পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সাফল‍্য দেখার অপেক্ষায়

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

বড় প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালের সমাপ্তি ঘটল। সোমবার (৪ মে) বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে বিপুল ব্যবধানে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এলো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এর আগে এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী বামফ্রন্টের টানা ৩৪ বছরের শাসনের অবসান হয়েছিল। সেই পরিবর্তন একসময় যেমন রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়েছিল, তেমনি বর্তমান পরিবর্তনও নতুন বাস্তবতার সূচনা করছে।

ষাটের দশক থেকেই মতাদর্শিক বিভেদের মধ্যেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত অবস্থান বদলাতে গিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ভেতরে পুঁজিবাদী অভিযোজন ঢুকে পড়ে। ফলে তত্ত্বে সাম্যবাদ থাকলেও বাস্তবে সেই রাজনীতি ধীরে ধীরে পুঁজিবাদী কাঠামোর সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের দীর্ঘ শাসনকাল এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই টিকে ছিল। বিশ্বাসে সাম্য ও সমতার কথা বলা হলেও প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় পুঁজিবাদী প্রভাব স্পষ্ট ছিল। সেই কাঠামো ভেঙে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন, যা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকভাবেও স্মরণীয়।

বামফ্রন্টের পতনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রথমবারের মতো পায় নারী মুখ্যমন্ত্রী, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি। তবে একই সঙ্গে বাংলা ও বাঙালি জাতীয় সত্তার সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক বিকাশে সংকট তৈরি হয়েছে— এমন অভিযোগও বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হয়েছে। বাস্তবতার বিচারে এ বিতর্কেরও একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তবে এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সেটি নয়; বরং নতুন ক্ষমতাসীন শক্তির প্রতি ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাই এখানে মুখ্য।

ভারতের প্রধান ডানপন্থি রাজনৈতিক দল বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে উত্থান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি ভবানীপুরে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে আছেন, এর আগেও নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে আলোচনায় এসেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এখানে ক্ষমতায় আসা দলগুলো সাধারণত দীর্ঘ সময় শাসন করে। সেই বাস্তবতায় ধরে নেওয়া যায়, বিজেপির শাসনকালও দীর্ঘ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই নতুন নেতৃত্বের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা উঠে আসে।

প্রথমত, ভারতীয়দের দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। এই দেশপ্রেম শুধু আবেগ নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সমাজের ভেতরে যে একতাবোধ রয়েছে, তা বহিরাগত চাপ মোকাবিলায় একটি বড় শক্তি। এই দুই শক্তিকে ভিত্তি করে যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এগোয়, তবে তা শুধু একটি রাজ্যের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তা অনেক সময় দেশি-বিদেশি শক্তিকে সুযোগ তৈরি করে দেয়। ইতিহাস সাক্ষী— ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঠিক এভাবেই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল। মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে যে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব দুই শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের মানুষকে ভোগ করতে হয়েছে।

মাত্র ৭৮ বছর আগে ১৯৪৭ সালে সেই ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভের পরও যদি আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিই, তবে একই ধরনের ঝুঁকি আবারও তৈরি হতে পারে। আবেগ, ক্ষোভ ও অসন্তোষকে পুঁজি করে বহিরাগত শক্তি কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে— তা আজও প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করা।

ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন ধর্মীয় উগ্রতা বা বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে বৃহত্তর মানবিকতা, সার্বজনীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের পথে এগোয়। ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানটি যদি সত্যিকার অর্থে একটি ঐক্যের আহ্বান হয়ে ওঠে, তবে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হতে হবে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও সচেতন সমাজ গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রয়োজন নাগরিক সমাজকে সক্রিয় ও সচেতন রাখা, যেন কোনো ধরনের গোপন প্রভাব বা কৌশলগত আগ্রাসন সহজে শেকড় গেড়ে বসতে না পারে। ইতিহাস দেখিয়েছে, বহিরাগত শক্তি কখনো সরাসরি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই প্রবেশ করে। তাই এই জায়গাগুলোকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় উপমহাদেশ একটি সম্ভাবনাময়, উর্বর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা শুধু স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের যেকোনো রূপ প্রতিহত করা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা সময়ের দাবি।

সবশেষে বলা যায়, ধর্মীয় উগ্রতা নয়, বরং মানবিকতা, জ্ঞান, ঐক্য ও সচেতনতার ভিত্তিতে রাজনীতি পরিচালিত হলেই এই অঞ্চলের মানুষ নিরাপদ ও সম্মানজনক ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্ব যদি এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, সেটিই হবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নয়, দুর্নীতি কমাতে হবে

গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছে সাধারণ মানুষ।

৬ দিন আগে

যুদ্ধের ১০০ দিন: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন সমীকরণ

যুদ্ধের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সামনে ইরান দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়বে— এমন ভবিষ্যদ্বাণীও কম ছিল না। কিন্তু ১০০ দিন পর যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে প

৭ দিন আগে

কোরবানির পশুতে স্বনির্ভরতা: বদলে যাওয়া অর্থনীতির গল্প

আজ বাংলাদেশ শুধু কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে। এটি নিছক কৃষি বা প্রাণিসম্পদ খাতের সাফল্য নয়; এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতির এক অনন্য অর্জনের গল্প।

৮ দিন আগে

রামিসার বিচার শুরু: প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও আশার আলো

রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর এ তাৎক্ষণিক গমন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। নিজের ব্যস্ত সূচি ও মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে গভীর রাতে পল্লবীর একটি সাধারণ বাসভবনে তার ছুটে যাওয়া প্রমাণ করে, প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রামিসার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে এটি এক বড় সান্ত্বনা যে তারা

১৩ দিন আগে