ভিক্ষাবৃত্তির বিস্তার ও আমাদের দায়

এম ডি মাসুদ খান

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু উঁচু দালান, বড় বড় সেতু কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্রের মানুষের কর্মসংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক মানসিকতা দিয়ে। যে সমাজে কর্মকে সম্মান করা হয়, সেই সমাজ এগিয়ে যায়। আর যে সমাজে ধীরে ধীরে ‘সহজ প্রাপ্তি’ পরিশ্রমের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, সেখানে একসময় উৎপাদনশীলতার জায়গা দখল করে নেয় নির্ভরশীলতা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভিক্ষাবৃত্তি এখন শুধু দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— আমাদের আবেগপ্রবণ মানবিকতা অনেক সময় অজান্তেই এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করছে।

এই উপলব্ধি আমার মধ্যে তৈরি হয় দুটি ভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে।

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে একদিন আমার সঙ্গে ছিলেন বিদেশি এক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। গাড়ি সিগন্যালে থামতেই জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন এক ভিক্ষুক। হাত বাড়িয়ে কিছু চাইলেন। ভদ্রলোক ভিক্ষুকের দিকে তাকিয়ে শুধু মৃদু হাসলেন এবং হাত নেড়ে অভিবাদন জানালেন। আমি ওয়ালেট থেকে কিছু টাকা বের করে তার হাতে দিলাম, যেন তিনি ভিক্ষুককে দিয়ে দেন, কারণ ভিক্ষুকটি তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।

টাকা দেওয়ার পর তিনি শান্তভাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি টাকা দিলে কেন?’

আমি বললাম, ‘একজন মানুষ সাহায্য চাইছে, তাই দিলাম।’

তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষকে ভিক্ষা দেওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ আমরা মনে করি, এতে মানুষ ধীরে ধীরে কাজের আগ্রহ হারায় এবং সমাজে পরিশ্রমের সংস্কৃতির বদলে নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।’

কথাটি তখন হয়তো কিছুটা কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে আরেকটি ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে এর গভীরতা উপলব্ধি করি।

আমার এক সুপরিচিত ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। তিনি বিদেশে কিছুদিন অবস্থান করছিলেন। একদিন তিনি একটি দোকানে কেনাকাটা করতে যান। ঠিক তখনই এক ভিক্ষুক এসে তার কাছে সাহায্য চায়। দোকানদার সঙ্গে সঙ্গে অনুরোধ করলেন, ‘দয়া করে তাকে টাকা দেবেন না।’

কিন্তু মানবিকতার জায়গা থেকে তিনি কিছু টাকা ভিক্ষুককে দিলেন। এতে দোকানদার স্পষ্ট বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনারা এভাবেই দেশ নষ্ট করেন। কর্মক্ষম মানুষকে ভিক্ষায় অভ্যস্ত করে তুলছেন।’

এরপর দোকানদার আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন— তিনি ওই চেয়ারম্যান ভদ্রলোকের কাছে কোনো পণ্য বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানান এবং সেটিই করেন। তার ভাষায়, ‘যে ব্যক্তি কর্মবিমুখতাকে উৎসাহ দেয়, তাকে আমি সমর্থন করতে পারি না।’

ঘটনাটি শুনতে কঠোর, এমনকি কিছুটা অমানবিকও মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক বার্তা রয়েছে— অনেক উন্নত সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে শুধু দারিদ্র্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়।

বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন জাগে— আমরা কি সত্যিই মানুষকে সাহায্য করছি, নাকি অজান্তেই একটি অসুস্থ সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছি?

বাংলাদেশে ভিক্ষাবৃত্তি এখন বহু ক্ষেত্রে একটি নীরব অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, ফেরিঘাট, মাজার, মার্কেট এবং ট্রাফিক সিগন্যাল— সবখানেই এর বিস্তার। শুধু অসহায়, বৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধী মানুষ নয়; অনেক ক্ষেত্রেই সুস্থ-সবল মানুষকেও এই পেশায় যুক্ত হতে দেখা যায়। কারণ সমাজে যখন সহজে সহানুভূতি পাওয়া যায়, তখন কিছু মানুষ শ্রমের চেয়ে সহজ উপার্জনের পথ বেছে নেয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো— ভিক্ষাবৃত্তির একটি বড় অংশ এখন সংঘবদ্ধ চক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করা থাকে। কে কোথায় বসবে, কার আয় কত হবে— এসব পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ দিতে হয় সেই চক্রের কাছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো শিশু ভিক্ষাবৃত্তি। ট্রাফিক সিগন্যাল, ফুটপাত কিংবা মার্কেটের সামনে কোলে ঘুমন্ত শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের দৃশ্য এখন খুব পরিচিত। অনেক ক্ষেত্রে এসব শিশু ভাড়া করা, আবার অনেক শিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরিচ্ছন্ন ও অসুস্থ দেখিয়ে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করা হয়। একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, সেখানে সে মানুষের গাড়ির কাঁচে কড়া নাড়ছে— এটি শুধু দারিদ্র্যের নয়, সামাজিক ব্যর্থতারও প্রতীক।

কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে শারীরিক অক্ষমতা প্রদর্শনের ঘটনাও দেখা যায়। কেউ নিজেকে অন্ধ, কেউ পঙ্গু বা অসুস্থ হিসেবে উপস্থাপন করে। আবার অভিযোগ রয়েছে, কিছু সংঘবদ্ধ চক্র শিশুদের বিকলাঙ্গ করেও ভিক্ষাবৃত্তিতে নামায়। যদি একটি সমাজে মানুষের সহানুভূতি অপরাধচক্রের আয়ের উৎস হয়ে যায়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে জাতির জন্য ভয়াবহ সংকেত।

ধর্মীয় আবেগও এখানে বড় একটি মাধ্যম। জুমার দিন, রমজান, ঈদ কিংবা মাজারকেন্দ্রিক এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি হঠাৎ বেড়ে যায়। কারণ মানুষ ধর্মীয় আবেগ থেকে বেশি দান করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই অর্থ কতটা প্রকৃত অসহায়ের কাছে পৌঁছায়, আর কতটা একটি সংগঠিত চক্রের হাতে যায়?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পার্থক্য বোঝা। ক্ষুধার্ত মানুষকে সহায়তা করা অবশ্যই মানবিক কাজ। কিন্তু প্রতিনিয়ত নগদ অর্থ দিয়ে যদি আমরা একজন সুস্থ মানুষকে কর্মবিমুখ করে তুলি, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র— উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।

উন্নত দেশগুলোতে সরাসরি ভিক্ষা নিরুৎসাহিত করার পেছনে কারণ আছে। তারা চেষ্টা করে মানুষকে পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে। কারণ তারা জানে, ভিক্ষা সাময়িক ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু কর্ম একটি মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শেখায়।

বাংলাদেশেও প্রয়োজন সেই দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি, দক্ষতা উন্নয়ন, ভ্রাম্যমাণ শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা এবং সংঘবদ্ধ ভিক্ষুক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি জরুরি— যেন আবেগের বশে নয়, দায়িত্ববোধ থেকে সাহায্য করা হয়।

সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা সত্যিই অসহায়। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই সহায়তা হওয়া উচিত পরিকল্পিত— খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা পুনর্বাসনের মাধ্যমে; যেন একজন মানুষ আজীবন হাত না পাতে, বরং নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

কারণ একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার মানুষ ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ায় না; বরং শ্রম, দক্ষতা ও আত্মসম্মানের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।

আজ আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন— আমরা কি সত্যিই মানুষকে বাঁচাচ্ছি, নাকি অজান্তেই এমন একটি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছি, যা একদিন পুরো সমাজের কর্মস্পৃহাকে গ্রাস করবে?

লেখক: কলামিস্ট ও বনবিদ

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

দেশীয় উৎস এবং পুঁজিবাজারকে আস্থায় নিতে হবে

এ দেশ এখনো পর্যন্ত মীরজাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (ইন্ডিকো) কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রমুক্ত হতে পারেনি। ওদের ওপর সরকারসহ প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। জাতীয় ঐক্য সুসংহত হওয়ার বিষয়টিও জরুরি।

১২ দিন আগে

বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) হঠাৎ করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক (OPEC) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে।

১২ দিন আগে

রাষ্ট্রনায়কের সততা ও নেতৃত্বই টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি

সুশাসন, যাকে আমরা রাষ্ট্রপরিচালনার কার্যকর পদ্ধতি বলি, সেটি মূলত সেই কাঠামো যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নীতিমালা বাস্তবায়ন ও নাগরিক সেবার মান নির্ধারিত হয়। যখন এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক উন্নয়ন এক

১৩ দিন আগে

শ্রমজীবীদের অধিকার কিতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই

পহেলা মে এক দিনের আন্দোলনের ফসল নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে কিছুটা প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে এই দিনে। কাজেই ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ শ্রমিকের মর্যাদা বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন।

১৩ দিন আগে