ইসরায়েলের হিসেবি হামলা— কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও আমেরিকার নীরব সমর্থন

সাইমন মোহসিন

মধ্যপ্রাচ্য আবার এক অস্থির সংকটের মুখোমুখি। শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর চালানো অভূতপূর্ব বিমান হামলা পুরো অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ হামলাকে একটি ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে চূর্ণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে সমর্থনে বাধ্য করেছে।

ইসরায়েলের এ হামলার মাত্রা ও নির্ভুলতা নজিরবিহীন। প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান একযোগে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এর মধ্যে ছিল ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা নাতানজ, বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো। এই অভিযানে ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোরের প্রধান জেনারেল হোসেইন সালামী ও সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ বাগেরিসহ একাধিক খ্যাতনামা পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন।

হামলার আগে ইরানের অভ্যন্তরে বিস্ফোরক ড্রোন ও নির্ভুল অস্ত্র প্রবেশ করানোর তথ্য ইসরায়েলের গোয়েন্দা শক্তির বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছে। নাতানজ থেকে কালো ধোঁয়ার উত্থান ও পশ্চিম ইরানে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাডার সিস্টেমগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এ হামলা ছিল স্পষ্টতই ইরানের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করার প্রচেষ্টা।

ইরান এ হামলার পরপরই কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ‘চরম শাস্তি’র প্রতিশ্রুতি দেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলের দিকে শতাধিক ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়। ইসরায়েল অবশ্য দাবি করেছে, তারা এসব ড্রোনের বেশির ভাগই নিজেদের সীমান্তের বাইরে ধ্বংস করে দিয়েছে।

তেহরানের পালটা ব্যবস্থা এই সংকটের নিয়ন্ত্রণহীনতার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান এরই মধ্যেই আরেক দফা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি ইঙ্গিত করে যে সংঘাত আর কেবল প্রতীকী প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্রমেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

হোয়াইট হাউজ এ হামলার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করলেও মার্কিন প্রশাসনের পদক্ষেপগুলো ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। হামলার ঠিক আগে ইরাক থেকে কূটনৈতিক কর্মীদের প্রত্যাহার এবং সামরিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগের অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা হামলার পূর্বজ্ঞান থাকার সম্ভাবনা তৈরি করে।

আমেরিকার প্রশাসন অবশ্য দাবি করছে, তারা হামলায় ‘জড়িত ছিল না’। তবে তারা দ্রুত ইসরায়েলের ‘আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ’কে সমর্থনও জানায়। এই দ্বিমুখী অবস্থান দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত দৃশ্য— শান্তির পক্ষে মুখে কথা বলা, কিন্তু কাজে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের স্বার্থে সক্রিয় সহায়তা।

ইরানের পালটা হুমকি, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধের আশঙ্কা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বিশ্ব জুড়ে, বিশেষ করে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে।

এ হামলা ওমানে অনুষ্ঠেয় পারমাণবিক আলোচনা স্থগিত করে দিয়েছে। ইরান এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে, ভবিষ্যত আলোচনা ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ।’ এই পরিণতি একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের মৃত্যু ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ব্যর্থতাকেও নির্দেশ করে বটে।

ইসরায়েলের এই হামলাকে ‘সময়োপযোগী’ ও ‘সুসমন্বিত’ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্যের পরিচায়ক। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করে নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেছেন, তেল আবিবের কৌশলগত কাঠামোর বাইরে বের ওয়াশিংটন হতে পারছে না।

নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গিতে সামরিক সংঘাত একটি কৌশল, যার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অপরিবর্তনীয় অবস্থানে আটকে ফেলেছেন, যেখানে কূটনৈতিক বিকল্প আর বাস্তবতা নয়।

এই সংকট মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব উন্মোচন করেছে। একদিকে তারা ‘কূটনৈতিক সমাধানে’র পক্ষে কথা বলছে, অন্যদিকে কার্যত তারা এমন এক মিত্রের হাতে নিজেদের সিদ্ধান্ত ন্যস্ত করেছে, যার লক্ষ্য অনেক সময়েই আমেরিকান জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ হামলায় অংশ নেয়নি’ বক্তব্য ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ছায়া সমর্থন বাস্তবে একটি ‘ব্ল্যাংক চেক’ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে ইসরায়েল ইচ্ছামতো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার পরিণতি বহন করতে হয়।

ইরান এখানে কার্যত একা। আঞ্চলিক সুন্নি দেশগুলো, যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মৌখিক নিন্দা জানিয়েছে, বাস্তবে শিয়া ইরানের প্রতিরক্ষায় খুব কম আগ্রহ দেখাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতায়, ইরান একঘরে থেকে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কোন্নয়নের প্রবণতা, বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি ও গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের সময় আরব রাষ্ট্রগুলোর নিষ্ক্রিয়তা সেই পরিবর্তিত ভূ-কৌশলগত বাস্তবতা তুলে ধরে।

এই সংঘাত শুধু আরেকটি যুদ্ধ নয়, এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তা হলো— একটি আঞ্চলিক মিত্র কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে ছায়ারেখায় চালিত করতে পারে। কূটনীতিকে বাদ দিয়ে সামরিক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই প্রবণতা শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টার ওপর একটি চূড়ান্ত আঘাত।

নেতানিয়াহু হয়তো ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমে ধাক্কা দিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতির সম্ভাবনাকেও গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে পারে, নাকি একটি আঞ্চলিক মিত্রের আগ্রাসী নীতির প্রতি বশ্যতাই স্বীকার করতে থাকে।

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে