জ্বালানি সংকটে প্রাথমিক শিক্ষায় অনলাইন ক্লাসের ভাবনা কতটা যুক্তিযুক্ত?

জাকির আহমদ খান কামাল

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রভাব যেন ক্রমশ জীবনের প্রতিটি খাতে বিস্তৃত হচ্ছে। শিল্প, পরিবহন কিংবা কৃষির পাশাপাশি এবার এর প্রভাব এসে পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়— বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে অনলাইন ক্লাস চালুর ভাবনায়। প্রশ্ন উঠছে, জ্বালানি সংকট ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছালে সরকার এমন একটি সিদ্ধান্ত বিবেচনায় আনে?

প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। এই স্তরে শ্রেণিকক্ষে সরাসরি উপস্থিতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অনলাইন ক্লাস একটি সীমিত বিকল্প হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। অতীতে করোনা মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা এবং ডিভাইসের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষার বাইরে থেকে গেছে।

এখন যদি জ্বালানি সংকটের কারণে আবার অনলাইন ক্লাস চালুর চিন্তা করা হয়, তবে তা একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা থাকায় সংকট দেখা দিলে লোডশেডিং বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে অনলাইন শিক্ষার ওপরই— কারণ বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ছাড়া এই পদ্ধতি কার্যকর নয়। ফলে এটি এক ধরনের “দ্বিমুখী সমস্যা” তৈরি করে, যেখানে সমাধান নিজেই নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।

এ ছাড়া দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখনো প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। একটি পরিবারের একাধিক শিশুর জন্য আলাদা ডিভাইসের ব্যবস্থা করা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। ফলে অনলাইন ক্লাস চালু হলে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

তবে সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা জরুরি হয়ে উঠতে পারে, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাস চালু করা একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বাস্তব পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রাপ্যতা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সমাধানের পথ হতে পারে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। যেমন— স্কুলের সময়সূচি পরিবর্তন করে দিনের আলোতে ক্লাস নেওয়া, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কিংবা অঞ্চলভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, প্রাথমিক স্তরে অনলাইন ক্লাস চালুর চিন্তা একটি সতর্কবার্তা— জ্বালানি সংকট যে কেবল অর্থনীতির নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই হতে পারে এ সমস্যার টেকসই উত্তর।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

যুদ্ধ থামলেও তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর অর্থ আরও স্পষ্ট— যুদ্ধের সামরিক উত্তাপ কমলেও অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার জন্য এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

৮ দিন আগে

মেধা ও রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক

রাষ্ট্র পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদরা; তাদের সহায়তা করে প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস; আর নীতিগত সুবিধা অনেকাংশে পায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী কাঠামোর ভেতরে মেধাবী ছাত্রদের অবস্থান কোথায়— এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

৯ দিন আগে

সরকারি প্রাথমিকে অনলাইন ক্লাস চালু করা কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশের জনগণের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত। তাদের অধিকাংশই সাধারণ মোবাইল ব্যবহার করে। অপরদিকে ওয়াই-ফাই সকলের বাসা-বাড়িতে নেই। এ অবস্থায় নানা আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে সাধারণ মানুষের সন্তানদের অনলাইন ক্লাস করা বিঘ্নিত হবে।

১৩ দিন আগে

ইরান যুদ্ধ: জ্বালানি শক্তি পুনর্বিন্যাসের তীব্র লড়াই

জ্বালানি তেল সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে— একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

১৬ দিন আগে