মানুষ কি পৃথিবীর জন্য অপরিহার্য?

এম ডি মাসুদ খান
মানুষ কি পৃথিবীর জন্য অপরিহার্য?

পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গল্পটি মানুষই লিখেছে— আর সেই গল্পে মানুষ নিজেকেই রেখেছে কেন্দ্রবিন্দুতে। নিজেকে সে বলেছে বুদ্ধিমান প্রাণী ও সভ্যতার নির্মাতা। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সে নগর বানিয়েছে, রাষ্ট্র গড়েছে, সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে, আকাশ জয় করেছে; এমনকি মহাকাশের অসীমতাকেও মাপার দুঃসাহস দেখিয়েছে।

বিজ্ঞান তাকে দিয়েছে অদ্ভুত ক্ষমতা। প্রযুক্তি দিয়েছে গতি। অর্থ দিয়েছে সাম্রাজ্য। আর ক্ষমতা তাকে এমন এক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, যেন পৃথিবীটি মানুষের জন্যই তৈরি।

কিন্তু মানুষকে যদি একবার মানুষের চোখ দিয়ে না দেখে, বরং পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের চোখ দিয়ে দেখা যায়?

যে পৃথিবীকে মানুষ নিজের সম্পত্তি মনে করে, সেই পৃথিবীর অন্য বাসিন্দারা মানুষকে কীভাবে দেখে?

যে প্রাণী নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে দাবি করে, তার কর্মকাণ্ড অন্য প্রাণীদের কাছে কতটা বুদ্ধিমানের বলে মনে হয়?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মানুষ সত্যিই কি পৃথিবীর জন্য অপরিহার্য?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই একদিন বসেছিল জঙ্গলের প্রাণীদের এক অদ্ভুত সভা।

তবে সেই সভায় মানুষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল না কোনো আদালত, বিচারক কিংবা শাস্তির ঘোষণা। ছিল শুধু একটি আয়না। সেই আয়নায় মানুষকে দেখা হচ্ছিল মানুষের চোখ দিয়ে নয়, প্রকৃতির চোখ দিয়ে।

জঙ্গলের প্রাণীরা মানুষের গল্প খুব একটা বলে না। কারণ তাদের পৃথিবীতে মানুষ অপরিহার্য নয়। তবু মানুষকে তারা চেনে, তার রাস্তা দিয়ে, তার ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক দিয়ে, তার বানানো খাঁচা দিয়ে, তার পাতা ফাঁদ দিয়ে, তার ধোঁয়া দিয়ে, তার কাটা বনের গুঁড়ি দিয়ে, তার দখল করা নদীর তীর দিয়ে, তার ভাঙা পাহাড় দিয়ে, তার বিষাক্ত করা জল দিয়ে, তার ফেলে যাওয়া আবর্জনার স্তূপ দিয়ে, তার গাড়ির শব্দে পালিয়ে যাওয়া পাখিদের ডানা দিয়ে, তার শিকারির গুলির শব্দ দিয়ে, তার বন্দুকের ধোঁয়া দিয়ে।

তারা মানুষকে চেনে তার বানানো সীমানা দিয়েও, যেখানে এক টুকরো মাটির জন্য মানুষ আরেক মানুষকে শত্রু বানায়। চেনে তার যুদ্ধ দিয়ে, বিস্ফোরণের শব্দ দিয়ে, রক্তাক্ত মাটি দিয়ে, পোড়া ঘরবাড়ি দিয়ে, শরণার্থীর দীর্ঘ সারি দিয়ে। চেনে তার লোভ দিয়ে, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দখল করাই সাফল্য, অন্যের ক্ষতি করে নিজের সম্পদ বাড়ানোই বুদ্ধিমত্তা, আর ক্ষমতা অর্জন করাই যেন জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

চেনে তার সভ্যতার চিহ্ন দিয়েও, উঁচু অট্টালিকা, বিশাল সেতু, দ্রুতগতির গাড়ি, কৃত্রিম আলো, প্রযুক্তির বিস্ময়। আবার সেই একই সভ্যতার ছায়ায় ক্ষুধার্ত মানুষ, গৃহহীন মানুষ, দূষিত নদী, উজাড় বন আর নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদেরও দেখে। তারা মানুষকে চেনে তার কথার সঙ্গে কাজের ব্যবধান দিয়ে।

মানুষ শান্তির কথা বলে, তারপর যুদ্ধের অস্ত্র বানায়।

মানুষ প্রকৃতিকে ভালোবাসার কথা বলে, তারপর বন কেটে ফেলে।

মানুষ প্রাণীদের ভালোবাসার ছবি প্রকাশ করে, তারপর তাদের আবাস দখল করে। মানুষ মানবতার কথা বলে, তারপর মানুষের রক্তে নিজের হাত রাঙায়। মানুষ পৃথিবীকে বাঁচানোর সম্মেলন করে, আর সম্মেলনে যাওয়ার পথেই কখনো কখনো আরও একটি বন কেটে ফেলে।

প্রাণীরা তাই মানুষকে শুধু তার মুখ দিয়ে চেনে না। তারা মানুষকে চেনে তার রেখে যাওয়া চিহ্ন দিয়ে।

শিয়াল প্রথমে বলল, “মানুষ নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী!”

কাক হেসে বলল, “বুদ্ধিমান তো বটেই। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, যে প্রাণী নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না, সে আমাদের বুদ্ধি শেখাতে আসে!”

পিঁপড়া বলল, “ওরা নাকি খুব সংগঠিত। অথচ আমাদের সারি দেখলেই পা দিয়ে ভেঙে দেয়। তারপর আবার সভা করে শৃঙ্খলা শেখায়!”

মৌমাছি গুনগুন করে বলল, “ওরা মধু খায়, কিন্তু ফুল বাঁচানোর কথা ভুলে যায়। আমাদের কাছ থেকে মধু নেয়, অথচ আমাদের ঘর ভেঙে ফেলে।”

মাকড়সা বলল, “আমি জাল বুনি বাঁচার জন্য। মানুষ জাল বোনে অন্য মানুষকে ধরার জন্য।”

তেলাপোকা মুচকি হেসে বলল, “মানুষ আমাকে নোংরা বলে। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আবর্জনা তৈরি করে কে?”

ইঁদুর বলল, “মানুষ আমাকে চোর বলে। অথচ পৃথিবীর সম্পদ সবচেয়ে বেশি কে জমিয়ে রাখে?”

কুকুর এতক্ষণ চুপ ছিল। সে ধীরে বলল, “মানুষ অদ্ভুত প্রাণী। সে আমাকে ভালোবাসে, খাবার দেয়, মাথায় হাত রাখে। আবার প্রয়োজন হলে আমাকে শিকলেও বাঁধে। তার ভালোবাসার সঙ্গেও কখনো কখনো মালিকানার গন্ধ থাকে।”

বিড়াল চোখ আধবোজা করে বলল, “মানুষ আমাকে পোষে, ছবি তোলে, আদর করে। কিন্তু আমি যখন স্বাধীনভাবে হাঁটি, তখন সে ভাবে আমি অবাধ্য। মানুষ স্বাধীনতা পছন্দ করে, শুধু নিজের জন্য।”

হাতি গম্ভীর স্বরে বলল, “মানুষ আমাকে বিশাল বলে ভয় পায়। অথচ তার নিজের লোভের চেয়ে বড় কোনো প্রাণী আমি দেখিনি।”

ঘোড়া বলল, “মানুষ আমাকে শক্তিশালী বলে। তারপর আমার শক্তিকে নিজের বোঝা টানার কাজে ব্যবহার করে।”

গরু বলল, “মানুষ আমাকে মা বলে ডাকে। তারপর আমার দুধ নেয়। ভালোবাসার ভাষা তার বেশ বিচিত্র!”

ছাগল চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে শুধু বলল, “মানুষের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষেরই অনুমতি লাগে। আমাদের পৃথিবীতে এমন কোনো আইন নেই।”

হরিণ চারদিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় বাঘ নয়, মানুষ।”

বাঘ গর্জে উঠল, “সত্যি। আমি ক্ষুধার্ত হলে শিকার করি। মানুষ ক্ষুধার্ত না থাকলেও শিকার করে।”

সাপ ফোঁস করে বলল, “মানুষ আমাকে বিষাক্ত বলে। অথচ তার কথার বিষ অনেক সময় আমার বিষের চেয়েও তীব্র।”

কাক বলল, “মানুষ আমাকে অশুভ বলে। অথচ মৃতদেহ পরিষ্কার করে প্রকৃতিকে সাহায্য করি আমি।”

শকুন মাথা নেড়ে বলল, “আমাকেও মানুষ অপছন্দ করে। অথচ প্রকৃতির মৃতদেহ পরিষ্কার রাখার কাজে আমার প্রয়োজন আছে।”

ব্যাঙ জলাশয় থেকে বলল, “মানুষ আমাকে তুচ্ছ ভাবে। কিন্তু জল, মাটি আর পরিবেশের পরিবর্তন আগে টের পাই আমরা।”

মশা তখন হেসে উঠল।

“মানুষ যত বড়ই হোক, রাতে আমার কাছে সবাই সমান।”

সবাই হেসে উঠল।

ঠিক তখন মাটির নিচ থেকে কেঁচো মাথা তুলে বলল, “মানুষ আমাকে তুচ্ছ মনে করে। অথচ যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সে নিজের সাম্রাজ্য বানায়, সেই মাটিকে উর্বর রাখতে আমি সারাজীবন কাজ করি। আমি মাটির ভেতর দিয়ে পথ বানাই, মাটি শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায়। মানুষ মাটির বুক চিরে ভবন বানায়, তারপর একদিন সেই মাটিকেই অনুর্বর বলে।”

জলাশয় থেকে একটি মাছ মাথা তুলে বলল, “মানুষ আমাদের দেখে শুধু খাবার ভাবে। যে নদী আমাদের ঘর, সেখানে সে বিষ ঢালে, প্লাস্টিক ফেলে, বর্জ্য ফেলে। তারপর নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন নদী বাঁচানোর কথা বলে। মানুষ বড় অদ্ভুত, ঘর ভেঙে দিয়ে আবার ঘর বাঁচানোর সভা করে।”

ফুলের ওপর বসে থাকা প্রজাপতি ডানা মেলে বলল, “মানুষ সৌন্দর্য ভালোবাসে বলে দাবি করে। অথচ ফুলের বাগান বানানোর জন্যই কত বন কেটে ফেলে! কী অদ্ভুত, সৌন্দর্যকে ভালোবাসতে গিয়ে সৌন্দর্যের জন্মভূমিই নষ্ট করে।”

চড়ুই কাছের ডালে বসে বলল, “একসময় মানুষের ঘরের কার্নিশে, চালের নিচে, জানালার পাশে আমাদের বাসা ছিল। এখন তার ঘর এত মসৃণ, এত বন্ধ যে, আমাদের জন্য সেখানে কোনো জায়গা নেই। মানুষ উন্নতি করেছে, শুধু তার উন্নতিতে আমাদের জায়গাটা ছোট হয়ে গেছে।”

কচ্ছপ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলল, “আমি ধীরে চলি বলে মানুষ আমাকে ধীর ভাবে। কিন্তু মানুষ এত দ্রুত ছুটছে কোথায়? নদী পেরিয়ে, পাহাড় পেরিয়ে, আকাশ পেরিয়ে, শেষ পর্যন্ত তো তাকে সেই মাটির কাছেই ফিরতে হবে, যেখান থেকে তার শুরু।”

বাদুড় অন্ধকার গুহা থেকে বলল, “মানুষ আমাকে ভয় পায়। অথচ অন্ধকারে পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য আমাদের নিজস্ব জ্ঞান আছে। মানুষ আলো জ্বালিয়ে পৃথিবীকে জয় করেছে বলে ভাবে, কিন্তু নিজের ভেতরের অন্ধকারটা আজও দূর করতে পারেনি।”

ময়ূর পেখম মেলে বলল, “মানুষ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়, ছবি তোলে, প্রশংসা করে। কিন্তু সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে চায় না। সে ফুল চায়, বন চায়, পাখির গান চায়, কিন্তু সেই ফুল, বন আর পাখির জন্য জায়গা রাখতে চায় না।”

ঘাসফড়িং লাফ দিয়ে বলল, “মানুষ ভাবে পৃথিবী তার খাদ্যের ক্ষেত। কিন্তু সে কখনো ভাবে না, এই মাঠে আমাদেরও জীবন আছে। তার একবারের বিষ ছিটানোতে আমাদের কত প্রজন্ম হারিয়ে যায়!”

জোনাকি অন্ধকারে আলো জ্বেলে বলল, “মানুষ রাতকে আলোয় ভরে দিয়েছে। অথচ কখনো কি ভেবেছে, অন্ধকারও কারও বাসস্থান? তার আলো আমাদের ছোট্ট আলোকে মুছে দেয়।”

শামুক ধীরে ধীরে বলল, “মানুষ আমাকে ধীর বলে হাসে। অথচ তার নিজের জীবনও তো ক্ষণিকের। এত তাড়াহুড়ো করে সে কী অর্জন করছে, যার জন্য পৃথিবীর শান্তিটুকুও নষ্ট করতে হয়?”

আবার কেঁচো মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত এটাই, সে ভাবে পৃথিবী তার সম্পত্তি। অথচ সে জানে না, তার দেহটিও একদিন এই মাটিরই সম্পত্তি হয়ে যাবে।”

মাছ জলের নিচ থেকে শেষবারের মতো বলল, “মানুষ নদীকে বন্দী করে, সমুদ্রকে দূষিত করে, তারপর ভাবে সে প্রকৃতিকে জয় করেছে। অথচ পানি একদিন তার ঘরে ঢুকলেই সে বুঝতে পারে, প্রকৃতি কাউকে মালিক মানে না।”

পেঁচা চারদিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “তোমরা কি লক্ষ্য করেছ? পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাণীরই কোনো না কোনো প্রয়োজন আছে।”

পিঁপড়া মাটি নড়ায়। মৌমাছি পরাগায়ন করে। কেঁচো মাটিকে উর্বর করে। পাখি বীজ ছড়ায়। প্রজাপতি পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। শকুন মৃতদেহ পরিষ্কার করে। মশা খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। ব্যাঙ পরিবেশের ভারসাম্যের সংকেত দেয়। বাঘ শিকারীর ভারসাম্য রক্ষা করে। মাছ জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। গাছের সঙ্গে থাকা ক্ষুদ্র জীবাণুও প্রকৃতির কোনো না কোনো কাজে যুক্ত।

শিয়াল ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে মানুষ কী করে?”

সবাই চুপ। কেউ উত্তর দিল না।

মানুষ নদী দখল করে। বন কেটে ফেলে। পাহাড় ভাঙে। সমুদ্র দূষিত করে। বাতাস বিষাক্ত করে। প্রাণীদের আবাস ধ্বংস করে। মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে। ক্ষমতার জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করে। ধর্ম, জাতি, ভূখণ্ড, মতাদর্শ আর সম্পদের নামে রক্ত ঝরায়।

অসহায়ের জমি দখল করে।

দুর্বলের শ্রম শোষণ করে।

অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের সাফল্যের গল্প লেখে।

মানুষ প্রতারণা করে, তারপর তাকে বুদ্ধিমত্তা বলে। অন্যকে ঠকায়, তারপর তাকে ব্যবসায়িক কৌশল বলে।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তারপর তাকে নেতৃত্ব বলে। মানুষ যুদ্ধের অস্ত্র বানায়, তারপর শান্তির সম্মেলন করে। বন কেটে ফেলে, তারপর বৃক্ষরোপণ দিবসে ছবি তোলে। নদী দূষিত করে, তারপর নদী বাঁচানোর সেমিনার করে। মানুষের রক্তে হাত রাঙায়, তারপর মানবতার বক্তৃতা দেয়।

কাক বলল, “অদ্ভুত!”

মৌমাছি বলল, “নিজের বানানো সমস্যার সমাধান করতে আবার নিজেরাই সভা করে।”

পিঁপড়া বলল, “আমরা খাবার জমাই ভবিষ্যতের জন্য। মানুষ জমায় সম্পদ, অন্যের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়ে।”

কুকুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মানুষ পৃথিবীকে নিজের সম্পত্তি ভাবে।”

শিয়াল মৃদু হেসে বলল, “কিন্তু পৃথিবী তো তাকে নিজের প্রয়োজনীয় প্রাণী মনে করে না।”

আবার নীরবতা।

দূরে পাখি ডাকল। পিঁপড়ারা কাজে ফিরে গেল। মৌমাছি ফুলের দিকে উড়ে গেল। হরিণ ঘাস খেতে লাগল। মাছ নদীর গভীরে চলে গেল। কেঁচো মাটির নিচে ঢুকে গেল। প্রজাপতি ফুল বদলাল। জোনাকি অন্ধকারে আলো জ্বালল। বাঘ জঙ্গলের গভীরে মিলিয়ে গেল। কুকুর পাহারায় বসে রইল। বিড়াল রোদে গা এলিয়ে দিল। শিয়াল নিজের পথে চলে গেল।

প্রকৃতি তার নিজের কাজে ফিরে গেল।

আর মানুষ?

মানুষ তার নিজের বানানো পৃথিবীতে ব্যস্ত রইল, নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে, নিজের তৈরি বিষে বাঁচতে, নিজের তৈরি দেয়াল তুলতে, নিজের তৈরি সমস্যার সমাধান খুঁজতে।

প্রকৃতি কিন্তু মানুষের অপেক্ষায় রইল না। মানুষ না থাকলেও সূর্য উঠবে, বৃষ্টি নামবে, নদী বয়ে যাবে, ঘাস জন্মাবে, ফুল ফুটবে, পাখি ডাকবে, পিঁপড়া সারি বেঁধে চলবে। হয়তো এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে নির্মম ব্যঙ্গ।

মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ভাবে, অথচ পৃথিবীর প্রয়োজনের তালিকায় সে হয়তো সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রাণী।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে মানুষের সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রকৃতির কাছে শ্রেষ্ঠত্বের সংজ্ঞা ভিন্ন হতে পারে। যে বেশি নেয়, সে শ্রেষ্ঠ নয়। যে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে অন্যের অস্তিত্বের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, প্রকৃতির বিচারে হয়তো সেই-ই সফল। একটি গাছ মাটির কাছ থেকে নেয়, কিন্তু ছায়া দেয়। মৌমাছি ফুল থেকে নেয়, কিন্তু পরাগায়নের মাধ্যমে ফুলের বংশবিস্তারে সাহায্য করে।

পাখি ফল খায়, কিন্তু দূর-দূরান্তে বীজ ছড়িয়ে দেয়। কেঁচো মাটির ভেতর বাস করে, কিন্তু মাটিকে উর্বর করে।

শকুন মৃতদেহ খায়, কিন্তু প্রকৃতিকে পচন ও দূষণ থেকে রক্ষা করে। প্রজাপতি ফুল থেকে নেয়, কিন্তু ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে। মাছ নদী থেকে বাঁচে, আবার নদীর খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হয়ে নদীর জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখে।

মানুষও নেয়। কিন্তু তার নেওয়ার সীমা কোথায়?

সে মাটি নেয়, নদী নেয়, বন নেয়, পাহাড় নেয়, সমুদ্র নেয়, বাতাস নেয়, এমনকি অন্য প্রাণীর বাসস্থানও নেয়। তারপর একদিন যখন প্রকৃতি প্রতিদান চায়, মানুষ তাকে দুর্যোগ বলে।

সমস্যাটি তাই মানুষের অস্তিত্বে নয়। সমস্যাটি মানুষের সেই অহংকারে, যেখানে সে নিজেকে প্রকৃতির অংশ না ভেবে প্রকৃতির মালিক মনে করে।

হয়তো মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু বুদ্ধিমত্তা যদি নিজের বাসস্থান ধ্বংস করার ক্ষমতার নাম হয়, তবে সেই বুদ্ধিমত্তা প্রকৃতির কাছে এক ভয়ংকর ব্যর্থতা।

শেষ পর্যন্ত পৃথিবী মানুষের নয়। মানুষই পৃথিবীর। আর এই সত্যটি মানুষ যত দেরিতে বুঝবে, তার মূল্য তত বেশি হবে। কারণ পৃথিবীকে মানুষের প্রয়োজন নেই, মানুষেরই পৃথিবীকে প্রয়োজন। আর যদি কোনোদিন মানুষ সত্যিই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, পৃথিবী থেমে যাবে না।

সূর্য উঠবে। বৃষ্টি নামবে। নদী বয়ে যাবে।

বনে নতুন চারা জন্মাবে। পাখিরা গান গাইবে। পিঁপড়ারা সারি বেঁধে চলবে।মাছেরা নদীতে সাঁতার কাটবে।প্রজাপতিরা ফুলে ফুলে ঘুরবে। কেঁচো মাটিকে উর্বর করবে।

জোনাকিরা অন্ধকারে আলো জ্বালবে।

শুধু পৃথিবীর বুক থেকে একদিন মুছে যাবে সেই প্রাণীটির পদচিহ্ন, যে নিজেকে পৃথিবীর মালিক ভাবত। তখন প্রকৃতি হয়তো কোনো শোকসভা করবে না। কোনো স্মৃতিস্তম্ভও বানাবে না। বরং ধীরে ধীরে তার ক্ষতগুলো শুকিয়ে যাবে।

আর বহুদিন পর, কোনো এক অরণ্যের নীরব দুপুরে শিয়াল হয়তো চারদিকে তাকিয়ে বলবে, “মানুষ কোথায় গেল?”

পেঁচা চোখ মেলে বলবে, “চলে গেছে।”

শিয়াল জিজ্ঞেস করবে, “তাহলে পৃথিবী?”

পেঁচা বলবে, “পৃথিবী আছে।”

একটু নীরবতার পর সে হয়তো যোগ করবে, “বরং এখন পৃথিবীটা একটু বেশি পৃথিবীর মতো।”

তবে সবকিছুর পরও মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত। মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলের সব কিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি ও মানুষের অনুগত করেছেন।

মানুষ একদিকে সৃষ্টির সেরা জীব। আবার কবির ভাষায়— “আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।" বড় হতে হলে বা পূর্বনির্ধারিত অবস্থান ধরে রাখতে চাইলে সেই যোগ‍্যতা মানুষকে অর্জন করতে হবে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব— এ মর্যাদা যেমন সম্মানের, তেমনি দায়িত্বেরও।

লেখক: কলামিস্ট ও বনবিদ

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement