পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

স্নেহাশিস সুর
আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ২০: ৪৩

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। এটা সবার জানা। কিন্তু কত দিন পরপর যে সেটা হয়, তা কিন্তু সবার অজানা। স্বাধীনতার পর বঙ্গ রাজনীতির পালাবদল দেখা গেছে ২০ বছর পর (১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭)। এরপর তিন বছর (১৯৬৭ থেকে ১৯৭০, মাঝে অল্প রাষ্ট্রপতির শাসন); পাঁচ বছর (১৯৭২ থেকে ১৯৭৭) ও ৩৪ বছর (১৯৭৭ থেকে ২০১১) পর ঘটেছিল পালাবদল। এবার ২০১১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে এসে ১৫ বছর।

প্রশ্ন হলো— এবারের পালাবদল কি আগে থেকে মানুষ বুঝতে পেরেছিল? ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর এখন আনেকেই হয়তো বলবেন, ‘হ্যাঁ।’ আবার কেউ হয়তো বলবেন, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বোঝা গেলেও সরকার বদলানোটা যে এরকম ঝড়ের মতো হবে, তা বোঝা যায়নি।

ফলে সে প্রশ্ন এখন থাক। কিন্তু বদলের কারণগুলো তো এখন একটু খোঁজ করা যেতেই পারে। আর তাতে সবার আগ্রহ থাকাটাও স্বাভাবিক। অবশ্য নির্বাচনের ফল বেরনোর পর ফলের অনেক কারণ বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু সেই কারণগুলো সত্যিই কাজ করেছে কি না, তা আদতে বলা শক্ত। সেগুলোকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরাই ভালো।

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট এবং হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি সবাই মুসলিম ভোটে কিছুটা ভাগ বসিয়েছে।

বাম আমলে যেখানে বামেরা ব্যাপক আসন পেত, সেখানেও কলকাতায় সাবেক কংগ্রেস জিতত। এবার কলকাতার যে কয়েকটা আসন তৃণমূল জিতেছে, সেগুলো সবই প্রায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। কলকাতার অন্যান্য আসন তৃণমূল ধরে রাখতে পারেনি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরেকটা ভোট ব্যাংক নারীরা। বিজেপি আগে এসব প্রকল্পে খয়রাতি সাহায্যের টাকা পাওয়া নিয়ে বিরোধিতা করলেও এবারের নির্বাচনের প্রচারে নিজেরা সেই টাকা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে তৃণমূলের নারী ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরে। আগে যেমন নারী ভোট তৃণমূলের একচেটিয়া ছিল, তারা বিজেপির প্রতিশ্রুতিতে আরও বেশি পাওয়ার আশায় বিজেপিকে সমর্থন করে।

অন্যদিকে নারীরা হয়তো আরও এক কারণে তৃণমূলের অন্ধ সমর্থন থেকে সরে আসে। তৃণমূল মনে করেছিল, আরজি করের অভয়ার ঘটনা গ্রামাঞ্চলে তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু কার্যত তা হয়নি। শহর, আধাশহরসহ অনেক জায়গাতেই এর প্রভাবে হয়তো তৃণমূলের ভোট কমেছে। সেই সঙ্গে ভাঙ্গড়, কামদুনি ও পার্ক স্ট্রিটের মতো নারী নিগ্রহের ঘটনা ভোটদাতাদের অবচেতন মনে কিছুটা হলেও আবার ফিরে এসে থাকতে পারে।

এর আগের কয়েকটা নির্বাচনে দুর্নীতি কিন্তু কার্যত কোনো প্রভাব ফেলেনি। ভোটের আগে নেতাদের হাতে নগদ টাকা নিতে দেখা গেলেও সারদা, নারদার বিভিন্ন দুর্নীতি ভোটারদের তৃণমূলের বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে পারেনি। বাম জামানার শেষ দিকে যেভাবে স্থানীয় নেতাদের জুলুম বেড়ে গিয়েছিল, সবকিছুতেই যেমন লোকাল কমিটির এক ধরনের অলিখিত কতৃত্ব কায়েম হয়ে গিয়েছিল, সম্প্রতি তৃণমূলেরও পরিস্থিতিও ছিল অনেকটা তেমন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আকাশছোঁয়া দুর্নীতি, চোখে পড়ার মতো প্রাসাদোপম অট্টালিকা ও নামে-বেনামে বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হাঁটাচলা, কথাবার্তা— সবকিছুই যে জনগণ আর ভালো চোখে দেখছে না, তার প্রতিফলনই নির্বাচনে দেখা গেল। দলীয় নেতাদের দুর্নীতি এবারই হয়তো প্রথম নির্বাচনে তৃণমূলের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলল।

প্রকৃতপক্ষে তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা তাদের ভবিষ্যৎ বা স্থায়িত্ব নিয়ে এতটাই অনিশ্চয়তায় ভুগতেন যে যত দ্রুতসম্ভব আখের গোছাতেই তারা শুধু যে মনোনিবেশ করেন তা নয়, একেবারে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষ এর একটা উচিত শিক্ষা দেবে বলে তৈরি হচ্ছিল। তৃণমূল নেতৃত্ব সেটা হয়তো আন্দাজ কিছুটা করেছিল, কারণ আইপ্যাকের স্থানীয় ভিত্তিতে যোগাড় করা তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরে জমা পড়ত। সেই অনুযায়ী ৭৪ জন বিদায়ী বিধায়ককে তৃণমূল এবার টিকিট দেয়নি, আরও ১৫ জনের আসন বদলে দিয়েছে।

এর নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল। কিন্তু আইপ্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপারিশ দলে চূড়ান্ত পর্যায়ে কতটা কাজ করেছে, সেটা বলা মুশকিল। তবে ভোটের ফলাফল দেখে এটা বলা সম্ভব— এই জোয়ারে প্রার্থী বদলের ওই বালির বস্তার বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা ছিল না।

সেইসঙ্গে দুর্নীতির বলি হয়েছিলেন বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধভোগী থেকে সাধারণ মানুষ। সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করতে গেলে যে উৎকোচ দেওয়াটা একটা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনে পড়েছে। ভোটের অঙ্ক দেখে এটা বলা যায়— জনগণ এ রকম একটা ফলের জন্য আগে থেকেই মনস্থির করেই ফেলেছিল।

এ ছাড়া তৃণমূলের নেতৃত্বের ঔদ্ধত্ব ও পুলিশের ওপর নির্ভরতা এতটাই বেড়েছিল যে সেটাও তাদের বিরুদ্ধে যায়। নেতাদের নিরাপত্তার নামে তাদের সঙ্গে যেভাবে পুলিশের পরিমাণ বেড়েছিল, সেটাও জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে ভালো বার্তা দেয়নি। বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্য হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে বিপুল পুলিশি নিরাপত্তা ছিল, তা যে জনগণ ভালোভাবে নেয়নি তা ভোটের ফলেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। আদতে তৃণমূল স্তরে তৃণমূল দলে গ্রহণযোগ্যতা যে তলানিতে ঠেকেছিল, সেটাই এই ফলাফলের অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে বিজেপি আসর গোছাতে শুরু করে এর আগের, অর্থাৎ ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর থেকেই। প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বলেছিলেন, ‘আগলি বার ২০০ পার।’ কিন্তু সেটা হয়নি। তার অনেক কারণ ছিল। তবে সে দিন থেকেই সেই কারণগুলো কাটাতে শুরু করে বিজেপি। এটা ভোটের আগের মাস দেড়েকের প্রচার নয়, দীর্ঘ সময় আগেই বিজেপি ও তাদের দলের ঘনিষ্ঠ অনেকের নির্দিষ্ট কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।

আগের ভোটে বিজেপির অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী ছিলেন একজন অবাঙালি নেতা— কৈলাশ বিজয়বর্গীয়। তার সম্পর্কে নানা অভিযোগও ছিল। আর এবারে নির্বাচনের আগে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী, সাবেক দুই রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও রাহুল সিনহা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার একযোগে মাঠে নামলেন, কোনো পারস্পরিক মতপার্থক্য বাইরে আসতে না দিয়েই। এর মধ্যে তিনজনই বাঙালি। এতে বিজেপি যে অবাঙালিদের দল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সে অভিযোগ খারিজ হয়ে গেল।

বিজেপির অন্যতম চালিকাশক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) দীর্ঘদিন ধরে নিজের মতো করে তাদের কাজ করে যাচ্ছিল সারা বাংলা জুড়ে— নিস্তব্ধে, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরভাবে। কলকাতায় সরসঙ্ঘ চালক মোহন ভাগবতের দিনব্যাপী সভা হলো সায়েন্স সিটিতে। উপস্থিত ছিলেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিষিষ্ট মানুষজন।

এ ছাড়াও ইডি-সিবিআই কেন্দ্রের অধীন। তারা সক্রিয় হলো বিভিন্ন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা নিয়ে। জিজ্ঞাসাবাদ চলল। জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব পড়ল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। এমনকি তৃণমূলের ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাকের দপ্তরে হানা, তা নিয়ে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকুস্থলে যাওয়া, ফাইল নিয়ে চলে আসা এবং তা নিয়ে মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ানো— এর কোনোটাই তৃণমূলের ভাবমূর্তির পক্ষে যায়নি।

এ সব ধাক্কা এলে নির্বাচনের জন্য গুছিয়ে কাজ করা তৃণমূলের পক্ষে কিছুটা হলেও আটকে যায়। এ ধরনের হানা বা রেইড কিন্তু আদর্শ নির্বাচনি আচরণবিধি চালু থাকার সময়েও হয়। অবশ্য আচরণবিধির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কও নেই।

এবারে বিজেপির প্রচারে তৃণমূল সরকারের নানা ভাতা নিয়ে কোনো বিরূপ সমালোচনা ছিল না। আগেরবার এই সমালোচনা করে যে ভালো ফল পাওয়া যায়নি, সেটা বুঝে এবার তারা বলে যে তারা ক্ষমতায় এলে নারীদের ভাতা আরও বাড়াবে। এতে তৃণমূলের যে নারী ভোট ব্যাংক অবিচ্ছেদ্য ছিল, তাতে যে নিঃসন্দেহে কিছুটা ভাগ বসাতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি, তা বলাই যায়। নতুন সরকার গঠনের পর মহিলাদের ব্যাংকে গিয়ে ডিবিটি লিংক করার যে বিরাট লাইন দেখা যাচ্ছে, তা দেখেই কিছুটা হলেও এটা পরিষ্কার হচ্ছে।

আবার বিজেপির প্রচারে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দলের বহু মুখ্যমন্ত্রীর ক্রমাগত রাজ্যে প্রচারে আসা দলের পক্ষে নিঃসন্দেহে বড় প্রভাব ফেলেছে। এই প্রচার অবশ্য আগের মতো কেউ খুব বেশি উচ্চগ্রামে করেননি। কারণ আগেরবারে নির্বাচনি জনসভাগুলোতে বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের এ ধরনের কিছু মন্তব্য যে বাংলার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি, তা তাদের নির্বাচনি ‘ওয়ার রুম’ নিশ্চয়ই এবারে বলে দিয়ে ছিল।

একটা পরিবর্তনের হাওয়া এবার বাংলায় ছিল, সেটাকে বিজেপি সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের দীর্ঘদিনের প্রয়াস এবার সফল হয়েছে। ধীরে ধীরে বিজেপি বাংলার মানুষকে এই ন্যারেটিভটা বোঝাতে পেরেছে— যেভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দাপট এখানে বাড়ছে, সীমান্তের ওপার থেকে যেভাবে অনুপ্রবেশ হচ্ছে এবং জঙ্গিদের জন্য যেভাবে এই এলাকা তাদের চারণভূমি হয় পড়ছে, তাতে বাংলায় ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের স্বার্থ বিপন্ন এবং এটা যদি তারা এখনো না বোঝেন, তাহলে ভবিষ্যৎ খুব খারাপ।

এটা মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে। তাছাড়া বামেদের দেখা হয়েছে, তাদের সরিয়ে তৃণমূলকে এনেও দেখা হয়েছে, এবার বিজেপিকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখাই যাক— এ বক্তব্যও কাজে লেগেছে। এর সঙ্গে আছে ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ তত্ত্ব। সত্যিই তো কী বাম আমল, কী তৃণমূল— মাঝে অল্প একটা সময় ছাড়া দীর্ঘদিন এ রাজ্যে কেন্দ্রবিরোধী সরকার থাকায় রাজ্যের উন্নয়ন যে ব্যর্থ হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ফলে কিছু লোক হয়তো দেখতে চেয়েছে, সত্যিই ডাবল ইঞ্জিন সরকার, তথা কেন্দ্র ও রাজ্যে একই ক্ষমতাসীন দলের শাসনের কোনো সুফল বাংলা এবার পায় কি না।

আর বড় সংখ্যায় সরকারি কর্মচারীদের ভোট তৃণমূল যে পাবে না, তা তারা জানত। কিন্তু যাদের ডিএ না দিয়ে বিভিন্ন লোকেদের যে ভাতা দেওয়া হয়েছে, তারা যে ছেড়ে চলে যাবে, সেটা তৃণমূল ভাবতে পারেনি। ভেতরে ভেতরে দলের জনসমর্থন যে এতটা কমছে, সেটাও তৃণমূল আন্দাজ করতে পারেনি। তাতে আবার প্রমাণ হলো— নির্বাচনি জনসভায় ব্যাপক ভিড় দেখে সবসময় জনসমর্থনের হাওয়া বোঝা যায় না। আর বেশি ভোট পড়া যে পরিবর্তনের লক্ষ্মণ সেটা অবশ্য আবার প্রমাণিত হলো।

এ ছাড়া আরেকটা কারণে এবারের নির্বাচনটা ছিল অন্য নির্বাচনগুলোর থেকে আলাদা। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল একটি বিষয় বা প্রক্রিয়া, যেটি এখন লোকের মুখে মুখে ফিরছে। সেটি হলো— এসআইআর বা স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন। অর্থাৎ ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। মানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা ধরে ধরে কে যথার্থ আছেন, তা দেখে ভোটার তালিকা তৈরি করা, যে তালিকার ওপর ভিত্তি করে ভোট হবে।

এটা করতে গিয়ে এবারে অনেক নাম বাদ যায়। মৃত ভোটার, দুই জায়গায় ভোট থাকলে তালিকা থেকে বাদ, প্রমাণের কাগজপত্র না দেখাতে পারলে বাদ— এসব নানা কারণে এবারের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন প্রায় ৯১ লাখ মানুষ, যাদের ভোটার তালিকায় আগে নাম ছিল। এদের অনেকে হয়তো আগে ভোটও দিয়েছেন।

এই ৯১ লাখের মধ্যে ৬৩ লাখকে ধরা হয় মৃত বা অন্যত্র চলে গেছেন বা দুই জায়গাতে ভোটার তালিকায় নাম আছে। এ ছাড়াও যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে, তার সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। তাদের মধ্যে অ্যাডজুডিকেশন প্রক্রিয়ায় ১০ লাখ মতো লোকের নাম ভোটার তালিকায় আবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সে প্রক্রিয়ায় যাদের নাম ফিরে আসেনি, তাদের বিষয়টি ট্রাইবুনালে বিচারের জন্য গেছে। তাতে দুদফার ভোটে এক হাজার ৬০৭ জনের নাম পুনরায় যুক্ত হয়েছে।

ফলে ২০২৪ সালে যে তালিকার ওপর ভিত্তি করে লোকসভার ভোট হয়েছিল, তার থেকে অনেক নাম বাদ গেছে। এই বাদ দেওয়া ভোটদাতাদের মধ্যে অনেকে মৃত বা অনেকের দুই জায়গায় ভোট আছে, আবার এমন অনেকেও আছেন যারা প্রকৃত ভোটার হলেও তাদের নাম বাদ পড়েছে।

এই বাদ যাওয়া ভোটদাতাদের সংখ্যা প্রতিটি কেন্দ্রে, বিশেষ করে যেসব কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান কম, সেক্ষেত্রে এটা কার পক্ষে ও কার বিপক্ষে প্রভাব ফেলেছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নানা পরিসংখ্যান নানা অঙ্ক দেখাচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব নির্ধারণের অধিকারী কি না এবং এবারে ভোট না দিলেও পরেরবার দেবে বলে আদালতের মন্তব্য— এসবের মাধ্যমে নাগরিকের অন্যতম প্রধান অধিকার ভোটদানের অধিকার খর্ব হলো কি না, এ কথা এখন ভেবে আর বিশেষ কোনো লাভ নেই।

ভোট হয়ে গেছে। সরকার বদল হয়েছে। নতুন ইতিহাস গঠিত হয়েছে। এটাই সত্য। কিন্তু এই এসআইআরের বিষয়টি এবারে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে, তা ধরতেই হবে। তবে নির্বাচন পরিচালনা যেভাবে রক্তপাতহীন করা সম্ভব হয়েছে, তার কৃতিত্ব নির্বাচন কমিশন, রাজ্যের নির্বাচন পরিচালনার নেতৃত্ব, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর প্রাপ্য। বুথ স্তরে সংগঠিত দল যেভাবে নির্বাচনের দিনটাকে কাজে লাগায়, বাহিনীর উপস্থিতিতে সেটা করতে পারেনি। এটাও ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে কিছুটা হলেও গেছে।

এর বাইরে ভোটের প্রচারে যেভাবে ধর্মের বিষয়টি এবার প্রাধান্য পেয়েছে, আগে ঠিক এতটা দেখা গেছে বলে মনে হয় না। এমনকি ফল প্রকাশের পরেও ফল বিশ্লেষণে যেভাবে ধর্মের বিষয় বা ভিত্তি উল্লেখিত হয়েছে, তা মোটেই অভিপ্রেত নয়। তবে এবারের নির্বাচনের এই ফলাফলের অন্যতম কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ। আশা করি ভবিষ্যতে এটা আবার নতুন করে বড় কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না।

লেখক: পশ্চিমবঙ্গের সিনিয়র সাংবাদিক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ডিসি সম্মেলন: রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে চাই পেশাদারত্ব

বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে আরও গণমুখী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা বহুদিনের। এখনো অনেক ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শিকার হন।

৬ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সাফল‍্য দেখার অপেক্ষায়

ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন ধর্মীয় উগ্রতা বা বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে বৃহত্তর মানবিকতা, সার্বজনীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের পথে এগোয়। ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানটি যদি সত্যিকার অর্থে একটি ঐক্যের আহ্বান হয়ে ওঠে, তবে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হত

১৩ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বাংলাদেশের হিসাব-নিকাশ

বিজেপির নেতৃত্বে দিল্লির কেন্দ্র সরকার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের এখনকার নতুন সরকারের সঙ্গেও টেকসই সম্পৃক্ততা ও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রমাণিত। এটি ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচনি প্রচারের ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ তাদের দেশীয় রাজনীতির জন্য লাভজনক হতে প

১৩ দিন আগে

শিশু-কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা ও হয়রানির ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়।

১৬ দিন আগে