ইতিহাসে বিভ্রান্তি নয়, প্রয়োজন সত্যের স্বীকৃতি

এম ডি মাসুদ খান

বাংলাদেশ আজও একটি সংবেদনশীল ও বহু আলোচিত প্রশ্নকে ঘিরে বারবার আলোচনায় ফিরে আসে— স্বাধীনতার ঘোষক কে? এই প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি এমনভাবে উপস্থাপিত ও ব্যবহৃত হচ্ছে যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট, তার গভীরতা ও বহুমাত্রিক অবদান অনেক সময়ই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঘোষণা বা একটি ঘটনার ফল নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব, প্রেরণা, ত্যাগ ও সাহস— সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস।

দুঃখজনকভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু গোষ্ঠী ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখিয়েছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যাও বদলেছে। কখনো কোনো ব্যক্তির অবদান অতিরঞ্জিত হয়েছে, আবার কখনো কারও ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা একটি জাতির জন্য শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বরং বিপজ্জনকও বটে। কারণ এটি নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে এবং তাদের সত্য ইতিহাস জানার পথকে জটিল করে তোলে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, এ রাষ্ট্রের স্বপ্ন, চেতনা ও রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান ও অবশেষে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ— সবকিছুই ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি। তার নেতৃত্বই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল।

অন্যদিকে ১৯৭১ সালের ক্রান্তিকালে, যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম আক্রমণে পরিস্থিতি চরমে, তখন বিভিন্ন পর্যায়ে সাহসী প্রতিরোধ, সংগঠন ও নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিতে সহায়ক হয়েছিল।

এ কথা অনস্বীকার্য, মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তির অর্জন নয়; এটি ছিল সমগ্র জাতির সম্মিলিত প্রয়াস। রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী— সবাই যার যার অবস্থান থেকে এই সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও এই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অতএব স্বাধীনতার ইতিহাসকে সংকীর্ণ বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের উচিত একটি সমন্বিত ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা। ইতিহাসের প্রতিটি অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, তথ্যভিত্তিক আলোচনা উৎসাহিত করা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থাকা— এসবই একটি দায়িত্বশীল জাতির বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।

আজকের প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন। কারণ একটি জাতি তার অতীতের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। যদি সেই ভিত্তি দুর্বল বা বিভ্রান্তিকর হয়, তবে তার অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হবে।

সুতরাং, বিভাজনের রাজনীতি নয়— ঐক্যের চেতনা, বিকৃতির পরিবর্তে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংকীর্ণতার বদলে উদার দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে আমাদের অগ্রগতির পথপ্রদর্শক। ইতিহাসকে সম্মান করা মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। তা না করতে পারলে আমরা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলব, যার দায় এড়ানোর সুযোগ আমাদের কারোরই থাকবে না।

লেখক: ব‍্যবসায়ী ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ডিসি সম্মেলন: রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে চাই পেশাদারত্ব

বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে আরও গণমুখী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা বহুদিনের। এখনো অনেক ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শিকার হন।

৬ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সাফল‍্য দেখার অপেক্ষায়

ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন ধর্মীয় উগ্রতা বা বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে বৃহত্তর মানবিকতা, সার্বজনীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের পথে এগোয়। ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানটি যদি সত্যিকার অর্থে একটি ঐক্যের আহ্বান হয়ে ওঠে, তবে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হত

১২ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বাংলাদেশের হিসাব-নিকাশ

বিজেপির নেতৃত্বে দিল্লির কেন্দ্র সরকার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের এখনকার নতুন সরকারের সঙ্গেও টেকসই সম্পৃক্ততা ও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রমাণিত। এটি ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচনি প্রচারের ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ তাদের দেশীয় রাজনীতির জন্য লাভজনক হতে প

১৩ দিন আগে

শিশু-কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা ও হয়রানির ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়।

১৬ দিন আগে