ডিসি সম্মেলন: রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে চাই পেশাদারত্ব

ড. মিহির কুমার রায়

সরকারের নীতি, উন্নয়ন কর্মসূচি ও মাঠ প্রশাসনের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রস্তাব বিষয়ে আলোচনা, নির্দেশনা গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিবছর জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন আয়োজন করা হয়ে থাকে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারের সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। সম্মেলনে ডিসিদের কারও আজ্ঞাবহ না হয়ে নির্ভয়ে জনমুখী প্রশাসন পরিচালনার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে জনগণের কল্যাণে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিন দিনের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টিই ছিল কার্য অধিবেশন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা ছিল ৫৬টি। মাঠ প্রশাসন থেকে মোট এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব এলেও আলোচনার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয় ৪৯৮টি প্রস্তাব। সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব এসেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সম্পর্কিত। এ বিভাগের জন্য ৪৪টি প্রস্তাব জমা পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ জনগণের বিশ্বাস। তাই জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে এবং জনকল্যাণের স্বার্থে কাজ করতে হবে। তিনি জনপ্রশাসনকে জনমুখী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার ভাষায়, প্রশাসনকে অবশ্যই জনগণের আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমেই জনমনে বিশ্বাস গড়ে ওঠে। প্রশাসন শুধু আইন প্রয়োগের যন্ত্র নয়, এটি মানুষের সেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তিনি জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের যেকোনো আইনি ও মানবিক উদ্যোগে সরকারের সহায়তার আশ্বাস দেন।

প্রধানমন্ত্রী দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলে এই জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে। তার মতে, বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক বড় এবং সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে এই প্রজন্মই দেশকে বদলে দিতে সক্ষম হবে।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র ও সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, পরিবারের মূল্যবোধ শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধও সুসংহত হয়। কারণ অসংখ্য পরিবারের সমন্বয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়।

এবারের সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়গুলো ছিল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সন্ধ্যার মধ্যে মার্কেট বন্ধ রাখা, মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বাড়ানো, জনগণের ন্যায্য অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, বাল্যবিবাহ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

ছাত্রছাত্রীদের খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানো, বন্যা ও খরা মোকাবিলা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। সর্বোপরি জনস্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

চার দিনের সম্মেলনের কার্য অধিবেশনগুলো ছিল প্রাণবন্ত। সরকারের আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব অধিবেশনে অংশ নেন। মাঠ প্রশাসনের নানা সমস্যা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা উঠে আসে আলোচনায়।

জেলা প্রশাসকরা কৃষি খাতের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, কৃষকরা সার ও পানিসংকটে ভুগছেন। সারের নির্ধারিত ডিলার না থাকা এবং বিক্রয়কর্মীদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণের কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেচের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল ও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। এসব সমস্যা সমাধান না হলে কৃষক পেশা পরিবর্তন করতে পারেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় ডিসিরা দ্রুত সারের ডিলার নিয়োগ, পানিসংকট নিরসন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কোরবানির পশুর বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার দাবি জানান।

দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুমোদন ও নীতিমালা ছাড়াই পর্যটন স্পট গড়ে ওঠার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এসব স্থানের মালিকরা সরকারকে কর দিচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন।

পাট খাতের সমস্যাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যের কথাও উঠে আসে। বিদেশি সুতা ও তুলা আমদানির কারণে দেশীয় তুলা উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানানো হয়।

আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশুর চামড়া সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচির প্রস্তাব দেওয়া হয়। মসজিদ ও মাদরাসায় বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ এবং ঈদের পর সাত দিন কাঁচা চামড়া ট্রাকে পরিবহন বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়।

নৌ খাতের বিভিন্ন সমস্যাও আলোচনায় আসে। অধিকাংশ নৌ যানের নিবন্ধন নেই। নৌ ঘাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। নৌ বন্দরের আশপাশের সরকারি জমি প্রভাবশালীরা দখল করে ভাড়া দিচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি জমি দখল, নদী ও খালে অবৈধ বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ এবং সরকারি জমি ভাড়া দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এসব দখলদারিত্বের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানানো হয়।

সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেট ও নাটোরে খাদ্যগুদাম স্থাপনের বিষয়ে সরকার নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে কৃষক শেল্টার নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়। ত্রাণের পরিমাণ বাড়ানো এবং ডেউটিনের বরাদ্দ বৃদ্ধির সুপারিশও করা হয়।

ফেব্রুয়ারিতে ১৭ বার ভূমিকম্প হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ প্রেক্ষাপটে ঢাকার জন্য ভূমিকম্প-সহনশীল স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

সংস্কৃতি খাত নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। দেশের ৫৬৪টি প্রত্নস্থল ও ২১টি জাদুঘরের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। বাউল ও লালনশিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপসংস্কৃতি রোধে জেলা প্রশাসকদের কঠোর হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।

প্রায় প্রতিবছরই ডিসিরা তাদের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর দাবি তোলেন। এ বছরও বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। তবে একাধিক ডিসি আক্ষেপ করে বলেছেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আলোচনায় প্রাধান্য পায়নি। অতীতেও অনেক সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতি বছরই একই ধরনের প্রস্তাব আবার উত্থাপন করতে হয়।

সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের কাছ থেকে আসা ৩৫৪টি প্রস্তাব কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় সমস্যার প্রতিফলন।

সাধারণত জেলা প্রশাসকদের তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। রাজস্ব আদায়, বিচারসংক্রান্ত কাজ এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন। এসব দায়িত্ব পালনে তাদের নিরপেক্ষ ও পেশাদার থাকা জরুরি। প্রশাসন যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে কাজ করে, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। তাই দল বা সরকারের প্রতি আনুগত্য নয়, পেশাদারত্বই প্রশাসনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে আরও গণমুখী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা বহুদিনের। এখনো অনেক ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শিকার হন।

চার দিনের এই সম্মেলন শেষে জেলা প্রশাসকরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। এখন প্রত্যাশা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে সরকারের উপলব্ধির পরিসর বাড়াতে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। একইসঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণ আরও শক্তিশালী হবে— এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি); সাবেক পরিচালক, বার্ড (কুমিল্লা); সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

১৬ দিন আগে

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

১৮ দিন আগে

পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আ

১৯ দিন আগে

আমরা যা দেখাই, আমরা কি সত্যিই তাই?

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন

২০ দিন আগে
Advertisement