টিএসসি: একটি অনানুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়

টিএসসি: একটি অনানুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়

একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার ও পরীক্ষার হল দিয়ে পূর্ণতা পায় না। এসব প্রতিষ্ঠান জ্ঞান বিতরণ করতে পারে, শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাই করতে পারে এবং ডিগ্রি দিতে পারে। কিন্তু এগুলো একা চিন্তাশীল, সংস্কৃতিমান ও দায়িত্বশীল মানুষ গড়ে তুলতে পারে না।

একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি পরিসরও প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সীমার বাইরে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন, যেখানে জ্ঞান সংস্কৃতির সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে, যেখানে মতপার্থক্য যুক্তিনির্ভর আলোচনায় পরিণত হয় এবং যেখানে তরুণেরা শেখে যে স্বাধীনতা ও দায়িত্ব পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

উচ্চশিক্ষার এই বিস্তৃত দর্শন থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, যা টিএসসি নামে সর্বজনবিদিত। ১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করা এই কেন্দ্রকে শুধু একটি মিলনায়তন, ভোজনালয় বা বিনোদনের স্থান হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়নি; বরং এর লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠা, যেখানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পারস্পরিক সংযোগ, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সেবা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বিকশিত হবে।

প্রতিষ্ঠার ছয় দশকেরও বেশি সময় পর টিএসসি এখন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত প্রাতিষ্ঠানিক ও জনপরিসর। এটি একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্র, আধুনিক স্থাপত্যের একটি নিদর্শন, সাংস্কৃতিক আয়োজনের ঠিকানা, শিক্ষার্থীদের মিলনস্থল, বিভিন্ন সংগঠনের কার্যকেন্দ্র এবং জনমত প্রকাশের একটি প্রতীকী মঞ্চ।

তবে এর বর্তমান পরিচয় প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষিত উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল। টিএসসিকে ন্যায়সঙ্গতভাবে মূল্যায়ন করতে হলে এর প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্দেশ্য, বর্তমান কার্যক্রম এবং প্রশাসনিকভাবে পরিচালিত কেন্দ্রের সঙ্গে আশপাশে গড়ে ওঠা বৃহত্তর জনপরিসরের পার্থক্য বুঝতে হবে।

প্রতিষ্ঠার মূল শিক্ষাদর্শন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবরণে টিএসসিকে বিশ্রাম ও নির্দেশনার জন্য নির্মিত সমগ্র ক্যাম্পাসভিত্তিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমাত্রিক জীবনকে একত্র করার মতো একটি সামাজিক কেন্দ্র হিসেবেই একে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো— বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, টিএসসি এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বপরিচালিত কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের কল্যাণের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে।

এ ঘোষণার মধ্যে টিএসসির মূল দর্শনের গভীরতা নিহিত রয়েছে। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের নিছক বিনোদন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিক্ষিত করে তোলাও ছিল এর লক্ষ্য। বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী, প্রকাশনা, প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছাসেবা ও সম্মিলিত উদ্যোগ পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, সহযোগিতা, মতপার্থক্য ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সিদ্ধান্তের পরিণতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে শিখবে— এমনটিই ছিল প্রত্যাশা।

টিএসসির আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি ক্যাম্পাসসমাজ গড়ে তোলা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমের সম্পূরক হয়ে উঠবে। এখানে ‘সম্পূরক’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। টিএসসি কখনো শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হওয়ার কথা ছিল না। বরং শ্রেণিকক্ষ যে শিক্ষা সব সময় দিতে পারে না, সেই আন্তঃবিভাগীয় যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়, সাংস্কৃতিক পরিশীলন, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর বিশ্ববিদ্যালয়সমাজের সদস্য হওয়ার অনুভূতি গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

এর নামের মধ্যেও একটি বিশেষ প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের ক্লাব নয়, বরং ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র। শ্রেণিকক্ষের আনুষ্ঠানিক ও স্তরভিত্তিক সম্পর্কের বাইরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এখানে তুলনামূলকভাবে মুক্ত পরিবেশে মিলিত হবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, ভোজনকক্ষ, পাঠকক্ষ, সভাকক্ষ, বিশ্রামাগার ও বিনোদনের সুবিধা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক দূরত্ব কমাবে এবং বিভিন্ন প্রজন্মের জ্ঞানান্বেষীদের মধ্যে কথোপকথনের সুযোগ তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান গ্রিক স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ কনস্টান্টিনোস এ ডক্সিয়াডিস টিএসসি কমপ্লেক্সের নকশা প্রণয়ন করেন। এর প্রাঙ্গণ, ছায়াবেষ্টিত চলাচলের পথ, উন্মুক্ত স্থান, সভাকক্ষ ও স্থানীয় জলবায়ুর উপযোগী স্থাপত্যবিন্যাস সামাজিক মিলনের দর্শনকে দৃশ্যমান রূপ দেয়। এখানে স্থাপত্য নিছক বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না; মানুষের চলাচল, কথোপকথন ও সম্মিলিত কার্যক্রমকে উৎসাহিত করাও ছিল এর একটি মৌলিক উদ্দেশ্য।

টিএসসি মিলনায়তন ও সামনের মাঠ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
টিএসসি মিলনায়তন ও সামনের মাঠ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

বর্তমানের জীবন্ত টিএসসি

টিএসসি এখনো তার প্রতিষ্ঠাকালীন অনেক দায়িত্ব পালন করছে। এর মিলনায়তন ও অন্যান্য স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, বিভাগীয় আয়োজন, নবীনবরণ, বিদায় অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, স্মরণসভা ও বিভিন্ন জাতীয় দিবসের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সংগীত, নাটক, নৃত্য, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, সাহিত্য ও বিতর্ক এখনো এর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাম্প্রতিক নথি প্রমাণ করে, এগুলো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ট্যুরিস্ট সোসাইটি টিএসসিতে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ ট্যুরিজম কার্নিভাল আয়োজন করে। প্রদর্শনী, সেমিনার, আলোচনা, কুইজ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ছিল এর অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগকে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, পরিবেশসচেতনতা এবং টেকসই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি বাস্তব উদাহরণ ছিল এ আয়োজন।

২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ টিএসসি মিলনায়তনে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী আয়োজন করে। সংগীত, নৃত্য, নাটক, বক্তব্য এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও সহশিক্ষামূলক অর্জনের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে সেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এক হয়েছিলেন। একাডেমিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রকাশ ও বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যকার সম্পর্ককে একসঙ্গে ধারণ করায় এই ধরনের আয়োজন টিএসসির মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা হিসেবেও টিএসসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, বিতর্ক, চলচ্চিত্র, পর্যটন, সাংবাদিকতা, আলোকচিত্র, দাবা, রোভার স্কাউট, স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম টিএসসির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এসব সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, যোগাযোগ, অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা, সৃজনশীল নির্মাণ, দলগত কাজ ও জনসেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। একটি বিতর্ক ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালনা করা, চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করা, সাময়িকী প্রকাশ করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা করা অথবা দুর্যোগের সময় সাহায্য সংগ্রহ করা— এমন সব শিক্ষা দেয়, যার পূর্ণ মূল্যায়ন কোনো লিখিত পরীক্ষায় সম্ভব নয়।

একটি অনানুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়

টিএসসির দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে সংঘটিত হয়। শিক্ষার্থীরা এর ক্যাফেটেরিয়া, করিডর, প্রাঙ্গণ ও আশপাশের উন্মুক্ত স্থানে মিলিত হয়। তারা খাবার খায়, বিশ্রাম নেয়, বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, বই, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে, নতুন কর্মসূচি পরিকল্পনা করে এবং কখনো কখনো শুধু দুটি ক্লাসের মধ্যবর্তী সময় কাটায়।

এই পরিচিত আড্ডার সংস্কৃতিকে অনেক সময় অনুৎপাদনশীল বলে উপেক্ষা করা হয়। এমন মূল্যায়ন অতিমাত্রায় সরলীকৃত। অনানুষ্ঠানিক কথোপকথন সব সময়ই বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অংশ। কোনো ধারণা সেমিনার প্রবন্ধ, নীতিপ্রস্তাব, নাট্যপ্রযোজনা বা সামাজিক উদ্যোগে রূপ নেওয়ার আগে প্রায়ই এমন অবিন্যস্ত আলাপ থেকেই জন্ম নেয়। আপাতদৃষ্টিতে উদ্দেশ্যহীন মনে হওয়া বহু কথোপকথন থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠন, বন্ধুত্ব, প্রকাশনা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সূচনা হয়েছে।

তবে অনানুষ্ঠানিক সমাবেশ একাই একটি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পূরণ করতে পারে না। বিশ্রাম টিএসসির একটি ঘোষিত উদ্দেশ্য হলেও তার সঙ্গে নির্দেশনা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক বিকাশকে যুক্ত করা হয়েছিল। বিশ্রাম যদি শেখার প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অথবা সামাজিকতা যদি সৃজনশীলতা ও সেবা থেকে পৃথক হয়ে পড়ে, তাহলে কেন্দ্রটি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বাহ্যিক চেহারা বজায় রেখেও তার শিক্ষামূলক তাৎপর্যের একটি অংশ হারাতে পারে।

এখানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। টিএসসি শিক্ষার্থীদের স্থান হিসেবে অত্যন্ত দৃশ্যমান। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনে যে ধরনের নিয়মিত ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান বলে প্রতীয়মান হয়। শিক্ষকরা অবশ্য বিভাগীয় অনুষ্ঠান, সেমিনার, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র নামটির মধ্যে যে নিয়মিত পরামর্শ, অনানুষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্গ এবং প্রজন্মগত সংলাপের অঙ্গীকার নিহিত রয়েছে, তা আরও কার্যকরভাবে বিকশিত হতে পারে।

তবে একে পরিসংখ্যানগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কতবার টিএসসি ব্যবহার করেন, তাদের কতটি যোগাযোগ একাডেমিক, সাংস্কৃতিক বা বিনোদনমূলক এবং অংশগ্রহণকারীরা এসব কার্যক্রমের মান কীভাবে মূল্যায়ন করেন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত পরিমাপযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে না। সুতরাং বিষয়টি একটি যৌক্তিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।

টিএসসিতে চলছে ত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত
টিএসসিতে চলছে ত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত

সংস্কৃতি, সেবা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব

টিএসসির মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক ভূমিকা তার মূল উদ্দেশ্যের অন্যতম শক্তিশালী প্রকাশ। শিক্ষার্থীদের পরিচালিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংগঠন বাঁধনের কার্যক্রম এই কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন রক্তদান, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা, জরুরি সহায়তা এবং দুর্যোগে ত্রাণ সংগ্রহের জন্যও টিএসসি ও এর আশপাশের স্থান ব্যবহার করে।

২০২৪ সালের আগস্টের বন্যার সময় শিক্ষার্থীরা টিএসসিকে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। অনুদানের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে মূল সংগ্রহ কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। তবে টিএসসিতে নগদ অর্থ ও জরুরি ওষুধ সংগ্রহ অব্যাহত ছিল।

এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পরিচালিত দাতব্য কার্যক্রম ছিল না। এটি ছিল সক্রিয় নাগরিক শিক্ষার একটি উদাহরণ। শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষ সেবার মধ্য দিয়ে সংগঠন, জবাবদিহি, সহানুভূতি ও জনদায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেছে। এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিষ্ঠাকালীন সেই প্রত্যাশাকেই পূরণ করে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের মানুষের প্রতিও নিজেদের দায়িত্ব উপলব্ধি করবে।

টিএসসি এলাকার রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিচয়

সমকালীন টিএসসির রাজনৈতিক ও নাগরিক গুরুত্ব উপেক্ষা করে এর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য এবং এর সংলগ্ন সড়ক ও উন্মুক্ত স্থান প্রতিবাদ, মানববন্ধন, মশাল মিছিল, শোকসভা, স্মরণ অনুষ্ঠান, জনদাবির প্রকাশ এবং জাতীয় সংহতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

তবে বিষয়টি নির্ভুলভাবে বর্ণনা করা প্রয়োজন। প্রশাসনিকভাবে পরিচালিত টিএসসি কমপ্লেক্স এবং বৃহত্তর টিএসসি এলাকা এক নয়। রাজু ভাস্কর্যে কোনো সমাবেশ টিএসসির পাশে সংঘটিত হতে পারে, কিন্তু সেটি টিএসসির সভাকক্ষ বা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে— এমন নয়। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক বা নাগরিক সংগঠন টিএসসি এলাকা ব্যবহার করলেই ধরে নেওয়া যায় না যে কর্মসূচিটি বিশ্ববিদ্যালয় বা টিএসসি প্রশাসনের অনুমোদিত কিংবা সমর্থিত।

ইতিহাসের পুনর্লিখন করে টিএসসি মূলত রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলাও যথার্থ নয়। প্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এমন দাবিকে সমর্থন করে না। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, বিনোদনমূলক ও ব্যক্তিত্ব বিকাশকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক গুরুত্ব পরে বিকশিত হয়েছে। কারণ যে স্থান সমাবেশ, সংলাপ ও শিক্ষার্থীদের স্বপরিচালিত কার্যক্রমের সুযোগ দেয়, সেটি স্বাভাবিকভাবেই একসময় সম্মিলিত জনমত প্রকাশের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক সচেতনতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে স্বভাবগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিশ্লেষণ, ধারণার সমালোচনা এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন যুক্তিনির্ভর আলোচনা বলপ্রয়োগে পরিণত হয়, কোনো সংগঠন সাধারণ পরিসরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, মতপার্থক্য ভয়ভীতিতে রূপ নেয় অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একটি সুস্থ টিএসসি রাজনৈতিক সচেতনতা রক্ষা করবে, কিন্তু কোনো দলীয় কর্তৃত্বের অধীন হবে না। এটি বিতর্ককে স্বাগত জানাবে, কিন্তু আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করবে না। এখানে ভিন্নমতের স্বাধীনতা থাকবে এবং একই সঙ্গে যারা সেই ভিন্নমতেরও বিরোধিতা করেন, তাদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।

বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু টিএসসি। ছবি: সংগৃহীত
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু টিএসসি। ছবি: সংগৃহীত

জনপরিসর, বিশ্ববিদ্যালয় পরিসর ও সীমারেখার প্রশ্ন

টিএসসি প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় জনপরিসরের মধ্যবর্তী একটি বিশেষ অবস্থানে রয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ও একাডেমিক সংস্কৃতির অংশ হলেও এর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সাবেক শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, শিল্পী, কর্মী ও সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। এই উন্মুক্ততা টিএসসিকে জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ করেছে। একই সঙ্গে এটি ভিড়, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা ব্যবহারের উপযুক্ত সীমা নিয়ে বিভিন্ন চাপ তৈরি করেছে।

খাদ্যসেবা, ব্যাংকিং, প্রকাশনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা ক্যাম্পাসজীবনকে সহায়তা করে। এগুলো বৈধ সম্পূরক কার্যক্রম। কিন্তু একটি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রকে প্রধানত খাবার, বাণিজ্য অথবা উদ্দেশ্যহীন জনসমাগমের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়। সব সহায়ক সুবিধার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণ করা।

এ পরিস্থিতিতে সমাধান টিএসসিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া নয়। এমন বিচ্ছিন্নতা এর ইতিহাস ও জনমূল্যকে ক্ষুণ্ন করবে। প্রয়োজন এমন একটি নীতিনির্ভর সীমারেখা, যার মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে সমৃদ্ধ করবে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অধিকার ও শিক্ষামূলক পরিচয়কে আচ্ছন্ন করবে না।

এখনো যা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়

টিএসসি সম্পর্কে জনআলোচনার একটি বড় অংশ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ধারণার ওপর নির্ভরশীল। কেউ মনে করেন, এটি প্রধানত রাজনৈতিক কার্যক্রমের স্থানে পরিণত হয়েছে। কারও কাছে এটি খাবার ও আড্ডার কেন্দ্র। আবার কেউ একে এখনো ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক হৃদয় বলে বিবেচনা করেন।

প্রতিটি বর্ণনার মধ্যে বাস্তবতার একটি অংশ রয়েছে। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক তথ্য ছাড়া কোনো একটিকে সম্পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির কার্যক্রম নিয়ে এমন কোনো সাম্প্রতিক সমন্বিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে প্রতীয়মান হয় না, যেখানে অনুষ্ঠানের সংখ্যা ও প্রকৃতি, কক্ষ বরাদ্দ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, আয় ও ব্যয়, ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টি, সংগঠনগুলোর কার্যসম্পাদন এবং শিক্ষার্থীদের বিকাশে অর্জিত ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকবে।

নির্ভরযোগ্য তথ্যের এই ঘাটতি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের স্থান দখল করতে পারে স্মৃতিকাতরতা, সমালোচনা অথবা রাজনৈতিক অবস্থান। দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব বিকাশের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি কেন্দ্রের নিজস্ব পরিচালনাতেও স্বচ্ছতা ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন।

একটি বার্ষিক প্রকাশ্য প্রতিবেদনে সাংস্কৃতিক আয়োজন, সেমিনার, স্বেচ্ছাসেবা, শিক্ষার্থী সংগঠনের কার্যক্রম, স্থাপনার ব্যবহার, আয়, ব্যয়, অংশগ্রহণ ও অভিযোগের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। টিএসসি বিশ্রাম, নির্দেশনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল স্বপরিচালিত কার্যক্রমের লক্ষ্য কতটা অর্জন করছে, সেটিও মূল্যায়ন করা সম্ভব। এমন প্রতিবেদন টিএসসিকে শুধু পরিসংখ্যানের কাঠামোয় আবদ্ধ করবে না। বরং অনুমান, অপব্যবহার এবং উদ্দেশ্যচ্যুতি থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনকে সুরক্ষিত করবে।

টিএসসিসে দলবেঁধে খেলা দেখা। ছবি: সংগৃহীত
টিএসসিসে দলবেঁধে খেলা দেখা। ছবি: সংগৃহীত

স্মৃতি সংরক্ষণ করে নবায়ন

টিএসসিকে তার অতীতের জাদুঘরে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। একটি জীবন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রকে নতুন প্রজন্মের প্রয়োজনের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হয়। বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল সুবিধা, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো, উন্নত নিরাপত্তা, দক্ষ অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সৃজনশীল সুযোগ এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রয়োজন। সুতরাং আধুনিকায়ন অপরিহার্য।

কিন্তু আধুনিকায়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনকে শক্তিশালী করা, শুধু স্থাপনার বাহ্যিক পরিবর্তন নয়। একটি দৃষ্টিনন্দন ভবনও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে দূরত্ব অক্ষুণ্ন থাকে, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা না পায়, সাধারণ পরিসর কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় অথবা নির্দেশনা শুধু পুরোনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে।

অর্থবহ নবায়নে স্থাপত্যের ঐতিহ্য সংরক্ষণের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জাগরণের সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের স্বপরিচালিত কার্যক্রম সম্প্রসারণ, নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংলাপ পুনর্প্রতিষ্ঠা, পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা কর্মসূচি চালু, স্থাপনা ব্যবহারে ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার এবং পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এর অংশ হতে পারে।

একটি চলমান জাতীয় দায়িত্ব

টিএসসি শুধু একটি ভবন নয়। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজের সঙ্গে মিলিত হয় এবং বহু উপলক্ষ্যে সমগ্র দেশ তার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলিত হয়। এর ইতিহাসে সংগীত ও শোক, বিতর্ক ও প্রতিবাদ, বন্ধুত্ব ও মতপার্থক্য, উৎসব ও জনসেবা পাশাপাশি অবস্থান করছে। এই জটিলতাকে অতিরঞ্জিত রোমান্টিকতায় আবৃত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একক কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করাও সঠিক নয়।

একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নে বলা যায়, টিএসসি তার প্রতিষ্ঠাকালীন দায়িত্ব পরিত্যাগ করেনি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থী সংগঠন, বিভাগীয় আয়োজন, স্বেচ্ছাসেবা এবং সামাজিক জীবন এখনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে সম্পূরক করছে। তবে নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ এবং কাঠামোবদ্ধ নির্দেশনার যে প্রতিশ্রুতি এর নাম ও প্রতিষ্ঠাদর্শনের মধ্যে নিহিত, সে বিষয়ে অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ প্রয়োজন।

নাগরিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে টিএসসির ভূমিকা সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে একে বলপ্রয়োগ, একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও অসহিষ্ণু দলীয় প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এর জনসম্পৃক্ততা শক্তি হিসেবে বজায় থাকবে, তবে সেটি যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষামূলক পরিচয়কে দুর্বল না করে।

মূল প্রশ্ন তাই এই নয় যে টিএসসি সংস্কৃতি-রাজনীতি-বিনোদন অথবা জনসেবার স্থান কি না। সময়ের ধারায় এটি চারটিরই মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে টিএসসি। তাই প্রকৃত প্রশ্ন হলো— এসব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক মূল্যবোধ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না। সেই মূল্যবোধ হলো জ্ঞান, মর্যাদা, উন্মুক্ততা, দায়িত্ব, ন্যায়সংগত আচরণ এবং মতপার্থক্যের প্রতি সম্মান।

টিএসসি এমন একটি উপলব্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরও শিক্ষা চলতে থাকে। এই উপলব্ধিই আজও এর সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা। প্রজ্ঞা ও দায়িত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ করা গেলে টিএসসি আগামী প্রজন্মকেও শেখাতে পারবে যে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ অন্যের সঙ্গে বসবাস করতে, স্বাধীনতাকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে এবং অর্জিত শিক্ষাকে সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত করতে শেখে।

লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement