যা আছে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে

ড. মিহির কুমার রায়

ভূমিকা

গত এপ্রিলে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০২৫’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি ও শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসার কারণে বাংলাদেশে চলতি বছর নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ অতি দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা ব্যবহার করে বিশ্বব্যাংক এই পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, একজন মানুষের দৈনিক আয় ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম হলে তাকে অতি দরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাজে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া অর্থ আর্থসামাজিক বৈষম্য আরও বাড়বে। বৈষম্য নির্ণয় সম্পর্কিত জিনি অনুপাত ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হতে পারে ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ।

প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য দিক

এক: গত বছর দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত দুই বছর, অর্থাৎ ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কম হওয়া এবং শ্রমবাজারের পরিস্থিতি খারাপ হওয়াকে এ পরিস্থিতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

দারিদ্র্য পরিস্থিতি অবনতির অন্য আরও যেসব কারণের কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— দুর্বল ব্যবসা পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসা, বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে এ সুযোগ সীমিত হয়ে আসা ইত্যাদি।

দুই: বিবিএসের হিসাবে, গত তিন অর্থবছরের মধ্যে ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে এ হার কিছুটা বেড়ে হয় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, এ বছর শেষে দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

অবশ্য পরের দুই বছর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে আসবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে বিশ্বব্যাংকের। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ ও ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

তিন: গত বছর শ্রমশক্তির হার ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। শ্রমশক্তিতে নারীর হার কমে আসাকে এর প্রাথমিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ হার গত বছর ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে শ্রমশক্তির ২০ লাখ ৬০ হাজার মানুষ কাজের বাইরে ছিল। তাদের ২০ লাখ ১০ হাজারই নারী। অন্যদিকে কর্মংসংস্থান সাত কোটি ১০ লাখ থেকে ছয় কোটি ৯৪ লাখে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব খাতেই কাজের সুযোগ কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে সেবা খাতে— ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়া কৃষি খাতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ ও শিল্প খাতে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এর ধাক্কায় বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ২০ হাজার।

চার: বিশ্বব্যাংকের দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট: ট্যাক্সিং টাইমস’-এর পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে ৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। নতুন পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

পাঁচ: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পেছনে দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। রাজস্ব সংস্কার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক খাতের সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধির গতি আরও মন্থর হতে পারে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহসী ও লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ও বাংলাদেশের নীতিসহায়তা

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্যভুক্ত একটি দেশ। সে হিসাবে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার বলেছেন, বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে অনুকরণীয়। বাংলাদেশ নিজেই তাদের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে, বিশ্বব্যাংক সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক সব সময় পাশে থাকবে।

আগামী দিনগুলোতে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ও হাইড্রোজেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক অবদান রাখবে। হাইড্রোজেন পলিসি বিনির্মাণে ও ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের জন্য অংশীজনদের আগ্রহী করাতে বিশ্বব্যাংক অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটকে মানসম্পন্ন ও অন্তর্জাতিক মানের করতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

বায়ু বিদ্যুৎ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এ সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ক্যাপটিভ পাওয়ার, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, সোলার ইরিগেশন পাম্প, লিথিয়াম ব্যাটারি, জলবিদ্যুৎ, আঞ্চলিক পাওয়ার ট্রেড, নেট মিটারিং ও রুপটপ সোলার, গ্রিন বিল্ডিং, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার, তেল রিফাইনারি, ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনাল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সহায়তা হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সঞ্চালনের ওপর ফোকাস খুবই আশাব্যাঞ্জক। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ ও সম্ভাবনার নতুন নতুন ক্ষেত্র অন্বেষণ বাংলাদেশকে উজ্জ্বলতর করছে। এ সময় দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পাওয়ার ট্রেড সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্বব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করে।

প্রসঙ্গত, গ্যাস মিটার সংক্রান্ত দুটি প্রকল্প বিশ্বব্যাংকে অনুমোদিত হয়েছে, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতেও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ছয়টি প্রকল্প চলছে।

উপসংহার

বিশ্বব্যাংক সবসময়ই বাংলাদেশের কাঠামোগত সংস্কারে বিশ্বাসী। আশা করা যায় আগামী দিনেও এই সংন্থার সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বার্ড (কুমিল্লা) এবং সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেধা সম্পদ ও একাডেমিক মেরিটোক্রেসি

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই একাডেমিক মেরিটোক্রেসিকে (বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে শুধু যোগ্যতা ও কাজের মানের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরের ভিত্তিতে নয়) যথাযথভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।

৪ দিন আগে

আফসানা বেগম কি সংস্কারের শাস্তি পেলেন?

একজন উপদেষ্টার কাছ থেকে আমরা আশা করি নীতিগত সততা, সংস্কারের সাহস এবং মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। কিন্তু এখানে দেখা গেল উল্টো চিত্র— সংস্কারের প্রস্তাবকে শাস্তি দিয়ে দমন করা হলো। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা এখানে পক্ষ নেওয়া। আর সেই পক্ষটি দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের।

৫ দিন আগে

বিএনপিকে সামনে এগিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার অনিবার্য। সেই সংস্কারের স্পিরিট বা চেতনা আমি এখন বিএনপির রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। তাই দেশের এ বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বিএনপির সঙ্গেই পথ চলাকে আমি শ্রেয় মনে করেছি এবং যোগদানের সিদ্ধান

৫ দিন আগে

উপকূলীয় পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে এখনো পিছিয়ে। বছরে ৩০-৪০ লাখ দেশীয় পর্যটক এলেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নগণ্য। তুলনায় থাইল্যান্ড বছরে প্রায় চার কোটি বিদেশি পর্যটক থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। আর মালদ্বীপ মাত্র ২০ লাখ পর্যটক থেকেই তার জিডিপ

৭ দিন আগে