শিশু-কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া

অদিতি করিম
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে সারা বিশ্বেই উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতীকী ছবি

আমাদের শিশু-কিশোররা এখন এক ভয়াবহ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের বিকাশে এখন সবচেয়ে বড় বাধার নাম সোশ্যাল মিডিয়া। ছোট শিশুদের হাতে আমরা বইয়ের বদলে তুলে দিচ্ছি স্মার্ট ডিভাইস। শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইলে। যা খুশি অবাধে দেখতে পারছে। লেখাপড়ার বদলে সারাক্ষণ তাদের চোখ ডিভাইসে।

এটি একদিকে যেমন তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যাও তৈরি করছে। কিশোর বয়সে এসে মোবাইল তাদের মাদকে আসক্ত করছে, সহিংসতার দিকে প্রলুব্ধ করছে।

মোবাইল ডিভাইসে অশ্লীল কনটেন্ট দেখে কিশোররা ইভ টিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একসময় ফেসবুক আর টিকটকের কারণে তারা কিশোর গ্যাংয়ে পরিণত হচ্ছে। এভাবেই একের পর এক প্রজন্ম বিপথে চলে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের শিশু-কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

‘আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলা’— এ ধরনের ঘটনার খবর আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। হামলায় কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। প্রতিটি হামলার ঘটনায় সর্বনিম্ন ৩০-৪০ জনের একটি সংঘবদ্ধ কিশোর দল থাকে।

কোথাও কোথাও হামলায় শতাধিক কিশোরও দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— মুহূর্তের মধ্যে এত কিশোর একসঙ্গে জড়ো হচ্ছে কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর তথ্য— কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রত্যেক হামলার পেছনেই ব্যবহার হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইমোতে গ্রুপ খুলে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে থাকা গ্রুপের অন্য সদস্যদের কাছে। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তারা এক জায়গায় জড়ো হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা ও হয়রানির ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়— এসব অ্যাপ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন ব্যক্তিগত অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর মনোযোগ সর্বোচ্চ সময় ধরে রাখা যায়। ফলে সব বয়সের ব্যবহারকারীই দীর্ঘ সময় ডিভাইসে কাটাতে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি খারাপ ফলাফল, ঘুমের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণও হতে পারে।

এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়; সারা বিশ্বেই শিশু-কিশোরদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক পথ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ কারণেই শিশু-কিশোরদের জন্য ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করেছে।

যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, স্পেনসহ বিশ্বের অনেক দেশ শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়েছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কমবয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাজ্যও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে।

দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডস ২১ জানুয়ারি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দেয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের ওপর অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠোর হওয়ার চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ফ্রান্স ও ডেনমার্কও বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

নরওয়ে স্বীকার করেছে, বর্তমান বিধিনিষেধগুলো কার্যকর নয়। দেশটি আরও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে। চীন শিশুদের জন্য সবচেয়ে কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলোর একটি প্রয়োগ করেছে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দৈনিক স্ক্রিন টাইম ৪০ মিনিটে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। তাদের জন্য স্থানীয় সময় রাত ১০টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ডিজিটাল প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের বিরুদ্ধে শিশু ও কিশোরদের মানসিক ক্ষতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলসে গত ২৬ জানুয়ারি এই মামলাটি দায়ের হয়। সেখানে এই তিন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, অ্যালফাবেট ও বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।

মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের মনোযোগ ধরে রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচার করে। বাদীপক্ষ বলছে, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করেছে, যা শিশুদের আসক্ত করে ফেলে।

বৈশ্বিক এই উদ্যোগগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার পুরো দায় শুধু মা-বাবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সঠিক নয়; বরং যেসব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার বিনিময়ে বিপুল অর্থ আয় করছে, এ ক্ষতির দায় তাদেরও বহন করতে হবে।

একসময় ভাবা হতো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের ওপর বাবা-মা ঠিকভাবে নজর রাখলেই সমস্যা হবে না। কিন্তু এখন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নরওয়ে, তুরস্কসহ অনেক দেশেই সরকারগুলো বলছে, শুধু অভিভাবকের তদারকি যথেষ্ট নয়। এর মানে এই নয় যে মা-বাবা বা সরকার দায়মুক্ত। শিশুদের সুরক্ষায় পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে এখন স্পষ্ট হচ্ছে, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার দায় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো এড়াতে পারে না।

আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক শিশুদের আবদার পূরণ ও ‘বিরক্ত করা’ থেকে বাঁচতে তাদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। অনেক সময় শিশুদের খাওয়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ‘ঝামেলা’র শর্টকাট সমাধান হিসেবে মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেওয়াই স্বস্তিকর মনে হয়। এটি হয়তো সাময়িক সমাধান, কিন্তু এটিই শিশু-কিশোরদের মারাত্মক আসক্তির সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা ভবিষ্যতে তাদের এমন এক জালে আটকে দেয়, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন।

এই ডিজিটাল জগৎ শিশুদের জন্য যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, আসক্তি— এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রশ্ন হলো— এই ক্ষতির দায় কার? এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের একা দাঁড় করানো বাস্তবসম্মত নয়। একটি পরিবার কীভাবে ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যালগরিদমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে?

সারা বিশ্ব শিশুদের সুরক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ক্রমবর্ধমান কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ সোশ্যাল মিডিয়া।

সম্প্রতি বাল্যবিবাহ নিয়ে কাজ করা একটি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণাতেও উঠে এসেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নারী, বিশেষ করে কিশোরীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। কিশোরদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে অন্তত ২০৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। তাদের মনোসংযোগ নষ্ট হয়েছে। প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়া কেড়ে নিচ্ছে শিশু-কিশোরদের জীবনীশক্তি।

এ বিষয়টি আমরা যত উপেক্ষা করব, সমস্যা ততই ঘনীভূত হবে। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে এখনই সোশ্যাল মিডিয়াকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। এটাই হওয়া উচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

লেখক: লেখক ও নাট্যকার

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

দখলদারির ছাত্র রাজনীতি ও নতুন বাংলাদেশের শঙ্কা

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একসময়ের মিত্র জামায়াত-শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তা কিছুটা একাত্তরের বিভাজন বা আদর্শিক হলেও এর মূল কারণ ‘দখলদারি’। ছাত্র রাজনীতির উপযোগিতা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

৪ দিন আগে

বাংলাদেশ-ইইউ অংশীদারিত্ব: নীরব কূটনৈতিক অগ্রযাত্রা

দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সই হওয়া অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান পুনর্নির্ধারণের একটি সূচক।

৪ দিন আগে

কুষ্টিয়ায় সুফি ও কক্সবাজারে সাধু হত্যা: কোন পথে দেশ?

‘তৌহিদি জনতা’ একক সুসংগঠিত দল নয়, বরং ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কিছু কট্টরপন্থি এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি ‘মব’ বা উগ্রবাদী অ্যাকশন টিম, যা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শূন্যতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

৫ দিন আগে

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক: পুরোনো মোড়ক, নাকি নতুন মোড়?

এটি নয়াদিল্লির সেই স্বীকৃতিকে তুলে ধরে— ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্কটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা দূরত্ব বজায় রেখে পরিচালনার বিষয় নয়। যখন কোনো সরকার পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন কৌশলী রাজনীতিককে নিয়োগ দেয় তখন তা প্রায়শই স্বীকার করে নেওয়া হয়, প্রশ্নাধীন সম্পর্কটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক কৌশল ও দীর্ঘ

৫ দিন আগে