
ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

প্রতি বছর ৭ মার্চ এলেই বঙ্গবন্ধুকে বেশি মনে পড়ে। এ কারণে যে তিনি ১৯৭১ সালের এই দিনই প্রকৃতপক্ষে বাঙালির সুদীর্ঘ লালিত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। রেসকোর্স ময়দানে সে দিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা দুবার বলেন। প্রথমবার ভাষণের সাড়ে ৮ মিনিটের মাথায়, দ্বিতীয়বার ভাষণের প্রায় শেষ ভাগে। ভাষণের স্থিতিকাল ১৮ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড।
রেসকোর্সে যাওয়ার পথে হাজী মোরশেদ নেতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আজকে আপনি কী বক্তব্য দেবেন?’ বঙ্গবন্ধুর জবাব ছিল, ‘আমার মুখ দিয়ে আল্লাহ যা বলাবে তা-ই বলব।’ মনে হয় তাই আল্লাহ দুবার তার মুখ দিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা বলিয়েছেন। প্রথমবার তিনি বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমার স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দ্বিতীয়বার বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বিরুদ্ধবাদীদের কেউ কেউ বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চে বক্তৃতার শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ অথবা ‘জয় বাংলা’ ও ‘জিয়ে পাকিস্তান’ কিংবা ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে বক্তব্য শেষ করেছেন। তারা বলতে চান, এ থেকে প্রমাণ হয় যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানকে ভাঙতে চাননি। পরদিন আওয়ামীপন্থিরা সেই টেপটি সংশোধন করে ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি বাদ দিয়েই তা প্রচার করে। এ কথা একান্তই ভিত্তিহীন।
বঙ্গবন্ধু মূল ভাষণটি শুরু করেন ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে। তার বক্তব্যটি ১৩টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত করা সম্ভব। এর মধ্যে তিনি প্রথম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে মোট পাঁচবার ‘ভাইয়েরা আমার’ কথাটি বলেন। তিনি বলেন, ‘এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’
জার্মানি থেকে মুদ্রিত মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দারের ‘৭ই মার্চের ভাষণ: জানা-অজানা’ বইয়ের ২২৫ থেকে ২৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে এ প্রসঙ্গটি। সেখানে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে ‘মিটিং এখানেই শেষ’ বলে বক্তব্য শেষ করেন এবং ‘জয় বাংলা’ বলে মঞ্চ থেকে নেমে যান।
বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন বলে মনে পড়ে না। রেকর্ড পত্রেও তা নেই। বাস্তবতা হচ্ছে ইউনেস্কোর বিশ্ব রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তির পর আজ ভাষণটি বাংলাদেশ ও বিশ্বমানুষের অমূল্য সম্পদ। সেদিনের ঘোষণাটি বস্তুত স্বাধীনতার ঘোষণা।
বিশ্ববরেণ্য নেতা যেমন— নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, জোসেফ মার্শাল টিটো, এডওয়ার্ড হিথ, জ্যোতি বসু, নোবেল বিজয়ী শন ভ্রাকব্রাইড, নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, নির্মল সেন, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, অধ্যাপক ইমাজউদ্দিন, সাংবাদিক মনজুরুল হক, আলী জাকের প্রমুখ এবং টাইম ম্যাগাজিন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, আনন্দবাজারের মতো বিশ্ববরেণ্য সংবাদমাধ্যমগুলোও এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছে।
তারপরও কেউ কেউ বলেছেন ভিন্ন কথা। তাদের একজন হচ্ছেন এ কে খন্দকার। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তিনি ক্যান্টনমেন্টে বসে শুনেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণের দিন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক ছিল। সবাই ব্যস্ত ছিল নিজ নিজ কাজে (পৃষ্ঠা-৩১)।’ ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এ ভাষণের শেষ শব্দ ছিল ‘জয় পাকিস্তান।’”
তবে সম্ভবত এ কে খন্দকারের আসল মতলব ছিল ওইসব মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য খণ্ডন করা, যারা ৭ মার্চের ভাষণকেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছিলেন, যে বক্তব্য ‘জয় পাকিস্তান’ দিয়ে শেষ হয়, তা কি স্বাধীনতার আহ্বান না পাকিস্তান রক্ষার অভিপ্রায়!
তবে এ কে খন্দকার যদি ক্যান্টনমেন্টে বসেই ভাষণটি শোনার কথা বলে থাকেন, সেটি সর্বৈব মিথ্যা। কারণ ভাষণটি বেতারে প্রচার শুরু হওয়ার পর পরই সেদিন পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন সকাল ৮টায় তা প্রচারিত হয়।

এ কে খন্দকারের এ নিয়ে আরও অনেক কথা আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি তার ওই সব উক্তি নিয়ে বড় সমালোচনা ও সংকটে পড়েছিলেন। তাই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি যুক্ত করেন। আলোচনা-সমালোচনা তীব্রতর হলে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি যে বক্তব্য দেন তাতে স্পষ্ট হয়, তিনি তার সব অপরাধের জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবার ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
২০১৯ সালের ১ জুন দৈনিক প্রথম আলোতে তার সেই সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রকাশ পায়। ‘বইয়ে অসত্য তথ্য: জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন এ কে খন্দকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো পাঠকের সুবিধার্থে—
‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে’ বইয়ের একটি পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এর লেখক মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। তিনি বইয়ে অসত্য দেওয়ার জন্য জাতির কাছে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কে খন্দকার এ কথা বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ফরিদা খন্দকার উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে এ কে খন্দকার বলেন, আমার লেখা বই ‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে’ ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর এর ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিশেষ অংশ ও বইয়ের আরও কিছু অংশ নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ হয়। ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে উল্লেখিত অংশটুকু হলো— বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। তিনি (বঙ্গবন্ধু) যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, জয় পাকিস্তান!
এ কে খন্দকার বলেন, এই অংশটুকুর জন্য দেশপ্রেমিক অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এই অংশটুকু যেভাবেই আমার বইয়ে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে কখনোই ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি। আমি তাই এই অংশ সংবলিত পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।
তিনি বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মনোবল নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা পেয়েছিল বাঙালি জাতি। এই স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের এই উপঅধিনায়ক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে খ্যাতির শীর্ষে। বাংলাদেশ বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বে দেশ আজ যুদ্ধাপরাধী মুক্ত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রতি কৃতজ্ঞ।
এ কে খন্দকার বলেন, আমার বয়স এখন ৯০ বছর। আমার সমগ্র জীবনে করা কোনো ভুলের মধ্যে, এটিকেই আমি একটা বড় ভুল মনে করি। আমি আজ বিবেকের তাড়নায় দহন হয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মার কাছে, জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

এ কে খন্দকারের মৃত্যুর আগে বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তৃতীয় সংস্করণের মুখবন্ধ লিখেছেন তার স্ত্রী ফরিদা খন্দকার। তিনি লিখেছেন, “৯ মাসের রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সেই মহান জনযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ এই বই ‘১৯৭১: ভেতরে ও বাইরে’।”
ফরিদা খন্দকার বইটিকে স্মৃতিচারণমূলক একটি বই বলে উল্লেখ করেন। প্রথমা প্রকাশনের সৌজন্যে বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালের আগস্টে। সে বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপা হয়। বইটিতে দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাটি স্থান পেয়েছে। বইটি একজন বীর উত্তম মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভিত্তিতে লেখা (অনুল্লেখ থাকলেও অনুমিত যে তাতে ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে)।
ফরিদা খন্দকার আরও লিখেছেন, এয়ার ভাইস মাশাল (অব.) এ কে খন্দকারের বেশ বয়স হয়েছে। বর্তমানে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারিরিক সমস্যায় ভুগছেন। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত ‘১৯৭১: ভেতরে ও বাইরে’ বইটির সপ্তদশ মুদ্রণ প্রকাশিত হলো (এ কে খন্দকার ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, প্রথমা প্রকাশন, তৃতীয় সংস্করণ, ১৭তম মুদ্রণ, নভেম্বর ২০২৪)।
বইটিতে এ কে খন্দকার আর কোনো সংশোধনী আনেননি। এ নিয়ে কেউ তেমন আর উচ্চবাচ্যও করেননি। তার কয়েক মাস পর ফরিদা মীর্জা ইন্তেকাল করেন, পরে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন এ কে খন্দকার।
বইটির সপ্তদশ সংস্করণে দেখা যায়, তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাটি অটুট আছে এবং বইটির অভ্যন্তরে পরিবেশিত তথ্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অর্থাৎ তিনি এই প্রত্যয় নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেনই।
এ কে খন্দকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন সময়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান, কবি শামসুর রহমান, নির্মল সেন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জননেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ও সাংবাদিক আতাউস সামাদ একই কথা ভিন্নভাবে বলেছেন। তবে শেষোক্তজন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মতো ‘জয় বাংলা’র পর ‘জিয়ে পাকিস্তান’ শুনেছেন।
গাফফার চৌধুরী বলেছেন, হাবিবুর রহমান ৩ মার্চকে ৭ মার্চ বলে গুলিয়ে ফেলেছেন। তাই হয়তো তিনি বাংলাদেশের তারিখ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’র পর ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে বক্তব্য শেষ করেন। তবে তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে ভুল মেনে নিয়ে তা সংশোধন করে লিখেছেন, ‘জয় বাংলা’ বলেই বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন (জাফর ইকবাল ২৫/০৯/২০১৪)।
শামসুর রহমানের কঠোর সমালোচনা করেছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব আলী জাকের, যার জবাবে শামসুর রহমান তার ক্রটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন (সাপ্তাহিক ২০০০)। নির্মল সেন পরে কোনো এক সময়ে বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তিনি পরদিন বক্তব্যটি বাসায় বসে শুনেছেন। প্রয়াত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মঞ্চের কাছে উপস্থিত থেকেও ‘জয় বাংলা’র পর আর কিছু শোনেননি। একই কথা বলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক— নিজ কানে ‘জয় বাংলা’ শুনেছেন। ‘সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’ টেনে তিনি বলেছেন, “সেদিন বঙ্গবন্ধু কোনো অবস্থায়ই ‘জয় পাকিস্তান’ বলতে পারেন না।”
আ স ম রব মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে ছিলেন। তিনি বলেন, সেদিন বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলার কোনো পরিবেশই ছিল না। তা বললে তখনই মঞ্চে তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটে যেত।
তবে স্থির ও অনড় রয়ে গেলেন বদরুদ্দিন ওমর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বলে গেলেন, শেখ মুজিব ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন। তিনি সেদিন ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না। তারপরও কিছু ‘সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’ টেনে তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন যে বঙ্গবন্ধু সে দিন ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন।
অনেকের মধ্যে সে কথা প্রতিবাদ করেছেন মইনুল ইসলাম (প্রথম আলো, ২৯.৯.২০১৪)। কিন্তু সে কথায় ভ্রুক্ষেপ না করেই দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় (১৪.০৯.২০১৪) বদরুদ্দিন উমর সাহেব এ কে খন্দকার সাহেবের আগের কথাই মেনে নিচ্ছেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক মনজুর আহমদ সে দিন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সাপ্তাহিক ২০০০-এ ২০০৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জনসভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম এবং আমার উপস্থিতি সাধারণ একজন শ্রোতা হিসেবে নয়, ছিল তখনকার সবচেয়ে বড় দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তানে’র (পরবর্তীতে ‘দৈনিক বাংলা’) স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে। জনসভা ও বক্তৃতার বিবরণ সংগ্রহ করাই ছিল আমার এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্ব পালনে চোখ-কান সারাক্ষণ সজাগ রাখতে হয়েছে।
মনজুর আহমদ লিখেছেন, সে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট করেই বলতে চাই— বঙ্গবন্ধুর ‘জয় পাকিস্তান’ স্লোগান আমরা কেউ শুনিনি। পরদিনের কোনো পত্রিকাতেও এর কোনো উল্লেখ নেই। বক্তৃতার পুরো নোট ছাড়াও আমাদের অনেকেই সে বক্তৃতা টেপ করেছিলেন। রাতে রিপোর্ট লেখার সময় সেই টেপ বাজিয়ে আমরা নোট মিলিয়ে নিয়েছিলাম।
মনজুর আহমদ আরও লিখেছেন, না, ‘জয় পাকিস্তান’ কোথাও ছিল না। ছিল না বলেই পরদিনের পত্র-পত্রিকার সুবিস্তৃত বিবরণীতে কিংবা ওই জনসভা সংক্রান্ত আরও অসংখ্য ছোটবড় প্রতিবেদনে এর কোনো উল্লেখ ছিল না। এ সম্পর্কিত প্রকৃত তথ্যটি হচ্ছে— ৭ মার্চ নয়, বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়েছিলেন একাত্তরের ৩ জানুয়ারির জনসভায়।
বঙ্গবন্ধু যে ৭ মার্চের ভাষণটি কেবল ‘জয় বাংলা’ বলে শেষ করেন তার আরও বহু প্রমাণ রয়েছে। অভিনেতা পীযুষ বন্দোপাধ্যায়, কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক-রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ, সাবেক বেতার কর্মকর্তা ও ৭ মার্চের ভাষণের ধারক নাসার আহমেদ চৌধুরী, পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ ইকবাল, সাংবাদিক এ এস এম হাবিবুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহিম, মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন খান, জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ড. হুমায়ূন আহমেদ, বামপন্থি রাজনীতিবিদ কমরেড মণি সিংহ, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, গবেষক ও সাবেক বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ও অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানসহ আরও অনেকে একই কথা বলেছেন।
বিরুদ্ধবাদীরা এবার বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চ স্বাধীনতার কথা না বলে মুক্তির কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে... আর যদি আমার মানুষের (ওপর) হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
তাই তাত্ত্বিকভাবে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা দুটি— একটি বাঙালিদের জন্য, অন্যটি বিশ্ববাসীর জন্য। ৭ মার্চ বাঙালিরা বুঝে নিয়েছিল, এটাই স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সেভাবে তারা বুঝেশুনে কাজ করছিল। ২৫ মার্চ রাতে একটি গুলি নয়, হাজার হাজার গুলিবর্ষণ করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানিরা ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যার সূচনা করে। তখন কেউ কোনো ঘোষণা না দিলেও প্রতিরোধ যুদ্ধ বাঁধতই। আমাদের সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণার পরই সার্বিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
৭ মার্চের ঘোষণাটি ছিল একান্তই বোদ্ধা ও যোদ্ধা বাঙালিদের জন্য। সে ঘোষণার মর্মোদ্ধার, অর্থারোপ ও কর্তব্য নির্ধারণ তারাই করতে পেরেছে যারা মন-মনন, চিন্তা-চেতনা ও কর্মে ছিলেন বাঙালি। সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষিত হয়নি, কেননা তাহলে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী হতাম, তাহলে কামান দেগে ৭ মার্চের নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সবাইকে না হলেও অন্তত ১০ লাখ মানুষের ৯০ শতাংশকে পাকিস্তানিরা শেষ করে ফেলত।
এ জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড যে পাকিস্তান ঘটাতে পারত, তা আজকে আর অস্বীকারের জো নেই। এ জাতীয় পরিস্থিতি হলেও বিশ্ববাসী আমাদের পাশে দাঁড়াত কি না সন্দেহ। কেননা তারা জানত, সংসদ অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে বলে অযৌক্তিক ও অসঙ্গত স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। যারা ৭ মার্চে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ঘোষণা চেয়েছিলেন তারা হয়তো এ কথা বুঝতে পারেননি যে সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া যায় না, বড়জোর তার জবাবে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণা দেওয়া যায়।
যখন গণহত্যার মাধ্যমে একটি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন তাদের অস্তিত্বের স্বার্থে, মানবতার স্বার্থে, নীতি-নৈতিকতার স্বার্থে, একটি জাতির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা তথা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু জাতির পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেই পারেন এবং তা তিনি ২৬ মার্চ করেছিলেন।
কেউ কেউ বলেছেন, শেখ মুজিব হেয়ালি পরিহার করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যদি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে পাকিস্তানের অপ্রস্তুতির সুযোগ নিয়ে আমরা আরও কম জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। কী হতো জানি না, তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে অনুমান করা যায়— এটি হতো হঠকারী আচরণের নব সংযোজন এবং তার পরিণাম হতো ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী।
বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো তখনো পাকিস্তানের বিভক্তি নিয়ে খুব সরব ছিল না, খুব মনোযোগের বিষয়ও ছিল না বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব জনমতের অনুকূল সাড়ার অভাবে হয়তো বায়াফ্রার (আফ্রিকার বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি রাষ্ট্র, যা স্বাধীনতা ঘোষণা করেও যুদ্ধ ও চরম দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির কারণে পরে নাইজেরিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়) পরিণাম আমাদের অদৃষ্টে লেখা হয়ে যেত।
এসব কারণেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে পরিমিত না বলে উপায় নেই। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণটিকে গ্যাটিসবার্গ ভাষণ বা চার্চিলের ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেন। গ্যাটিসবার্গ ভাষণের মতোই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অনন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা আব্রাহাম লিংকনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল জেনেই গ্যাটিসবার্গে সাম্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুরুর আগেই শেষটা দেখেছিলেন। তাই তিনি যুদ্ধ ও যুদ্ধ কৌশলের কথা এত নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন।
দূরদর্শিতার আরও প্রমাণ আছে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে তা বন্ধ করে দেবে।’ তবে আমাদের সৌভাগ্য, তিনি চূড়ান্ত হুকুমটিও দিতে পেরেছিলেন।
সব মিলিয়ে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়োপযোগী ঘোষণা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণটি সে কারণেই ইউনেসকোর রেকর্ডে স্থান পেয়েছে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো

প্রতি বছর ৭ মার্চ এলেই বঙ্গবন্ধুকে বেশি মনে পড়ে। এ কারণে যে তিনি ১৯৭১ সালের এই দিনই প্রকৃতপক্ষে বাঙালির সুদীর্ঘ লালিত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। রেসকোর্স ময়দানে সে দিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা দুবার বলেন। প্রথমবার ভাষণের সাড়ে ৮ মিনিটের মাথায়, দ্বিতীয়বার ভাষণের প্রায় শেষ ভাগে। ভাষণের স্থিতিকাল ১৮ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড।
রেসকোর্সে যাওয়ার পথে হাজী মোরশেদ নেতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আজকে আপনি কী বক্তব্য দেবেন?’ বঙ্গবন্ধুর জবাব ছিল, ‘আমার মুখ দিয়ে আল্লাহ যা বলাবে তা-ই বলব।’ মনে হয় তাই আল্লাহ দুবার তার মুখ দিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা বলিয়েছেন। প্রথমবার তিনি বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমার স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দ্বিতীয়বার বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বিরুদ্ধবাদীদের কেউ কেউ বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চে বক্তৃতার শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ অথবা ‘জয় বাংলা’ ও ‘জিয়ে পাকিস্তান’ কিংবা ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে বক্তব্য শেষ করেছেন। তারা বলতে চান, এ থেকে প্রমাণ হয় যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানকে ভাঙতে চাননি। পরদিন আওয়ামীপন্থিরা সেই টেপটি সংশোধন করে ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি বাদ দিয়েই তা প্রচার করে। এ কথা একান্তই ভিত্তিহীন।
বঙ্গবন্ধু মূল ভাষণটি শুরু করেন ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে। তার বক্তব্যটি ১৩টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত করা সম্ভব। এর মধ্যে তিনি প্রথম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে মোট পাঁচবার ‘ভাইয়েরা আমার’ কথাটি বলেন। তিনি বলেন, ‘এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’
জার্মানি থেকে মুদ্রিত মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দারের ‘৭ই মার্চের ভাষণ: জানা-অজানা’ বইয়ের ২২৫ থেকে ২৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে এ প্রসঙ্গটি। সেখানে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে ‘মিটিং এখানেই শেষ’ বলে বক্তব্য শেষ করেন এবং ‘জয় বাংলা’ বলে মঞ্চ থেকে নেমে যান।
বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন বলে মনে পড়ে না। রেকর্ড পত্রেও তা নেই। বাস্তবতা হচ্ছে ইউনেস্কোর বিশ্ব রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তির পর আজ ভাষণটি বাংলাদেশ ও বিশ্বমানুষের অমূল্য সম্পদ। সেদিনের ঘোষণাটি বস্তুত স্বাধীনতার ঘোষণা।
বিশ্ববরেণ্য নেতা যেমন— নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, জোসেফ মার্শাল টিটো, এডওয়ার্ড হিথ, জ্যোতি বসু, নোবেল বিজয়ী শন ভ্রাকব্রাইড, নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, নির্মল সেন, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, অধ্যাপক ইমাজউদ্দিন, সাংবাদিক মনজুরুল হক, আলী জাকের প্রমুখ এবং টাইম ম্যাগাজিন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, আনন্দবাজারের মতো বিশ্ববরেণ্য সংবাদমাধ্যমগুলোও এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছে।
তারপরও কেউ কেউ বলেছেন ভিন্ন কথা। তাদের একজন হচ্ছেন এ কে খন্দকার। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তিনি ক্যান্টনমেন্টে বসে শুনেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণের দিন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক ছিল। সবাই ব্যস্ত ছিল নিজ নিজ কাজে (পৃষ্ঠা-৩১)।’ ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এ ভাষণের শেষ শব্দ ছিল ‘জয় পাকিস্তান।’”
তবে সম্ভবত এ কে খন্দকারের আসল মতলব ছিল ওইসব মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য খণ্ডন করা, যারা ৭ মার্চের ভাষণকেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছিলেন, যে বক্তব্য ‘জয় পাকিস্তান’ দিয়ে শেষ হয়, তা কি স্বাধীনতার আহ্বান না পাকিস্তান রক্ষার অভিপ্রায়!
তবে এ কে খন্দকার যদি ক্যান্টনমেন্টে বসেই ভাষণটি শোনার কথা বলে থাকেন, সেটি সর্বৈব মিথ্যা। কারণ ভাষণটি বেতারে প্রচার শুরু হওয়ার পর পরই সেদিন পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন সকাল ৮টায় তা প্রচারিত হয়।

এ কে খন্দকারের এ নিয়ে আরও অনেক কথা আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি তার ওই সব উক্তি নিয়ে বড় সমালোচনা ও সংকটে পড়েছিলেন। তাই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি যুক্ত করেন। আলোচনা-সমালোচনা তীব্রতর হলে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি যে বক্তব্য দেন তাতে স্পষ্ট হয়, তিনি তার সব অপরাধের জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবার ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
২০১৯ সালের ১ জুন দৈনিক প্রথম আলোতে তার সেই সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রকাশ পায়। ‘বইয়ে অসত্য তথ্য: জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন এ কে খন্দকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো পাঠকের সুবিধার্থে—
‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে’ বইয়ের একটি পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এর লেখক মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। তিনি বইয়ে অসত্য দেওয়ার জন্য জাতির কাছে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কে খন্দকার এ কথা বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ফরিদা খন্দকার উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে এ কে খন্দকার বলেন, আমার লেখা বই ‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে’ ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর এর ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিশেষ অংশ ও বইয়ের আরও কিছু অংশ নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ হয়। ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে উল্লেখিত অংশটুকু হলো— বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। তিনি (বঙ্গবন্ধু) যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, জয় পাকিস্তান!
এ কে খন্দকার বলেন, এই অংশটুকুর জন্য দেশপ্রেমিক অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এই অংশটুকু যেভাবেই আমার বইয়ে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে কখনোই ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি। আমি তাই এই অংশ সংবলিত পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।
তিনি বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মনোবল নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা পেয়েছিল বাঙালি জাতি। এই স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের এই উপঅধিনায়ক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে খ্যাতির শীর্ষে। বাংলাদেশ বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বে দেশ আজ যুদ্ধাপরাধী মুক্ত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রতি কৃতজ্ঞ।
এ কে খন্দকার বলেন, আমার বয়স এখন ৯০ বছর। আমার সমগ্র জীবনে করা কোনো ভুলের মধ্যে, এটিকেই আমি একটা বড় ভুল মনে করি। আমি আজ বিবেকের তাড়নায় দহন হয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মার কাছে, জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

এ কে খন্দকারের মৃত্যুর আগে বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তৃতীয় সংস্করণের মুখবন্ধ লিখেছেন তার স্ত্রী ফরিদা খন্দকার। তিনি লিখেছেন, “৯ মাসের রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সেই মহান জনযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ এই বই ‘১৯৭১: ভেতরে ও বাইরে’।”
ফরিদা খন্দকার বইটিকে স্মৃতিচারণমূলক একটি বই বলে উল্লেখ করেন। প্রথমা প্রকাশনের সৌজন্যে বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালের আগস্টে। সে বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপা হয়। বইটিতে দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাটি স্থান পেয়েছে। বইটি একজন বীর উত্তম মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভিত্তিতে লেখা (অনুল্লেখ থাকলেও অনুমিত যে তাতে ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে)।
ফরিদা খন্দকার আরও লিখেছেন, এয়ার ভাইস মাশাল (অব.) এ কে খন্দকারের বেশ বয়স হয়েছে। বর্তমানে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারিরিক সমস্যায় ভুগছেন। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত ‘১৯৭১: ভেতরে ও বাইরে’ বইটির সপ্তদশ মুদ্রণ প্রকাশিত হলো (এ কে খন্দকার ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, প্রথমা প্রকাশন, তৃতীয় সংস্করণ, ১৭তম মুদ্রণ, নভেম্বর ২০২৪)।
বইটিতে এ কে খন্দকার আর কোনো সংশোধনী আনেননি। এ নিয়ে কেউ তেমন আর উচ্চবাচ্যও করেননি। তার কয়েক মাস পর ফরিদা মীর্জা ইন্তেকাল করেন, পরে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন এ কে খন্দকার।
বইটির সপ্তদশ সংস্করণে দেখা যায়, তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাটি অটুট আছে এবং বইটির অভ্যন্তরে পরিবেশিত তথ্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অর্থাৎ তিনি এই প্রত্যয় নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেনই।
এ কে খন্দকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন সময়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান, কবি শামসুর রহমান, নির্মল সেন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জননেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ও সাংবাদিক আতাউস সামাদ একই কথা ভিন্নভাবে বলেছেন। তবে শেষোক্তজন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মতো ‘জয় বাংলা’র পর ‘জিয়ে পাকিস্তান’ শুনেছেন।
গাফফার চৌধুরী বলেছেন, হাবিবুর রহমান ৩ মার্চকে ৭ মার্চ বলে গুলিয়ে ফেলেছেন। তাই হয়তো তিনি বাংলাদেশের তারিখ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’র পর ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে বক্তব্য শেষ করেন। তবে তার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে ভুল মেনে নিয়ে তা সংশোধন করে লিখেছেন, ‘জয় বাংলা’ বলেই বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন (জাফর ইকবাল ২৫/০৯/২০১৪)।
শামসুর রহমানের কঠোর সমালোচনা করেছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব আলী জাকের, যার জবাবে শামসুর রহমান তার ক্রটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন (সাপ্তাহিক ২০০০)। নির্মল সেন পরে কোনো এক সময়ে বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তিনি পরদিন বক্তব্যটি বাসায় বসে শুনেছেন। প্রয়াত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মঞ্চের কাছে উপস্থিত থেকেও ‘জয় বাংলা’র পর আর কিছু শোনেননি। একই কথা বলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক— নিজ কানে ‘জয় বাংলা’ শুনেছেন। ‘সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’ টেনে তিনি বলেছেন, “সেদিন বঙ্গবন্ধু কোনো অবস্থায়ই ‘জয় পাকিস্তান’ বলতে পারেন না।”
আ স ম রব মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে ছিলেন। তিনি বলেন, সেদিন বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলার কোনো পরিবেশই ছিল না। তা বললে তখনই মঞ্চে তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটে যেত।
তবে স্থির ও অনড় রয়ে গেলেন বদরুদ্দিন ওমর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বলে গেলেন, শেখ মুজিব ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন। তিনি সেদিন ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না। তারপরও কিছু ‘সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’ টেনে তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন যে বঙ্গবন্ধু সে দিন ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন।
অনেকের মধ্যে সে কথা প্রতিবাদ করেছেন মইনুল ইসলাম (প্রথম আলো, ২৯.৯.২০১৪)। কিন্তু সে কথায় ভ্রুক্ষেপ না করেই দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় (১৪.০৯.২০১৪) বদরুদ্দিন উমর সাহেব এ কে খন্দকার সাহেবের আগের কথাই মেনে নিচ্ছেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক মনজুর আহমদ সে দিন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সাপ্তাহিক ২০০০-এ ২০০৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জনসভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম এবং আমার উপস্থিতি সাধারণ একজন শ্রোতা হিসেবে নয়, ছিল তখনকার সবচেয়ে বড় দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তানে’র (পরবর্তীতে ‘দৈনিক বাংলা’) স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে। জনসভা ও বক্তৃতার বিবরণ সংগ্রহ করাই ছিল আমার এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্ব পালনে চোখ-কান সারাক্ষণ সজাগ রাখতে হয়েছে।
মনজুর আহমদ লিখেছেন, সে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট করেই বলতে চাই— বঙ্গবন্ধুর ‘জয় পাকিস্তান’ স্লোগান আমরা কেউ শুনিনি। পরদিনের কোনো পত্রিকাতেও এর কোনো উল্লেখ নেই। বক্তৃতার পুরো নোট ছাড়াও আমাদের অনেকেই সে বক্তৃতা টেপ করেছিলেন। রাতে রিপোর্ট লেখার সময় সেই টেপ বাজিয়ে আমরা নোট মিলিয়ে নিয়েছিলাম।
মনজুর আহমদ আরও লিখেছেন, না, ‘জয় পাকিস্তান’ কোথাও ছিল না। ছিল না বলেই পরদিনের পত্র-পত্রিকার সুবিস্তৃত বিবরণীতে কিংবা ওই জনসভা সংক্রান্ত আরও অসংখ্য ছোটবড় প্রতিবেদনে এর কোনো উল্লেখ ছিল না। এ সম্পর্কিত প্রকৃত তথ্যটি হচ্ছে— ৭ মার্চ নয়, বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়েছিলেন একাত্তরের ৩ জানুয়ারির জনসভায়।
বঙ্গবন্ধু যে ৭ মার্চের ভাষণটি কেবল ‘জয় বাংলা’ বলে শেষ করেন তার আরও বহু প্রমাণ রয়েছে। অভিনেতা পীযুষ বন্দোপাধ্যায়, কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক-রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ, সাবেক বেতার কর্মকর্তা ও ৭ মার্চের ভাষণের ধারক নাসার আহমেদ চৌধুরী, পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ ইকবাল, সাংবাদিক এ এস এম হাবিবুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহিম, মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন খান, জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ড. হুমায়ূন আহমেদ, বামপন্থি রাজনীতিবিদ কমরেড মণি সিংহ, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, গবেষক ও সাবেক বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ও অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানসহ আরও অনেকে একই কথা বলেছেন।
বিরুদ্ধবাদীরা এবার বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চ স্বাধীনতার কথা না বলে মুক্তির কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে... আর যদি আমার মানুষের (ওপর) হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
তাই তাত্ত্বিকভাবে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা দুটি— একটি বাঙালিদের জন্য, অন্যটি বিশ্ববাসীর জন্য। ৭ মার্চ বাঙালিরা বুঝে নিয়েছিল, এটাই স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সেভাবে তারা বুঝেশুনে কাজ করছিল। ২৫ মার্চ রাতে একটি গুলি নয়, হাজার হাজার গুলিবর্ষণ করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানিরা ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যার সূচনা করে। তখন কেউ কোনো ঘোষণা না দিলেও প্রতিরোধ যুদ্ধ বাঁধতই। আমাদের সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণার পরই সার্বিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
৭ মার্চের ঘোষণাটি ছিল একান্তই বোদ্ধা ও যোদ্ধা বাঙালিদের জন্য। সে ঘোষণার মর্মোদ্ধার, অর্থারোপ ও কর্তব্য নির্ধারণ তারাই করতে পেরেছে যারা মন-মনন, চিন্তা-চেতনা ও কর্মে ছিলেন বাঙালি। সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষিত হয়নি, কেননা তাহলে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী হতাম, তাহলে কামান দেগে ৭ মার্চের নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সবাইকে না হলেও অন্তত ১০ লাখ মানুষের ৯০ শতাংশকে পাকিস্তানিরা শেষ করে ফেলত।
এ জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড যে পাকিস্তান ঘটাতে পারত, তা আজকে আর অস্বীকারের জো নেই। এ জাতীয় পরিস্থিতি হলেও বিশ্ববাসী আমাদের পাশে দাঁড়াত কি না সন্দেহ। কেননা তারা জানত, সংসদ অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে বলে অযৌক্তিক ও অসঙ্গত স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। যারা ৭ মার্চে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ঘোষণা চেয়েছিলেন তারা হয়তো এ কথা বুঝতে পারেননি যে সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া যায় না, বড়জোর তার জবাবে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণা দেওয়া যায়।
যখন গণহত্যার মাধ্যমে একটি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন তাদের অস্তিত্বের স্বার্থে, মানবতার স্বার্থে, নীতি-নৈতিকতার স্বার্থে, একটি জাতির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা তথা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু জাতির পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেই পারেন এবং তা তিনি ২৬ মার্চ করেছিলেন।
কেউ কেউ বলেছেন, শেখ মুজিব হেয়ালি পরিহার করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যদি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে পাকিস্তানের অপ্রস্তুতির সুযোগ নিয়ে আমরা আরও কম জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। কী হতো জানি না, তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে অনুমান করা যায়— এটি হতো হঠকারী আচরণের নব সংযোজন এবং তার পরিণাম হতো ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী।
বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো তখনো পাকিস্তানের বিভক্তি নিয়ে খুব সরব ছিল না, খুব মনোযোগের বিষয়ও ছিল না বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব জনমতের অনুকূল সাড়ার অভাবে হয়তো বায়াফ্রার (আফ্রিকার বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি রাষ্ট্র, যা স্বাধীনতা ঘোষণা করেও যুদ্ধ ও চরম দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির কারণে পরে নাইজেরিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়) পরিণাম আমাদের অদৃষ্টে লেখা হয়ে যেত।
এসব কারণেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে পরিমিত না বলে উপায় নেই। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণটিকে গ্যাটিসবার্গ ভাষণ বা চার্চিলের ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেন। গ্যাটিসবার্গ ভাষণের মতোই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অনন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা আব্রাহাম লিংকনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল জেনেই গ্যাটিসবার্গে সাম্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুরুর আগেই শেষটা দেখেছিলেন। তাই তিনি যুদ্ধ ও যুদ্ধ কৌশলের কথা এত নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন।
দূরদর্শিতার আরও প্রমাণ আছে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে তা বন্ধ করে দেবে।’ তবে আমাদের সৌভাগ্য, তিনি চূড়ান্ত হুকুমটিও দিতে পেরেছিলেন।
সব মিলিয়ে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়োপযোগী ঘোষণা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণটি সে কারণেই ইউনেসকোর রেকর্ডে স্থান পেয়েছে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ৪ তারিখও ছিল ঘটনাবহুল। প্রতিদিনই সেনাবাহিনীর বেপরোয়া নির্মম আচরণ চলতে থাকে। জবাবে বাঙালি আরও বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। আগের দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিকামী বাঙালিকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন ছাত্রনেতারা।
৩ দিন আগে
রাজনীতি মানে মতের লড়াই। কিন্তু ভাষার শালীনতা হারালে সেই লড়াই আর নীতির থাকে না, হয়ে যায় কাদা ছোড়াছুড়ি। জেনজি প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে উঠেছে; তারা জানে শব্দের শক্তি কতটা। তবু যদি তারা সচেতনভাবে আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করে, তবে সেটি কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, রাজনৈতিক অদূরদর্শি
৪ দিন আগে
বাংলাদেশ এই দুই সংকটের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অভিঘাতের পরিধির ভেতরেই অবস্থান করছে। সর্বোত্তম পরিস্থিতিতে যদি সংঘাতগুলো সীমাবদ্ধ থাকে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বিস্তারে না গড়ায়, তবে ঢাকা তার দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশল বজায় রাখতে পারবে— কঠোর কোনো পক্ষ না নিয়ে পশ্চিমা অংশীদার, উপসাগরীয় রাষ্ট
৬ দিন আগে
প্রশাসন, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সেবা করার বদলে অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ কিংবা আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো— সব জায়গায় একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে: রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাষ্ট্রের জন্য?
৭ দিন আগে