সজীব রহমান
জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর সংঘাত-সহিংসতা ও নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া হামলার ঘটনায় রাজনীতিতে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর অন্যতম হচ্ছে— জাতীয় পার্টিকেন্দ্রিক এই অস্থিরতায় কার লাভ, কার ক্ষতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউই জাপা নিষিদ্ধের বিষয়টি সাদা চোখে দেখতে বা সাধারণ ঘটনা হিসেবে মানতে রাজি নন। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা বা নির্বাচন হলেও বিশেষ সুবিধা নেওয়া।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে জাপা নিষিদ্ধের দাবি যেমন আছে, তেমনি জাপা নিষিদ্ধ হলে জামায়াতে ইসলামি এর সুফল বেশি পেতে পারে বলে রাজনীতিতে আলোচনাও আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বিএনপির প্রতিপক্ষ এখন জামায়াতে ইসলামি। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা গেলে জামায়াত তখন বিএনপির শক্ত বা সবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি অন্যান্য ইসলামি দলগুলো সঙ্গে নিয়ে জামায়াত দরকষাকষির সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
পিআর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব না মানলে দলটি নির্বাচন বর্জন বা বয়কটের অবস্থানে গেলে মাঠে আর কোনো বিকল্প শক্তি বা খেলোয়াড় থাকছে না। সে ক্ষেত্রে দেশে বা বিদেশে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, যা প্রকারান্তরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের গ্যাঁড়াকলে ফেলবে বিএনপিকে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে বারবার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এর ছাপ পড়েনি। উলটো দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার (২৯ আগস্ট) কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতে নুরুল হক নুরের মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনায় ফের জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
এক পক্ষের বক্তব্য, টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদেরই জোটসঙ্গী ছিল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধী দল হয়েছে। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ একপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লেও জাপা বহাল তবিয়তে রয়েছে।
জাতীয় পার্টিকে এখন আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টায় ব্যবহার করার পাশাপাশি আগের মতোই রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার মধ্যস্থতায় আগামী নির্বাচনে আবারও বিরোধী দল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের।
আওয়ামী লীগকে দেড় দশক ধরে সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে ভোট না করতে পারলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও গন্তব্য হারাবে। পরোক্ষভাবে সেই সুবিধাও পাবে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো। তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি।
এদিকে অন্য কিছু রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কারও কারও আশঙ্কা, কোনো একটি দল কিংবা গোষ্ঠীর চাপে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা হলে পরে তা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে। এমনকি জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের চেষ্টার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার প্রচেষ্টাও দেখছেন অনেকে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সময়েই জাপাকেও নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। এমনকি জাপাসহ আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি তারা যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, সে দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদনও দেওয়া হয়।
এবার শুক্রবার রাতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হওয়ার পর জাপা নিষিদ্ধের জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন জুলাই মঞ্চের নেতারা।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান শনিবার বলেন, আগামীতে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসানোর চক্রান্ত চলছে। এ নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে দলটির দেনদরবার হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নুরের আহত হওয়ার ঘটনায় শুক্রবার রাতে ও শনিবার দিনভর একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জুলাইকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একাধিক সংগঠন। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে, কেউ কেউ ইঙ্গিতে জাপার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দাবি করেছে।
শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শরিক ১৪ দলকে নিষিদ্ধের দাবি জানান।
এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিও একই দোষে দোষী।
শনিবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, ফ্যাসিবাদ উৎখাতে রক্ত ও জীবনের নজরানা দেওয়া হয়েছে। তাই কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হতে দেওয়া হবে না।
এ সংঘর্ষ ও ডামাডোলের মধ্যে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করা প্রশ্নে বিএনপি কোনো বক্তব্য দেয়নি। তবে গত বছরের ২ নভেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার আমরা কারা? জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।’
জাতীয় পার্টিকে ঘিরে তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছিলেন বিএনপি মহাসচিব। দলটির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, জাপা ইস্যুতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা পাননি। তবে দলের মহাসচিবের যে অবস্থান আগে ছিল, সেটিই এখন পর্যন্ত দলীয় অবস্থান।
জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ১৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের পুরোপুরি সঙ্গী হিসেবে কাজ করেছে। সরকারি বিরোধী দল, গৃহপালিত বিরোধী দলও ছিল তারা। এখন আওয়ামী লীগকে সরকার যেহেতু নিষিদ্ধ করেছে, তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সময়ে জাতীয় পার্টির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা যেত— এমনটিই মনে করেন অধ্যাপক সাহাবুল।
এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, অবস্থা এখন এমন হয়েছে, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা না করা এটা মতামত নয়, আপনার সঙ্গে কয়েক শ মানুষ থাকলে আপনি দাবি তুলে ফেলতে পারছেন। দাবি পূরণও হচ্ছে। সরকারের বাহিনী তো স্ট্রং না। যারা এখন মব করছে, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ চাচ্ছে, তারাই আবার কিছুদিন পর আরেক দল নিষিদ্ধের দাবি তুলবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, স্বৈরশাসক এতদিন ক্ষমতায় ছিল। তাকে কিন্তু কোনো নোটিশ দিয়ে সরানো হয়নি। জনগণের চাপে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক যতই সংকট থাকুক না কেন, কোনো একটি ডিক্রি বা অর্ডার জারি করে কাউকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে জাতীয় পার্টির নিষিদ্ধের জন্য জোরালো প্রচারণায় নামা উচিত। জনগণ যদি চায় তাহলে এটা হবে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে গত মে মাসে ইসিতে আবেদন জমা হওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি অযৌক্তিক। কারণ নির্বাচন ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে (আরপিও) জাপা সেই শর্তে পড়ে না।’
সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে। জাতীয় পার্টিকে ভিকটিম করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই দুঃখজনক। আশা করি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভুমিকা রাখবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি কোনো বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনার অংশ। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জাপার বহিষ্কৃত কিছু নেতার যোগসূত্র থাকতে পারে, যারা জাতীয় পার্টি পরিচয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখছে। যদিও এত বছর তারাই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিলেন।
জাপাকে নিষিদ্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য আসেনি সরকারের তরফ থেকে। তবে এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
শনিবার এক অনুষ্ঠান শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সব বিতর্কিত নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের দমনপীড়নে সহযোগিতা করেছে জাতীয় পার্টি। এ কারণে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে এর আইনি দিক যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।’
জাতীয় পার্টি কেন নিষিদ্ধ হবে না— এমন প্রশ্নও রেখেছেন রাষ্ট্রের এই প্রধান আইন কর্মকর্তা।
আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে স্পষ্ট সুবিধাভোগী ছিল জাতীয় পার্টি। রাজনৈতিক মহলে দলটির পরিচিতি ছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে।
এদিকে অধিকাংশ মানদণ্ডে ২০০৮ সালের যে জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হয় সেখানে ভোটের হার ছিল— আওয়ামী লীগ ৪৮ শতাংশ, বিএনপি ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও জামায়াত ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সে নির্বাচনে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বাস্তবতা নেই। তবে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের বড় অংশ তারা পেতে পারে, এমন সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। জাতীয় পার্টি নির্বাচন না করতে পারলে ওই ভোটগুলোর গন্তব্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমানের অভিমত, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হলে জামায়াত-এনসিপির মতো দলগুলো লাভবান হবে। কারণ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম তো নিষিদ্ধ। এখন যদি জাতীয় পার্টিকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কেনো বড় দল থাকবে না। ফলে তারা এখন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলে নির্বাচনি পরিবেশ ঘোলাটে করে তোলার শঙ্কাও দেখছেন অনেকে। তারা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে এখনো বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি মুখোমুখি অবস্থানে আছে। এ অবস্থায় নির্বাচন হলে জামায়াত-এনসিপির নির্বাচন বয়কট করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে না থাকলে বিএনপি সমমনাদের নিয়ে একা হয়ে পড়বে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। এতে দেশও পড়বে অস্থিতিশীল অবস্থার মুখে।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী যখন বঞ্চিত হয়, তখন কিন্তু তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। একটা সময় নিষিদ্ধ হওয়ার পর জামায়াতও সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছিল। জীবনের সব মায়া ছেড়ে মাঠে নেমে গিয়েছিল। এখন আবার বড় একটি জনগোষ্ঠীকে যদি স্পেস না দেওয়া হয় তাহলে তারা উলটো দিকে মুভ করতে পারে। তখন গৃহযুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি থাকে। এটা হয়তো সরকার বুঝতে পারছে না।
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, এ পরিস্থিতি সরকারের ব্যর্থতা। এত লম্বা সময় নিয়ে তো তাদের সরকারের থাকার কথা না। সরকার যত বেশি সময় নিচ্ছে তাদের ব্যর্থতা বাড়ছে। যখন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, তখন একের পর এক ঘটনা ঘটছে। নির্বাচন যেন ঘোষিত সময়ে না হয় সেজন্য বিশেষ মহল কাজ করছে। ঘটনার পরম্পরায় যা ঘটছে খেয়াল করলেই সব পরিষ্কার হবে।
একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ড. জাহেদ উর রহমানও। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিজের ইউটিউব চ্যানেলে এক আলোচনায় বলেন, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার তৎপরতা কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়। বরং মনে হচ্ছে, এটি পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনি পরিবেশকে জটিল করে তুলছে।
‘জামায়াত ও এনসিপি যদি নির্বাচনে না যায়, তাহলে মাঠে কেবল বিএনপি ও তাদের মিত্ররা থাকবে, যারা এককভাবে কোনো নির্বাচনে অংশ নিলে সেটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। সেই সুযোগটি কাজে লাগাতেই হয়তো জাতীয় পার্টিকে সরানোর প্রচেষ্টা চলছে,’— বলেন ড. জাহেদুর।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘নির্বাচন বানচালের বা পেছানোর যেকোনো উদ্যোগ প্রতিহত করতে হবে। এর জন্য দরকার সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সংযম।’
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের এই দাবির পেছনে নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক ফাহমিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি হলো পতিত আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকা মাঝারি আকারের দল। তাদের আবার দুই ভাগ এখন— জি এম কাদের আর আনিসুল ইসলাম মাহমুদের অধীনে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলেও জাপা সিদ্ধ আছে। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদ জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা মাঝারি আকারের দল। সম্ভবত তাদের সঙ্গে বড় দল বিএনপিরও সম্পর্ক ভালো ছিল।
পতিত স্বৈরাচারের সহযোগী এক মাঝারি দলের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের সহযোগী আরেক মাঝারি দল বিবাদে জড়াল কেন— এমন প্রশ্ন তুলে ফেসবুক পোস্টে ফাহমিদুল বলেন, জাপাকে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করার জন্য মাঠের শক্তি প্রদর্শনে কেন গণঅধিকার পরিষদ এগিয়ে গেল? কেন এনসিপি যায়নি? কেন জামায়াত যায়নি? নুর কি কারও দ্বারা ব্যবহৃত হলেন? নাকি নির্বাচন-পক্ষ বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন-বিপক্ষ জামায়াত-এনসিপির টেনশনের বলি হচ্ছেন নুর?
নুরের দল সম্ভবত গ্ল্যাডিয়েটর বেশে জাপার সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, যেখানে এক গ্যালারিতে বিএনপি, আরেক গ্যালারিতে জামায়াত-এসসিপি তা দেখে মজা নিচ্ছে— এমন উপসংহারেও পৌঁছেছেন ফাহমিদুল হক।
জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর সংঘাত-সহিংসতা ও নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া হামলার ঘটনায় রাজনীতিতে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর অন্যতম হচ্ছে— জাতীয় পার্টিকেন্দ্রিক এই অস্থিরতায় কার লাভ, কার ক্ষতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউই জাপা নিষিদ্ধের বিষয়টি সাদা চোখে দেখতে বা সাধারণ ঘটনা হিসেবে মানতে রাজি নন। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা বা নির্বাচন হলেও বিশেষ সুবিধা নেওয়া।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে জাপা নিষিদ্ধের দাবি যেমন আছে, তেমনি জাপা নিষিদ্ধ হলে জামায়াতে ইসলামি এর সুফল বেশি পেতে পারে বলে রাজনীতিতে আলোচনাও আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বিএনপির প্রতিপক্ষ এখন জামায়াতে ইসলামি। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা গেলে জামায়াত তখন বিএনপির শক্ত বা সবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি অন্যান্য ইসলামি দলগুলো সঙ্গে নিয়ে জামায়াত দরকষাকষির সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
পিআর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব না মানলে দলটি নির্বাচন বর্জন বা বয়কটের অবস্থানে গেলে মাঠে আর কোনো বিকল্প শক্তি বা খেলোয়াড় থাকছে না। সে ক্ষেত্রে দেশে বা বিদেশে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, যা প্রকারান্তরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের গ্যাঁড়াকলে ফেলবে বিএনপিকে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে বারবার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এর ছাপ পড়েনি। উলটো দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার (২৯ আগস্ট) কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতে নুরুল হক নুরের মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনায় ফের জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
এক পক্ষের বক্তব্য, টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদেরই জোটসঙ্গী ছিল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধী দল হয়েছে। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ একপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লেও জাপা বহাল তবিয়তে রয়েছে।
জাতীয় পার্টিকে এখন আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টায় ব্যবহার করার পাশাপাশি আগের মতোই রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার মধ্যস্থতায় আগামী নির্বাচনে আবারও বিরোধী দল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের।
আওয়ামী লীগকে দেড় দশক ধরে সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে ভোট না করতে পারলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও গন্তব্য হারাবে। পরোক্ষভাবে সেই সুবিধাও পাবে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো। তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি।
এদিকে অন্য কিছু রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কারও কারও আশঙ্কা, কোনো একটি দল কিংবা গোষ্ঠীর চাপে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা হলে পরে তা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে। এমনকি জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের চেষ্টার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার প্রচেষ্টাও দেখছেন অনেকে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সময়েই জাপাকেও নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। এমনকি জাপাসহ আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি তারা যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, সে দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদনও দেওয়া হয়।
এবার শুক্রবার রাতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হওয়ার পর জাপা নিষিদ্ধের জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন জুলাই মঞ্চের নেতারা।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান শনিবার বলেন, আগামীতে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসানোর চক্রান্ত চলছে। এ নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে দলটির দেনদরবার হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নুরের আহত হওয়ার ঘটনায় শুক্রবার রাতে ও শনিবার দিনভর একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জুলাইকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একাধিক সংগঠন। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে, কেউ কেউ ইঙ্গিতে জাপার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দাবি করেছে।
শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শরিক ১৪ দলকে নিষিদ্ধের দাবি জানান।
এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিও একই দোষে দোষী।
শনিবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, ফ্যাসিবাদ উৎখাতে রক্ত ও জীবনের নজরানা দেওয়া হয়েছে। তাই কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হতে দেওয়া হবে না।
এ সংঘর্ষ ও ডামাডোলের মধ্যে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করা প্রশ্নে বিএনপি কোনো বক্তব্য দেয়নি। তবে গত বছরের ২ নভেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার আমরা কারা? জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।’
জাতীয় পার্টিকে ঘিরে তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছিলেন বিএনপি মহাসচিব। দলটির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, জাপা ইস্যুতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা পাননি। তবে দলের মহাসচিবের যে অবস্থান আগে ছিল, সেটিই এখন পর্যন্ত দলীয় অবস্থান।
জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ১৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের পুরোপুরি সঙ্গী হিসেবে কাজ করেছে। সরকারি বিরোধী দল, গৃহপালিত বিরোধী দলও ছিল তারা। এখন আওয়ামী লীগকে সরকার যেহেতু নিষিদ্ধ করেছে, তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সময়ে জাতীয় পার্টির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা যেত— এমনটিই মনে করেন অধ্যাপক সাহাবুল।
এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, অবস্থা এখন এমন হয়েছে, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা না করা এটা মতামত নয়, আপনার সঙ্গে কয়েক শ মানুষ থাকলে আপনি দাবি তুলে ফেলতে পারছেন। দাবি পূরণও হচ্ছে। সরকারের বাহিনী তো স্ট্রং না। যারা এখন মব করছে, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ চাচ্ছে, তারাই আবার কিছুদিন পর আরেক দল নিষিদ্ধের দাবি তুলবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, স্বৈরশাসক এতদিন ক্ষমতায় ছিল। তাকে কিন্তু কোনো নোটিশ দিয়ে সরানো হয়নি। জনগণের চাপে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক যতই সংকট থাকুক না কেন, কোনো একটি ডিক্রি বা অর্ডার জারি করে কাউকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে জাতীয় পার্টির নিষিদ্ধের জন্য জোরালো প্রচারণায় নামা উচিত। জনগণ যদি চায় তাহলে এটা হবে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে গত মে মাসে ইসিতে আবেদন জমা হওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি অযৌক্তিক। কারণ নির্বাচন ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে (আরপিও) জাপা সেই শর্তে পড়ে না।’
সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে। জাতীয় পার্টিকে ভিকটিম করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই দুঃখজনক। আশা করি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভুমিকা রাখবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি কোনো বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনার অংশ। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জাপার বহিষ্কৃত কিছু নেতার যোগসূত্র থাকতে পারে, যারা জাতীয় পার্টি পরিচয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখছে। যদিও এত বছর তারাই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিলেন।
জাপাকে নিষিদ্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য আসেনি সরকারের তরফ থেকে। তবে এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
শনিবার এক অনুষ্ঠান শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সব বিতর্কিত নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের দমনপীড়নে সহযোগিতা করেছে জাতীয় পার্টি। এ কারণে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে এর আইনি দিক যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।’
জাতীয় পার্টি কেন নিষিদ্ধ হবে না— এমন প্রশ্নও রেখেছেন রাষ্ট্রের এই প্রধান আইন কর্মকর্তা।
আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে স্পষ্ট সুবিধাভোগী ছিল জাতীয় পার্টি। রাজনৈতিক মহলে দলটির পরিচিতি ছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে।
এদিকে অধিকাংশ মানদণ্ডে ২০০৮ সালের যে জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হয় সেখানে ভোটের হার ছিল— আওয়ামী লীগ ৪৮ শতাংশ, বিএনপি ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও জামায়াত ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সে নির্বাচনে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বাস্তবতা নেই। তবে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের বড় অংশ তারা পেতে পারে, এমন সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। জাতীয় পার্টি নির্বাচন না করতে পারলে ওই ভোটগুলোর গন্তব্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমানের অভিমত, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হলে জামায়াত-এনসিপির মতো দলগুলো লাভবান হবে। কারণ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম তো নিষিদ্ধ। এখন যদি জাতীয় পার্টিকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কেনো বড় দল থাকবে না। ফলে তারা এখন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলে নির্বাচনি পরিবেশ ঘোলাটে করে তোলার শঙ্কাও দেখছেন অনেকে। তারা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে এখনো বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি মুখোমুখি অবস্থানে আছে। এ অবস্থায় নির্বাচন হলে জামায়াত-এনসিপির নির্বাচন বয়কট করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে না থাকলে বিএনপি সমমনাদের নিয়ে একা হয়ে পড়বে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। এতে দেশও পড়বে অস্থিতিশীল অবস্থার মুখে।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী যখন বঞ্চিত হয়, তখন কিন্তু তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। একটা সময় নিষিদ্ধ হওয়ার পর জামায়াতও সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছিল। জীবনের সব মায়া ছেড়ে মাঠে নেমে গিয়েছিল। এখন আবার বড় একটি জনগোষ্ঠীকে যদি স্পেস না দেওয়া হয় তাহলে তারা উলটো দিকে মুভ করতে পারে। তখন গৃহযুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি থাকে। এটা হয়তো সরকার বুঝতে পারছে না।
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, এ পরিস্থিতি সরকারের ব্যর্থতা। এত লম্বা সময় নিয়ে তো তাদের সরকারের থাকার কথা না। সরকার যত বেশি সময় নিচ্ছে তাদের ব্যর্থতা বাড়ছে। যখন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, তখন একের পর এক ঘটনা ঘটছে। নির্বাচন যেন ঘোষিত সময়ে না হয় সেজন্য বিশেষ মহল কাজ করছে। ঘটনার পরম্পরায় যা ঘটছে খেয়াল করলেই সব পরিষ্কার হবে।
একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ড. জাহেদ উর রহমানও। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিজের ইউটিউব চ্যানেলে এক আলোচনায় বলেন, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার তৎপরতা কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়। বরং মনে হচ্ছে, এটি পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনি পরিবেশকে জটিল করে তুলছে।
‘জামায়াত ও এনসিপি যদি নির্বাচনে না যায়, তাহলে মাঠে কেবল বিএনপি ও তাদের মিত্ররা থাকবে, যারা এককভাবে কোনো নির্বাচনে অংশ নিলে সেটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। সেই সুযোগটি কাজে লাগাতেই হয়তো জাতীয় পার্টিকে সরানোর প্রচেষ্টা চলছে,’— বলেন ড. জাহেদুর।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘নির্বাচন বানচালের বা পেছানোর যেকোনো উদ্যোগ প্রতিহত করতে হবে। এর জন্য দরকার সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সংযম।’
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের এই দাবির পেছনে নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক ফাহমিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি হলো পতিত আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকা মাঝারি আকারের দল। তাদের আবার দুই ভাগ এখন— জি এম কাদের আর আনিসুল ইসলাম মাহমুদের অধীনে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলেও জাপা সিদ্ধ আছে। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদ জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা মাঝারি আকারের দল। সম্ভবত তাদের সঙ্গে বড় দল বিএনপিরও সম্পর্ক ভালো ছিল।
পতিত স্বৈরাচারের সহযোগী এক মাঝারি দলের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের সহযোগী আরেক মাঝারি দল বিবাদে জড়াল কেন— এমন প্রশ্ন তুলে ফেসবুক পোস্টে ফাহমিদুল বলেন, জাপাকে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করার জন্য মাঠের শক্তি প্রদর্শনে কেন গণঅধিকার পরিষদ এগিয়ে গেল? কেন এনসিপি যায়নি? কেন জামায়াত যায়নি? নুর কি কারও দ্বারা ব্যবহৃত হলেন? নাকি নির্বাচন-পক্ষ বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন-বিপক্ষ জামায়াত-এনসিপির টেনশনের বলি হচ্ছেন নুর?
নুরের দল সম্ভবত গ্ল্যাডিয়েটর বেশে জাপার সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, যেখানে এক গ্যালারিতে বিএনপি, আরেক গ্যালারিতে জামায়াত-এসসিপি তা দেখে মজা নিচ্ছে— এমন উপসংহারেও পৌঁছেছেন ফাহমিদুল হক।
অসাধারণ ছিল তারিখ ইবরাহিমের রাজনৈতিক ভূত-ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত আলোচনাগুলো। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের আন্দোলনের রাজনৈতিক কর্মীরা এ থেকে খোরাক পেতেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদরাও সে সময় তারিখ ইবরাহিমের লেখা থেকে পাথেয় খুঁজতেন। কেউ সেদিন জানতে পারেনি, সামরিক সরকারের গোয়েন্দারাও খুঁজে বের করতে পারেনি তারিখ ইবরাহিম ন
৭ দিন আগেকিন্তু ইসহাক দার যখন ঢাকায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন, কথা বললেন ভিন্ন সুরে। তার দাবি, ১৯৭৪ সালের চুক্তির মাধ্যমে এ ইস্যুর সমাধান হয়ে গেছে। আরও বললেন, জেনারেল পারভেজ মোশাররফ একসময় খোলাখুলি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, সেটিই যথেষ্ট। যেন পরিবারের ভেতরে কোনো কলহ একবার চাপা দেওয়া গেলে সেটি পুনরায় টেনে আনার
৭ দিন আগেউদ্বেগজনক পরিসংখ্যান: বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বেকারত্বের হার ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে সার্বিক বেকারত্ব দাঁড়ায় ৪.৬৩%, যা আগের বছরের ৩.৯৫% থেকে বেড়ে প্রায় ২৭ লাখ মানুষকে কর্মহীন করেছে।
৭ দিন আগেগর্তের ভিতর ইঁদুর রেখে গর্ত ভরাট করে লাভ নেই-পুঁজিবাজারের ইঁদুর মার্জিন। পুঁজিবাজার ইকুইটি নির্ভর। মৌলনির্ভর ইকুইটিই এ বাজারের শক্তি। পুঁজিবাজার সুদমুক্ত লগ্নি ও টেকসই পুঁজি সরবরাহ করে। এখানে ঋণ নয়, প্রয়োজন পুঁজির নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা।
৮ দিন আগে