বাংলাদেশে নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক ঐক্য: নীতিগত না কৌশলগত?

জাকির আহমদ খান কামাল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন সামনে নিয়েই শুরু হয় ‘নির্বাচনি ঐক্যে’র পালা। নতুন করে আলোচনায় আসে বাম-ডান-মধ্যপন্থি কিংবা মধ্য বাম-মধ্য ডানপন্থি মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের নাম। ক্ষমতাসীন দল হোক কিংবা সম্ভাব্য বিরোধী শিবির— সব পক্ষই কোনো না কোনোভাবে ঐক্যের ডাক দেয়। এই নির্বাচন-পূর্ব ঐক্য যতটা না নীতিগত, তারচেয়ে বেশি কৌশলগত।

নীতিগত ঐক্য বলতে বোঝায় আদর্শ, মূল্যবোধ ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তায় মিল। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন— এসব মৌলিক বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট সমঝোতা থাকলে তাকে নীতিগত ঐক্য বলা যায়।

কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, এ ধরনের ঐক্য খুবই ক্ষণস্থায়ী। নির্বাচনের পরপরই আদর্শগত ভিন্নতা আবার প্রকট হয়ে ওঠে, ঐক্যের বন্ধন ঢিলে হয়ে যায়।

বাস্তবে বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব অধিকাংশ ঐক্যই কৌশলগত। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানো, ভোটের হিসাব মেলানো কিংবা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখাই এর মূল লক্ষ্য। ছোট দলগুলো বড় জোটে যুক্ত হয় রাজনৈতিক মাঠে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আশায়। আবার বড় দলগুলো সংখ্যাগত শক্তি বাড়াতে এই দলগুলোকে ব্যবহার করে। এতে আদর্শ নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে আসন বণ্টন, আন্দোলনের কর্মসূচি ও ক্ষমতার সম্ভাব্য ভাগাভাগি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই কৌশলগত ঐক্য আরও স্পষ্ট। নির্বাচন ঘিরে আস্থার সংকট, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের দাবি— এসব ইস্যুতে ঐক্যের কথা বলা হলেও গভীরে গেলে দেখা যায়, দলগুলোর লক্ষ্য ভিন্ন। কেউ চায় ক্ষমতা ধরে রাখতে, কেউ চায় ক্ষমতা পরিবর্তন। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কার বা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা নিয়ে সম্মিলিত ও সুস্পষ্ট রূপরেখা খুব কমই সামনে আসে।

কৌশলগত ঐক্য সাধারণত স্বল্পমেয়াদি লাভ এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। নির্বাচনের পর জোট ভেঙে গেলে নীতি-নির্ধারণে অস্থিরতা তৈরি হয়, সংসদীয় রাজনীতিতে আস্থাহীনতা বাড়ে। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরও দুর্বল হয়। এর কুফল ভোগ করতে হয় দেশের জনগণকেই।

অতএব প্রশ্নটি কেবল ঐক্য হবে কি না— তা নয়, বরং কেমন ঐক্য হবে? নির্বাচন-পূর্ব ঐক্য যদি নীতিগত ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, যেখানে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকে, তবেই সেটি দেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তা না হলে কেবল কৌশলগত ঐক্য দিয়ে নির্বাচনের একটি অধ্যায় শেষ হলেও রাজনৈতিক সংকট থেকে এ দেশের মানুষের মুক্তি মিলবে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক দলের জন্য এখন প্রয়োজন কৌশলের ঊর্ধ্বে নীতিরঐক্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলাম লেখক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে