ছিল ঘটনাবহুল। প্রতিদিনই সেনাবাহিনীর বেপরোয়া নির্মম আচরণ চলতে থাকে। জবাবে বাঙালি আরও বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। আগের দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিকামী বাঙালিকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন ছাত্রনেতারা।

৬ দিন আগে