
ড. কামরুল হক

গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি গণমাধ্যম সরকারের কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, নাগরিকদের সচেতন করে, একই সঙ্গে সমাজে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সত্য প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। সমাজে অসাম্য, অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে অবদান রাখে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বছর জুড়ে তথ্যপ্রবাহ ও সংবাদ-পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। একদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা ও অনলাইন সাংবাদিকতার প্রসার সংবাদ-পরিবেশকে গতিশীল করে। নাগরিকদের জন্যও তা সহজলভ্য করে তোলে।
তবে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নীরব সেন্সরশিপ ও আইনি জটিলতা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত করে। তথ্য প্রকাশের ক্ষমতাকে সীমিত করে তোলে। সাংবাদিকরা সত্য ও তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং বজায় রাখার চেষ্টার মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। এতে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নিরাপত্তার মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
প্রথাগত গণমাধ্যম, বিশেষ করে মুদ্রিত সংবাদপত্র গভীর সংকটে পড়ে। সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ের জরিপ মতে, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ এখন আর ছাপা সংবাদপত্র পড়ে না। তারা মোবাইলে খবর পড়ে। এতে মুদ্রিত সংবাদপত্রের পাঠকসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, বিজ্ঞাপন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া। তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ৪৭ শতাংশ বিজ্ঞাপন কমে গেছে। এতে সংবাদপত্রের আয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
আরও গুরুতর হলো— বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল। শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোর দু শ কোটি টাকার বেশি বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া রয়েছে। এতে অনেক সংবাদমাধ্যম নগদ প্রবাহের সংকটে পড়েছে। সংবাদ কর্মীদের বেতন দিতে তাদের সমস্যা হচ্ছে।
এমন অভিযোগও রয়েছে, এ আর্থিক সংকট কাটানোর জন্য অনেক সংবাদপত্র করপোরেট ও রাজনৈতিক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, যেন তারা নিয়মিত বিজ্ঞাপন আয় ও পরিচালন খরচ চালাতে পারে। এই নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জোরালো করে।
এর ওপর রয়েছে উচ্চ কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্কর কারণে সংবাদপত্র শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেকে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। কেউ কেউ কম আয় নিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমের দিকে ঝুঁকেছে।
টেলিভিশন মাধ্যমেও একই প্রবণতা তৈরি হয়েছে এ কথাও শোনা যায়। এমন ধারণাও রয়েছে, প্রচলিত বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়ায় অনেক টিভি চ্যানেল সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে আলোচনা করা সীমিত রেখেছে, যেন বিজ্ঞাপনদাতা বা কর্তৃপক্ষের চাপ থেকে বিরত থাকা যায়।
মোট কথা, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল গণমাধ্যমের জন্য অনেক বেশি সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ বিষয়। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়াকে অনেক সময় আইনি বাধ্যবাধকতা ও মামলা-মোকদ্দমার আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। নানা পরিস্থিতিতে সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভিন্ন সংগঠনের চাপ সহ্য করতে হয়। এমন কি হামলা, ভাঙ্গচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকারও হতে হয়।
অনেক সাংবাদিক চাকরি হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। চাকরি হারিয়েছেনও কেউ কেউ। তাই সাংবাদিকতার পরিবেশ ছিল অনিশ্চিত। বহু সাংবাদিকই পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটে ছিলেন। এই পরিস্থিতি সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বেড়েছে। অনেক সংবাদ প্রকাশের আগে তারা দ্বিধায় পড়েছেন। ভাবতে হয়েছে খবরটি কোনো পক্ষের কাছে অমঙ্গলজনক মনে হতে পারে কি না। শিরোনামের প্রতিটি শব্দ ভেবে চিন্তে ঠিক করতে হয়েছে।
আগের ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ও অনলাইন গণমাধ্যম আরও শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে সময়মত ও দ্রুত সংবাদ পেতে টেলিভিশন বা মুদ্রিত সংবাদপত্রের চেয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউব নিউজ চ্যানেলকে প্রাধান্য দেওয়ার ঝোঁক বেড়েছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো নাগরিক সাংবাদিকতা, লাইভ রিপোর্টিং ও সরাসরি প্রতিক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। নাগরিকরা কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ইস্যুর ওপর লাইভ রিপোর্ট, ছবি বা ভিডিও দ্রুত অনলাইনে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে অনেক স্থানীয় ইস্যু বা স্পর্শকাতর বিষয় দ্রুততার সঙ্গে অনলাইনে ছড়িয়ে যায়। মানুষ তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে। মন্তব্যও করতে পারে।
তবে ডিজিটাল গণমাধ্যমের এই প্রাধান্য দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে এই প্রবণতা নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে যাচাইহীন সংবাদ, গুজব, ভুল তথ্য ও ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনামের প্রবণতা ক্রমেই বেড়েছে। অনেক অনলাইন নিউজ পোর্টালের নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে— ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’। ‘সেনসেশনাল’ শিরোনাম ও অতিরঞ্জিত খবরের মাধ্যমে শুধু ভিউ, লাইক বা শেয়ার বাড়ানোই যেন উদ্দেশ্য। এ কারণে সংবাদ দ্রুত প্রকাশিত হয় ঠিকই, কিন্তু তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা হয় না।
এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ পাঠক বা দর্শক এতে ভ্রান্ত ধারণার শিকার হন। নাগরিকদের তথ্যচেতনা কমে যায়। এর ফলে প্রোপাগান্ডা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও সহজ হয়েছে। সমাজে ভুল বোঝাবুঝি বেড়েছে। অনেক সময় অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্যের ভিত্তিতে জনমত প্রভাবিত হয়।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঝোঁকও বেড়েছে। অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড অনুসরণ করতে গিয়ে তথ্য যাচাই ও পেশাগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কেউ কেউ শিরোনামকেন্দ্রিক কিংবা সংবেদনশীল ভিউভিত্তিক নিউজ প্রকাশে মনোযোগ দিয়েছে।
বিষয়টি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাংবাদিকতার নৈতিক মান ও নিরপেক্ষতার জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমের সমাজিক দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ইউটিউব চ্যানেল সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ও স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও বিকশিত হয়েছে। শক্তিশালী সমান্তরাল গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করেছে। শুধুমাত্র বিনোদন নয়, ইউটিউব চ্যানেলগুলো সংবাদ পরিবেশন, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লাইভ কভারেজ সরাসরি নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। প্রচলিত সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল থেকে ভিন্নভাবে ইউটিউব সাংবাদিকতা নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। স্বাধীন তথ্যপ্রবাহ আরও সাবলীল করেছে।
ইউটিউব সংবাদ চ্যানেল স্বাধীন সাংবাদিকদের জন্যও এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রথাগত মিডিয়ায় যাদের স্বাধীন রিপোর্টিং সীমিত ছিল, তারা এখন ইউটিউবে নিজস্ব উপস্থিতির মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করতে পারছেন। সাবেক অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা নির্দিষ্ট ইস্যুতে বিশেষ সাক্ষাৎকার ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন। তাদের ভিডিও কনন্টেটগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ভাইরালও হয় অহরহ।
তবে অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো ইউটিউব সাংবাদিকতারও বিপরীত দিক আছে। অনেক সময় ভিডিও কনটেন্টে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা সামাজিক ইস্যুতে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে যায়, যে কারণে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শুধু তাই না, বিভিন্ন আসল জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলের লোগো অনুকরণ করে কিছু ভুয়া চ্যানেল ফেইক নিউজ ও কনটেন্ট তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেয়। এই সব খবর ও কনটেন্ট দর্শকশ্রোতাদের ভুল ধারণার জন্ম দেয়।
এই দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যের কারণে ইউটিউব সাংবাদিকতা স্বাধীন মতপ্রকাশ নিশ্চিত করলেও অনেক সময় সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
সবকিছু মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য রূপান্তরের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়া এক সংকটময় সময়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের প্রকৃত দর্পণ হয়ে উঠতে হলে গণমাধ্যমের জন্য সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা অপরিহার্য। আর ২০২৫ সালে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সাংবাদিক ও গণমাধ্যম গবেষক; সাবেক পরিচালক (গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণ), প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি গণমাধ্যম সরকারের কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, নাগরিকদের সচেতন করে, একই সঙ্গে সমাজে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সত্য প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। সমাজে অসাম্য, অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে অবদান রাখে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বছর জুড়ে তথ্যপ্রবাহ ও সংবাদ-পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। একদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা ও অনলাইন সাংবাদিকতার প্রসার সংবাদ-পরিবেশকে গতিশীল করে। নাগরিকদের জন্যও তা সহজলভ্য করে তোলে।
তবে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নীরব সেন্সরশিপ ও আইনি জটিলতা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত করে। তথ্য প্রকাশের ক্ষমতাকে সীমিত করে তোলে। সাংবাদিকরা সত্য ও তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং বজায় রাখার চেষ্টার মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। এতে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নিরাপত্তার মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
প্রথাগত গণমাধ্যম, বিশেষ করে মুদ্রিত সংবাদপত্র গভীর সংকটে পড়ে। সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ের জরিপ মতে, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ এখন আর ছাপা সংবাদপত্র পড়ে না। তারা মোবাইলে খবর পড়ে। এতে মুদ্রিত সংবাদপত্রের পাঠকসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, বিজ্ঞাপন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া। তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ৪৭ শতাংশ বিজ্ঞাপন কমে গেছে। এতে সংবাদপত্রের আয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
আরও গুরুতর হলো— বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল। শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোর দু শ কোটি টাকার বেশি বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া রয়েছে। এতে অনেক সংবাদমাধ্যম নগদ প্রবাহের সংকটে পড়েছে। সংবাদ কর্মীদের বেতন দিতে তাদের সমস্যা হচ্ছে।
এমন অভিযোগও রয়েছে, এ আর্থিক সংকট কাটানোর জন্য অনেক সংবাদপত্র করপোরেট ও রাজনৈতিক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, যেন তারা নিয়মিত বিজ্ঞাপন আয় ও পরিচালন খরচ চালাতে পারে। এই নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জোরালো করে।
এর ওপর রয়েছে উচ্চ কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্কর কারণে সংবাদপত্র শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেকে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। কেউ কেউ কম আয় নিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমের দিকে ঝুঁকেছে।
টেলিভিশন মাধ্যমেও একই প্রবণতা তৈরি হয়েছে এ কথাও শোনা যায়। এমন ধারণাও রয়েছে, প্রচলিত বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়ায় অনেক টিভি চ্যানেল সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে আলোচনা করা সীমিত রেখেছে, যেন বিজ্ঞাপনদাতা বা কর্তৃপক্ষের চাপ থেকে বিরত থাকা যায়।
মোট কথা, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল গণমাধ্যমের জন্য অনেক বেশি সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ বিষয়। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়াকে অনেক সময় আইনি বাধ্যবাধকতা ও মামলা-মোকদ্দমার আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। নানা পরিস্থিতিতে সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভিন্ন সংগঠনের চাপ সহ্য করতে হয়। এমন কি হামলা, ভাঙ্গচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকারও হতে হয়।
অনেক সাংবাদিক চাকরি হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। চাকরি হারিয়েছেনও কেউ কেউ। তাই সাংবাদিকতার পরিবেশ ছিল অনিশ্চিত। বহু সাংবাদিকই পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটে ছিলেন। এই পরিস্থিতি সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বেড়েছে। অনেক সংবাদ প্রকাশের আগে তারা দ্বিধায় পড়েছেন। ভাবতে হয়েছে খবরটি কোনো পক্ষের কাছে অমঙ্গলজনক মনে হতে পারে কি না। শিরোনামের প্রতিটি শব্দ ভেবে চিন্তে ঠিক করতে হয়েছে।
আগের ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ও অনলাইন গণমাধ্যম আরও শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে সময়মত ও দ্রুত সংবাদ পেতে টেলিভিশন বা মুদ্রিত সংবাদপত্রের চেয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউব নিউজ চ্যানেলকে প্রাধান্য দেওয়ার ঝোঁক বেড়েছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো নাগরিক সাংবাদিকতা, লাইভ রিপোর্টিং ও সরাসরি প্রতিক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। নাগরিকরা কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ইস্যুর ওপর লাইভ রিপোর্ট, ছবি বা ভিডিও দ্রুত অনলাইনে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে অনেক স্থানীয় ইস্যু বা স্পর্শকাতর বিষয় দ্রুততার সঙ্গে অনলাইনে ছড়িয়ে যায়। মানুষ তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে। মন্তব্যও করতে পারে।
তবে ডিজিটাল গণমাধ্যমের এই প্রাধান্য দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে এই প্রবণতা নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে যাচাইহীন সংবাদ, গুজব, ভুল তথ্য ও ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনামের প্রবণতা ক্রমেই বেড়েছে। অনেক অনলাইন নিউজ পোর্টালের নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে— ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’। ‘সেনসেশনাল’ শিরোনাম ও অতিরঞ্জিত খবরের মাধ্যমে শুধু ভিউ, লাইক বা শেয়ার বাড়ানোই যেন উদ্দেশ্য। এ কারণে সংবাদ দ্রুত প্রকাশিত হয় ঠিকই, কিন্তু তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা হয় না।
এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ পাঠক বা দর্শক এতে ভ্রান্ত ধারণার শিকার হন। নাগরিকদের তথ্যচেতনা কমে যায়। এর ফলে প্রোপাগান্ডা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও সহজ হয়েছে। সমাজে ভুল বোঝাবুঝি বেড়েছে। অনেক সময় অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্যের ভিত্তিতে জনমত প্রভাবিত হয়।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঝোঁকও বেড়েছে। অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড অনুসরণ করতে গিয়ে তথ্য যাচাই ও পেশাগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কেউ কেউ শিরোনামকেন্দ্রিক কিংবা সংবেদনশীল ভিউভিত্তিক নিউজ প্রকাশে মনোযোগ দিয়েছে।
বিষয়টি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাংবাদিকতার নৈতিক মান ও নিরপেক্ষতার জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমের সমাজিক দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ইউটিউব চ্যানেল সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ও স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও বিকশিত হয়েছে। শক্তিশালী সমান্তরাল গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করেছে। শুধুমাত্র বিনোদন নয়, ইউটিউব চ্যানেলগুলো সংবাদ পরিবেশন, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লাইভ কভারেজ সরাসরি নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। প্রচলিত সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল থেকে ভিন্নভাবে ইউটিউব সাংবাদিকতা নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। স্বাধীন তথ্যপ্রবাহ আরও সাবলীল করেছে।
ইউটিউব সংবাদ চ্যানেল স্বাধীন সাংবাদিকদের জন্যও এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রথাগত মিডিয়ায় যাদের স্বাধীন রিপোর্টিং সীমিত ছিল, তারা এখন ইউটিউবে নিজস্ব উপস্থিতির মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করতে পারছেন। সাবেক অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা নির্দিষ্ট ইস্যুতে বিশেষ সাক্ষাৎকার ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন। তাদের ভিডিও কনন্টেটগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ভাইরালও হয় অহরহ।
তবে অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো ইউটিউব সাংবাদিকতারও বিপরীত দিক আছে। অনেক সময় ভিডিও কনটেন্টে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা সামাজিক ইস্যুতে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে যায়, যে কারণে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শুধু তাই না, বিভিন্ন আসল জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলের লোগো অনুকরণ করে কিছু ভুয়া চ্যানেল ফেইক নিউজ ও কনটেন্ট তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেয়। এই সব খবর ও কনটেন্ট দর্শকশ্রোতাদের ভুল ধারণার জন্ম দেয়।
এই দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যের কারণে ইউটিউব সাংবাদিকতা স্বাধীন মতপ্রকাশ নিশ্চিত করলেও অনেক সময় সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
সবকিছু মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য রূপান্তরের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়া এক সংকটময় সময়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের প্রকৃত দর্পণ হয়ে উঠতে হলে গণমাধ্যমের জন্য সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা অপরিহার্য। আর ২০২৫ সালে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সাংবাদিক ও গণমাধ্যম গবেষক; সাবেক পরিচালক (গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণ), প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

এবারের একুশে বইমেলা যে সুপার ফ্লপ করল, আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত বাঙালির প্রাণের উৎসবটির যে কত বড় ক্ষতি করে ফেললাম, তার কারণ, দায় ও উত্তরণ নিয়ে গভীর গবেষণা অত্যন্ত প্রয়োজন।
২ দিন আগে
দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে আসছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এই বিশেষ কার্ডের পরিকল্পনা করেছে নতুন সরকার।
৪ দিন আগে
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষা যেভাবে একটি শক্তিশালী একাডেমিক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার পেছনে যাঁদের অবদান অগ্রগণ্য, তাদের মধ্যে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান অন্যতম। তার জীবনকে একটি বাক্যে সংক্ষেপ করা যায় এভাবে— তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল সেতুবন্ধন।
৪ দিন আগে
ফ্যামিলি কার্ড মূলত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। সাধারণত পরিবারে নারীর নামেই এই কার্ড ইস্যু করা হয়। ফলে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে আসে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়, বরং নারীর অ
৪ দিন আগে