বিতর্কের রাজনীতিতে অবহেলিত নারীর মানবাধিকার

রাশেদা কে চৌধূরী

বাংলাদেশে বর্তমানে নারীর যে অবস্থা ও অবস্থান, তা অনেকটা ‘ত্রিশঙ্কু’ অবস্থার মতো। আমরা যে কোনদিকে যাচ্ছি তা বুঝে উঠতে পারছে না।

দেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। কিন্তু আমাদের যেভাবে রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত করা হচ্ছে— কোনো দল বলছে নারীদের ঘরের ভেতর থাকাটাই সঙ্গত, তাদের জন্য সব ব্যবস্থাই করা হবে; আরেক দল বলছে আইনশৃঙ্খলাজনিত কারণে নারীদের এত বাইরে আসা ঠিক না, আইনশৃঙ্খলা ঠিক করার কথা না বলে তারা নারীর ওপরই দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন— এই বিভাজনের রাজনীতিটা মোটেই গ্রহণযোগ্য না।

বলা হচ্ছে, নারীদের জন্য কখনো এই দল ব্যবস্থা করবে, কখনো ওই দল ব্যবস্থা করবে। নারী তো মানুষ, একই সঙ্গে ভোটার, নির্বাচনে প্রার্থীও হতে পারেন। কিন্তু নারীর মানবাধিকারটাই রাজনৈতিক বিতর্কের ডামাডোলে হারিয়ে গেছে।

সাম্প্রতিককালে আমরা দেখলাম, সংস্কার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনে নারীর অংশগ্রহণ কেবলই ‘প্রতীকী’। ঐকমত্য কমিশনে আমরা কোনো নারীর পদচারণা দেখিনি। পরবর্তী সময়ে দেখলাম— সবগুলো দল মিলে দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়ে মনে হয়, সংসদ নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা চিন্তা করল। কিন্তু সেটিও কেবল কথার কথাই প্রমাণিত হলো।

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কখনো চিন্তাই করেনি, তারা সেই জায়গায় কিছুই ভাবেনি। তারা বলছে, হয়তো পরবর্তী সময়ে নারীদের নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। কিন্তু নারীর অধিকারের জায়গায় তারা যে পিছু হটেছে, তা খুবই দৃশ্যমান। মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলও নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে তেমন চিন্তা করেনি।

স্বাধীনতার এই ৫৫ বছরের মাথায় আমরা যদি এমন একটি জায়গায় থেমে যাই, বলা যেতে পারে ‘ব্যাক গিয়ারে’ হাঁটতে শুরু করি, তাহলে তো আমাদের স্বাধীনতাটাই অর্থবহ হলো না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও আমাদের সন্তানেরা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে, আত্মাহুতি দিয়েছে। প্রথম প্রতিবাদ বেরিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে— সেখানে মেয়েরাই নেতৃত্ব দিয়েছিল।

তারপর আমরা দেখলাম, তারুণ্যের শক্তিতে যে নারীরা উঠে এসেছিল তারা আবার স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে শুরু করেছে। নেতৃত্বসহ সব ক্ষেত্রে তারুণ্যের যে উপস্থিতি, তা মতবিরোধের কারণে পিছু হটল। কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে প্রার্থী হলেন। সমাজ ও রাজনীতিতে এই বিভাজন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিভাজন সমাজ ও রাজনীতি কোনোটিকেই সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে না। এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।

এদিকে নারীর নিরাপত্তার জায়গাটা নিয়েও সবাই কথা বলছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা দেখলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের নিজেরই করা নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন যখন প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হলো, তখন বিস্ময়করভাবে সরকারও নিশ্চুপ থাকল। আগের কর্তৃত্ববাদী সরকারের কথা বাদই দিলাম, গত দেড় বছর নারীর অধিকারের যে অবস্থা আমরা দেখলাম তা হতাশাজনক।

শুধু বিভাজন নয়, নারীকে হেয় করা হচ্ছে, যা দুঃখজনক। সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে নারীকে অস্বীকার করা হয়েছে। অথচ এই দলগুলোর নেতারা নারী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে ছিলেন, মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।

রাজনৈতিক দলগুলো নারীকে কাদা ছোড়াছুড়ির একটি উপকরণ বানিয়ে ফেলেছে। নারীকে নিয়েই তাদের কাদা ছোড়াছুড়ি। এই জায়গাটাতে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে— তারা নারীকে যেন বিভাজনের জায়গায় নিয়ে না যায়। নারীর ব্যক্তিগত মতাদর্শ অবশ্যই থাকবে, নির্বাচনকে কাকে ভোট দেবে সেটাও নারীর ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের এমনভাবে বিভাজন করেছে, যা খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাপারে দলগুলো শুধু মুখে নারীদের রক্ষা করার কথা বললেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।

জাতীয় নির্বাচনে যেসব নারী সাহস করে প্রার্থী হয়েছেন— বাম দল, মূলধারার রাজনৈতিক দল কিংবা স্বতন্ত্র হিসেবে— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। আমরা তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের সাহস জোগাতে চেষ্টা করেছি।

একজন বললেন, “সারাদিন ক্যানভাসিং করে বাড়ি ফিরলে তরুণ সন্তান জিজ্ঞাসা করে, ‘মা, সামাজিক মাধ্যমে তোমার নামে এসব কী এসেছে?’” এমন প্রশ্ন নারীকে শুনতে হচ্ছে। নারী প্রার্থীদের একটাই প্রত্যাশা— সাইবার বুলিংসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপদস্ত করা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু এসব থেকে তাদের বাঁচাবে কারা— এই জায়গাটিও বড় একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে সরকারসহ সব রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।

নারীর কারণে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবেও এগিয়েছে। শিক্ষায় তাদের প্রায় সমান অংশগ্রহণ, ঈর্ষণীয় সাফল্য। ক্ষুদ্র ঋণ থেকে শুরু করে নারী উদ্যোক্তা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন— সব ক্ষেত্রেই নারীর অবদান এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এভারেস্ট জয় থেকে শুরু করে ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীর গৌরবজ্জল উপস্থিতি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়।

এখন যদি রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে নারীর এসব অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা হয়, তা কারও জন্যই মঙ্গলকর হবে না— দেশের জন্য না, মানুষের জন্য না, কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যও না। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দায়িত্ব পালন করুক সংযমের সঙ্গে, শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে। তাহলেই আমরা গণঅভ্যুত্থানের যে স্বপ্নটি ছিল— একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ— তা হয়তো বাস্তবায়ন করতে পারব। কারণ নারীকে পেছনে রেখে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ কখনো সম্ভব না।

লেখক: গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

‘পাগলা’ শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য— দায় কার?

কারিকুলাম পরিবর্তন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কিংবা মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারের কথা শোনা গেলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা, নোটকেন্দ্রিক শিক্ষা এবং পরীক্ষাভীতি প্রধান হয়ে আছে। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কিংবা বাস্তবজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি ব

৫ দিন আগে

রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম।

৭ দিন আগে

মেধা সম্পদ ও একাডেমিক মেরিটোক্রেসি

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই একাডেমিক মেরিটোক্রেসিকে (বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে শুধু যোগ্যতা ও কাজের মানের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরের ভিত্তিতে নয়) যথাযথভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।

৮ দিন আগে

আফসানা বেগম কি সংস্কারের শাস্তি পেলেন?

একজন উপদেষ্টার কাছ থেকে আমরা আশা করি নীতিগত সততা, সংস্কারের সাহস এবং মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। কিন্তু এখানে দেখা গেল উল্টো চিত্র— সংস্কারের প্রস্তাবকে শাস্তি দিয়ে দমন করা হলো। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা এখানে পক্ষ নেওয়া। আর সেই পক্ষটি দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের।

৯ দিন আগে