ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে আছে ৮ সরকারি দপ্তর, সেবা পাচ্ছেন তো?

জাকির আহমদ খান কামাল
ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে আছে ৮ সরকারি দপ্তর, সেবা পাচ্ছেন তো?

গ্রামীণ জনপদের সরকার বলা হয় ইউনিয়ন পরিষদকে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতেই সরকার ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ ধারণায় সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করেছে। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনগুলো কেবল চেয়ারম্যান-মেম্বারের অফিস নয়, এটি একটি সমন্বিত সেবাকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল।

স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-২ শাখার ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখের স্মারক নং-৪৬.০১৮.০৩২.০০.০০.০৬৫.২০১৭-৩৩৭-এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬৩, তৃতীয় তফসিল ও অনুমোদিত প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিটি কমপ্লেক্সের মূল অংশে চেয়ারম্যান, সদস্য, সচিব ও সভাকক্ষ ছাড়াও সম্প্রসারিত অংশে ৮টি কক্ষ রাখা বাধ্যতামূলক।

কক্ষগুলো হলো— কৃষি সম্প্রসারণ, প্রাণিসম্পদ, আনসার ও ভিডিপি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল (ডিপিএইচই), বিআরডিবি, শিক্ষা, এলজিইডি এবং একটি পরিদর্শন কক্ষ। চিঠিতে কঠোরভাবে বলা হয়েছে, এই তালিকার বাইরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে কক্ষ বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই।

কাগজে নির্দেশনা পরিষ্কার হলেও মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেশের অধিকাংশ ইউনিয়নে সাধারণ মানুষ জানেই না যে পরিষদ ভবনে কৃষি বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বসার জন্য আলাদা কক্ষ আছে। সরেজমিনে দেখা যায়, এসব কক্ষের বেশিরভাগই তালাবদ্ধ পড়ে থাকে। কোথাও চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত গুদাম, কোথাও রাজনৈতিক কর্মীর বিশ্রামকক্ষ, আবার কোথাও ভাড়া দেওয়া হয়েছে অন্য প্রতিষ্ঠানকে, যা ২০২০ সালের ওই চিঠির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাঠকর্মীরা উপজেলা সদরে বসে দায়িত্ব পালন করেন, সপ্তাহে একদিনও ইউনিয়নে যান না।

এই অজ্ঞতার সুযোগে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একজন ক্ষুদ্র কৃষক জানেন না, তাঁর বীজ, সার বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ পাওয়ার অধিকার ইউনিয়নেই আছে। একজন খামারি গবাদিপশুর টিকার জন্য ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলায় ছুটছেন, অথচ তাঁর ইউনিয়ন ভবনেই প্রাণিসম্পদ কক্ষ থাকার কথা। শিক্ষা, স্যানিটেশন বা এলজিইডির সেবার জন্য মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের স্বপ্ন তাই তালাবদ্ধ কক্ষেই বন্দি।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি কমপ্লেক্সের সামনে দৃশ্যমান নাগরিক সেবা বোর্ড স্থাপন করতে হবে এবং কোন কক্ষে কোন দপ্তর রয়েছে, কর্মকর্তার নাম ও সেবা প্রাপ্তির সময় উল্লেখ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি সম্প্রসারিত দপ্তরের কর্মকর্তার সপ্তাহে অন্তত দুই দিন ইউনিয়নে অবস্থান বাধ্যতামূলক করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, জেলা প্রশাসকগণ যে নির্দেশনা পেয়েছেন, তার বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে তদারকি করতে হবে। মাইকিং, উঠান বৈঠক ও ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে জানাতে হবে— ইউনিয়ন পরিষদ শুধু সনদ বিতরণের জায়গা নয়, এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার সেবাকেন্দ্র। সেবার দরজা খুললেই প্রান্তিক মানুষের অধিকার ফিরবে।

লেখক: কলামিস্ট

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement