‘শিকার’ হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে, প্রথম দিনেই ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু: এসআরবি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মোহা. আসাদুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মোহা. আসাদুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীর হয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হন ৩০ বাংলাদেশি। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তাদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে নামার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান ১৭ জন বাংলাদেশি। সংস্থাটি বলছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতো। তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা যেত।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এসআরবি জানায়, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে তুলে দেওয়া হয় দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে। ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যাদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছে, আসলে তারা কেউ যুদ্ধের যোগ্য নয়। যুদ্ধের জন্য তাদের শারীরিক, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনো ধরনেরই অনুশীলন ছিল না। তাহলে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণে তাদের কেন পাঠানো হলো? আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য একধরনের শিকার হিসেবে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন ওই দেশটি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে।’

এসআরবির অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুদ্ধক্ষেত্রের সামনের, মাঝের ও পেছনের অংশে ভাগ করে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিন ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।

জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। তাদের একজন রাজন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি একটি ক্যাম্পে পৌঁছান।

বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।

মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকজনের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি ও কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে সংস্থাটি। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁরা জানতে পেরেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধে একইভাবে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও একাধিক জেলার মানুষ গেছেন। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুর।

এসআরবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেক পরিবার মরদেহ দেখতে বা দেশে ফিরিয়ে আনতে পারছে না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে সতর্ক থাকা এবং বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বানও জানান তিনি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement