
ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

আমাদের ছোটবেলায় ‘বেলুচিস্তান’কে সমাসবদ্ধ করতে বলতাম— ‘যে স্থানে লুচি (খাদ্যবস্তু) নেই, তা হলো বেলুচিস্তান’!
সে ছোটবেলার হাস্যরস। ক্রমশ জেনেছি, বেলুচ একটি জাতিসত্তা, যার রয়েছে একটি ঐতিহ্যময় ইতিহাস। দেশটির অধিকাংশ মানুষ সুন্নি মুসলমান, তবে বেলুচ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় খুব বেশি নয়। এ কথাও জেনেছি, বেলুচিস্তানের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনার চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ প্রবণতাই বেশি।
বেলুচরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা। ইংরেজ আমলেও তাদের শাসন করা হতো পরোক্ষ স্বাধীনতা বা সমঝোতার মাধ্যমে। এই পরোক্ষ স্বাধীনতার অর্থ ‘পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন’ও হতে পারে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কালে তার মর্যাদা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের। কিছুদিন পর একে অনেকটা বলপূর্বক পাকিস্তানের অংশ করে নেওয়া হলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রামের সূচনা হয়।
পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের একটি হিসেবে বেলুচিস্তানের পরিচিতি গড়ে ওঠে। ১৯৫৬ সালে ওয়ান ইউনিট প্রথা চালু হলে তার প্রাদেশিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়। অবিভক্ত পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বেলুচিস্তান আবার প্রদেশের মর্যাদা ফিরে পায়। তবে বেলুচরা স্বশাসনের সুযোগ খুব কমই লাভ করে।
পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা যেমন বিভিন্ন কারণে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও তাদের বশংবদ স্থানীয় শাসকদের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত, ক্রোধান্বিত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল; তেমনি পাকিস্তানের বেলুচ, সিন্ধি ও পাখতুনরাও সময়-সুযোগে অনুরূপ আচরণ প্রদর্শন করত। সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশ হিসেবে তাদের আবির্ভাবের সম্ভাবনা ছিল সীমিত। তদানীন্তন পূর্ববাংলার ভৌগোলিক ও মনোজাগতিক অবস্থান ছিল ভিন্নতর।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকেই বাঙালিদের স্বতন্ত্র পরিচিতি হারানোর আশঙ্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা জাগে। এরপর ১৯৬১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্যে ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন গঠিত হয়, যা পরবর্তী এক বছরে বিএলএফ নামে কর্মযজ্ঞ শুরু করে। ১৯৬৫ সালের দিকে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের উদ্ভব ঘটে। তারপর আসে নিয়মতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার দলিল—৬ দফা।
জি এম সৈয়দের নেতৃত্বে সিন্ধুতেও আত্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলন শুরু হয় এবং বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) নেতৃত্বে বেলুচিস্তানে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে ওঠে। ষাটের দশকেই বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের অনুরূপ বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্টের জন্ম হয়।
সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধে বাঙালিরা স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু বেলুচরা এখনো পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পাঞ্জাবি শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়োজিত, যা নিয়মতান্ত্রিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র সশস্ত্র সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে। বেলুচদের বন্দুকের নল শুধু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের বিরুদ্ধেই নয়, চীনের প্রতিও তাক করা হয়েছে। তারা পাকিস্তানের মতো চীনকেও শোষক-শাসকদের সহযোগী মনে করছে। মূলত এই অবস্থান নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সরকার দমন-পীড়ন ত্বরান্বিত করার পরও বেশ কয়েক দফা আত্মঘাতী ট্রেন আক্রমণের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে।
সর্বশেষ ট্রেন হামলার ব্যাপকতা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। পাকিস্তান অধিকতর মারমুখী অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের অনুরূপ খুন, গুম, নির্যাতন ও নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তান ভেবে নিয়েছে, এ ধরনের আচরণে বেলুচদের দুর্বল করে পরিণামে সমঝোতায় আনা যাবে। হয়তো তারা এই জ্ঞান আয়ারল্যান্ড, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কা বা ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে।
বিএলএ বা বিএলএফের সমান্তরালে গণআন্দোলনে যুক্ত ডা. মেহরাঙ বেলুচ ও দীন বেলুচ করাচিতে গ্রেপ্তার হলে গণআন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে প্রদেশটি। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন জাতীয়তাবাদী নেতা আখতার মেঙ্গল, যিনি নিজ প্রদেশে ও কেন্দ্রে সমালোচিত হচ্ছেন। তার ভূমিকা অনেকটা বাংলাদেশের তদানীন্তন ৬ দফার সমান্তরালে ৮ দফাধারীদের অনুরূপ।
পরিস্থিতির অবনতিতে পাকিস্তান সরকার চরমপন্থা নিতে প্রস্তুত। এরূপ চরম ব্যবস্থাই বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সশস্ত্র যুদ্ধে রূপান্তর করেছিল। শুরু থেকেই পূর্ব-পশ্চিমের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এবং সম্ভবত প্রতিবেশীর সমর্থনে বাঙালিদের বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও বেলুচদের অবস্থা তদ্রূপ নয়। তারা দেশের ৪৪ ভাগ ভূমির মালিক এবং পাকিস্তানের কোলঘেঁষা প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার বিরাট অংশ জাতিগত বেলুচ নয়।
তাদের সীমান্ত ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে, কিন্তু সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় নয়। পাকিস্তানের মতে বেলুচরা ভারতের মদতপুষ্ট। অভিযোগটি সম্পূর্ণ অসত্য নাও হতে পারে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সেভেন সিস্টার), পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও দক্ষিণ ভারতে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনে মদতের অভিযোগও রয়েছে।
বেলুচিস্তানের সঙ্গে ভারতের কোনো অভিন্ন সীমান্ত নেই। প্রতিশোধ হিসেবে ভারত যদি বেলুচ বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়েও থাকে, তার কার্যকারিতা সীমিত। তবে সিন্ধুর সঙ্গে বেলুচিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। সিন্ধুরা যদি বেলুচদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তাহলে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অর্থের অনুপ্রবেশে ভারতের সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তাহলে অবস্থার সঙ্গীনতা আরও বাড়বে, কমবে না; এবং বেলুচিস্তান ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের রূপও ধারণ করতে পারে।
তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাঙালিদের সফলতা যতটা নিশ্চিত ছিল, বেলুচদের অবস্থা ততটাই অনিশ্চিত। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শুরু করে একমাত্র পূর্ব তিমুর ছাড়া আর কোনো অখণ্ড ও সংলগ্ন ভূখণ্ড থেকে নবীন রাষ্ট্রের জন্ম সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নতর ছিল। তবুও বাংলাদেশে বলপ্রয়োগের বিপরীতে যদি বাঙালির ৬ দফা যথাসময়ে মেনে নেওয়া হতো, তাহলে ইতিহাস অন্য ধারায় প্রবাহিত হতে পারত।
৬ দফার দফাওয়ারি বিষয়গুলো ছিল নিম্নরূপ—
প্রস্তাব–১: দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমন হতে হবে, যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির। সর্বজনীন ভোটে নির্বাচিত পার্লামেন্ট হবে সার্বভৌম।
প্রস্তাব–২: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে—দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর হাতে।
প্রস্তাব–৩: মুদ্রা বা অর্থ-সম্পর্কীয় ক্ষমতা। মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দুটির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে—
প্রস্তাব–৪: রাজস্ব, কর বা শুল্ক-সংক্রান্ত ক্ষমতা। ফেডারেশনের অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সে ক্ষমতা থাকবে না। তার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সকল করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
প্রস্তাব–৫: বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক ক্ষমতার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত নীতি অনুসরণ করতে হবে—
প্রস্তাব–৬: আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা। আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আধাসামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
এ লেখা শুরুর পরই মুক্তিযুদ্ধকালে পূর্বাঞ্চল থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার কপি চোখে পড়ল। আবুল হাসান চৌধুরী সম্পাদিত ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্টের সংখ্যায় ৬ দফা নিয়ে একটি সম্পাদকীয় পড়ে থমকে গেলাম। সেখানেও বেলুচ প্রসঙ্গ ছিল, যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল— আঞ্চলিক বৈষম্য ও অনুভূত শোষণের সম্মানজনক সমাধান হলো পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন।
সে লেখায় পর্যবেক্ষণ ছিল— শুধু বেলুচিস্তান নয়, পৃথিবীর যেখানে অন্যায়-অবিচার, স্বৈরাচার ও আঞ্চলিক বৈষম্য প্রবল, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল উদাসীন এবং কেন্দ্রীয় সরকার পরম পরাক্রমশালী, সেখানে আঞ্চলিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের সমাধান ৬ দফাভিত্তিক কাঠামোতেই নিহিত। বেলুচিস্তানের মতো ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতাও দুরূহ। অনন্তকাল তাদের সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়বে, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হবে। সমাধান হিসেবে বাঙালিদের ৬ দফাই তাদের আদর্শ হতে পারে; কিন্তু অহমে তাড়িত পাকিস্তান কি তা করবে?
লেখক: শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো

আমাদের ছোটবেলায় ‘বেলুচিস্তান’কে সমাসবদ্ধ করতে বলতাম— ‘যে স্থানে লুচি (খাদ্যবস্তু) নেই, তা হলো বেলুচিস্তান’!
সে ছোটবেলার হাস্যরস। ক্রমশ জেনেছি, বেলুচ একটি জাতিসত্তা, যার রয়েছে একটি ঐতিহ্যময় ইতিহাস। দেশটির অধিকাংশ মানুষ সুন্নি মুসলমান, তবে বেলুচ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় খুব বেশি নয়। এ কথাও জেনেছি, বেলুচিস্তানের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনার চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ প্রবণতাই বেশি।
বেলুচরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা। ইংরেজ আমলেও তাদের শাসন করা হতো পরোক্ষ স্বাধীনতা বা সমঝোতার মাধ্যমে। এই পরোক্ষ স্বাধীনতার অর্থ ‘পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন’ও হতে পারে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কালে তার মর্যাদা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের। কিছুদিন পর একে অনেকটা বলপূর্বক পাকিস্তানের অংশ করে নেওয়া হলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রামের সূচনা হয়।
পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের একটি হিসেবে বেলুচিস্তানের পরিচিতি গড়ে ওঠে। ১৯৫৬ সালে ওয়ান ইউনিট প্রথা চালু হলে তার প্রাদেশিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়। অবিভক্ত পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বেলুচিস্তান আবার প্রদেশের মর্যাদা ফিরে পায়। তবে বেলুচরা স্বশাসনের সুযোগ খুব কমই লাভ করে।
পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা যেমন বিভিন্ন কারণে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও তাদের বশংবদ স্থানীয় শাসকদের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত, ক্রোধান্বিত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল; তেমনি পাকিস্তানের বেলুচ, সিন্ধি ও পাখতুনরাও সময়-সুযোগে অনুরূপ আচরণ প্রদর্শন করত। সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশ হিসেবে তাদের আবির্ভাবের সম্ভাবনা ছিল সীমিত। তদানীন্তন পূর্ববাংলার ভৌগোলিক ও মনোজাগতিক অবস্থান ছিল ভিন্নতর।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকেই বাঙালিদের স্বতন্ত্র পরিচিতি হারানোর আশঙ্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা জাগে। এরপর ১৯৬১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্যে ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন গঠিত হয়, যা পরবর্তী এক বছরে বিএলএফ নামে কর্মযজ্ঞ শুরু করে। ১৯৬৫ সালের দিকে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের উদ্ভব ঘটে। তারপর আসে নিয়মতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার দলিল—৬ দফা।
জি এম সৈয়দের নেতৃত্বে সিন্ধুতেও আত্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলন শুরু হয় এবং বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) নেতৃত্বে বেলুচিস্তানে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে ওঠে। ষাটের দশকেই বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের অনুরূপ বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্টের জন্ম হয়।
সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধে বাঙালিরা স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু বেলুচরা এখনো পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পাঞ্জাবি শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়োজিত, যা নিয়মতান্ত্রিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র সশস্ত্র সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে। বেলুচদের বন্দুকের নল শুধু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের বিরুদ্ধেই নয়, চীনের প্রতিও তাক করা হয়েছে। তারা পাকিস্তানের মতো চীনকেও শোষক-শাসকদের সহযোগী মনে করছে। মূলত এই অবস্থান নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সরকার দমন-পীড়ন ত্বরান্বিত করার পরও বেশ কয়েক দফা আত্মঘাতী ট্রেন আক্রমণের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে।
সর্বশেষ ট্রেন হামলার ব্যাপকতা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। পাকিস্তান অধিকতর মারমুখী অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের অনুরূপ খুন, গুম, নির্যাতন ও নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তান ভেবে নিয়েছে, এ ধরনের আচরণে বেলুচদের দুর্বল করে পরিণামে সমঝোতায় আনা যাবে। হয়তো তারা এই জ্ঞান আয়ারল্যান্ড, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কা বা ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে।
বিএলএ বা বিএলএফের সমান্তরালে গণআন্দোলনে যুক্ত ডা. মেহরাঙ বেলুচ ও দীন বেলুচ করাচিতে গ্রেপ্তার হলে গণআন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে প্রদেশটি। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন জাতীয়তাবাদী নেতা আখতার মেঙ্গল, যিনি নিজ প্রদেশে ও কেন্দ্রে সমালোচিত হচ্ছেন। তার ভূমিকা অনেকটা বাংলাদেশের তদানীন্তন ৬ দফার সমান্তরালে ৮ দফাধারীদের অনুরূপ।
পরিস্থিতির অবনতিতে পাকিস্তান সরকার চরমপন্থা নিতে প্রস্তুত। এরূপ চরম ব্যবস্থাই বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সশস্ত্র যুদ্ধে রূপান্তর করেছিল। শুরু থেকেই পূর্ব-পশ্চিমের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এবং সম্ভবত প্রতিবেশীর সমর্থনে বাঙালিদের বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও বেলুচদের অবস্থা তদ্রূপ নয়। তারা দেশের ৪৪ ভাগ ভূমির মালিক এবং পাকিস্তানের কোলঘেঁষা প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার বিরাট অংশ জাতিগত বেলুচ নয়।
তাদের সীমান্ত ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে, কিন্তু সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় নয়। পাকিস্তানের মতে বেলুচরা ভারতের মদতপুষ্ট। অভিযোগটি সম্পূর্ণ অসত্য নাও হতে পারে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সেভেন সিস্টার), পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও দক্ষিণ ভারতে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনে মদতের অভিযোগও রয়েছে।
বেলুচিস্তানের সঙ্গে ভারতের কোনো অভিন্ন সীমান্ত নেই। প্রতিশোধ হিসেবে ভারত যদি বেলুচ বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়েও থাকে, তার কার্যকারিতা সীমিত। তবে সিন্ধুর সঙ্গে বেলুচিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। সিন্ধুরা যদি বেলুচদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তাহলে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অর্থের অনুপ্রবেশে ভারতের সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তাহলে অবস্থার সঙ্গীনতা আরও বাড়বে, কমবে না; এবং বেলুচিস্তান ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের রূপও ধারণ করতে পারে।
তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাঙালিদের সফলতা যতটা নিশ্চিত ছিল, বেলুচদের অবস্থা ততটাই অনিশ্চিত। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শুরু করে একমাত্র পূর্ব তিমুর ছাড়া আর কোনো অখণ্ড ও সংলগ্ন ভূখণ্ড থেকে নবীন রাষ্ট্রের জন্ম সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নতর ছিল। তবুও বাংলাদেশে বলপ্রয়োগের বিপরীতে যদি বাঙালির ৬ দফা যথাসময়ে মেনে নেওয়া হতো, তাহলে ইতিহাস অন্য ধারায় প্রবাহিত হতে পারত।
৬ দফার দফাওয়ারি বিষয়গুলো ছিল নিম্নরূপ—
প্রস্তাব–১: দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমন হতে হবে, যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির। সর্বজনীন ভোটে নির্বাচিত পার্লামেন্ট হবে সার্বভৌম।
প্রস্তাব–২: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে—দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর হাতে।
প্রস্তাব–৩: মুদ্রা বা অর্থ-সম্পর্কীয় ক্ষমতা। মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দুটির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে—
প্রস্তাব–৪: রাজস্ব, কর বা শুল্ক-সংক্রান্ত ক্ষমতা। ফেডারেশনের অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সে ক্ষমতা থাকবে না। তার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সকল করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
প্রস্তাব–৫: বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক ক্ষমতার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত নীতি অনুসরণ করতে হবে—
প্রস্তাব–৬: আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা। আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আধাসামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
এ লেখা শুরুর পরই মুক্তিযুদ্ধকালে পূর্বাঞ্চল থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার কপি চোখে পড়ল। আবুল হাসান চৌধুরী সম্পাদিত ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্টের সংখ্যায় ৬ দফা নিয়ে একটি সম্পাদকীয় পড়ে থমকে গেলাম। সেখানেও বেলুচ প্রসঙ্গ ছিল, যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল— আঞ্চলিক বৈষম্য ও অনুভূত শোষণের সম্মানজনক সমাধান হলো পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন।
সে লেখায় পর্যবেক্ষণ ছিল— শুধু বেলুচিস্তান নয়, পৃথিবীর যেখানে অন্যায়-অবিচার, স্বৈরাচার ও আঞ্চলিক বৈষম্য প্রবল, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল উদাসীন এবং কেন্দ্রীয় সরকার পরম পরাক্রমশালী, সেখানে আঞ্চলিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের সমাধান ৬ দফাভিত্তিক কাঠামোতেই নিহিত। বেলুচিস্তানের মতো ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতাও দুরূহ। অনন্তকাল তাদের সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়বে, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হবে। সমাধান হিসেবে বাঙালিদের ৬ দফাই তাদের আদর্শ হতে পারে; কিন্তু অহমে তাড়িত পাকিস্তান কি তা করবে?
লেখক: শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো

প্রশাসন, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সেবা করার বদলে অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ কিংবা আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো— সব জায়গায় একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে: রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাষ্ট্রের জন্য?
৫ দিন আগে
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। বন্ধুর কোনো কথায় কষ্ট পাওয়া, ভুল বোঝা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া— এসব মানবিক। প্রকৃত বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে সেখানে ক্ষমা আছে, সংশোধনের সুযোগ আছে। যে সমাজে ক্ষমা নেই, সেখানে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
৬ দিন আগে
এই সাহসিকতার মূল্য তাকে দিতে হয় জীবনের বিনিময়ে। হত্যাকারীরা তার কাছ থেকে মাইক কেড়ে নেয়, লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে, শরীর ক্ষতবিক্ষত করে এবং পরে গুলি চালায়। এরপর তাকে গণকবরে নিক্ষেপ করা হয়।
৯ দিন আগে
প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনলাইন ভর্তি ও নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা— এসব পদক্ষেপ দুর্নীতি কমাতে কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো প্রভাবশ
৯ দিন আগে