ভারতকে ছাড়াই নতুন দক্ষিণ এশীয় জোটের পরিকল্পনা পাকিস্তানের, আদৌ সফল হবে?

উসাইদ সিদ্দিকী
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১: ৩৫
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি। প্রতীকী ছবি

পাকিস্তান বলছে, বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে তাদের গড়ে ওঠা নতুন ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু ভারতকে বাইরে রেখে বা তার প্রভাব সীমিত করে নতুন কোনো ‘সার্ক’ আদৌ দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রহণযোগ্য হবে কি না— সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

নতুন জোট নিয়ে পাকিস্তানের ঘোষণা

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক ত্রিপাক্ষিক উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও দেশকে যুক্ত করে সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।

বুধবার ইসলামাবাদ কনক্লেভে তিনি বলেন, ‘আমরা কখনোই শূন্য-ফলাফলভিত্তিক (Zero-sum) দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে ছিলাম না। আমরা বরাবরই সংঘাত নয়, সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে এসেছি।’

মূলত এটি দক্ষিণ এশিয়াকে ঘিরে চীনকে যুক্ত করে একটি বিকল্প আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রস্তাব, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান আঞ্চলিক সংগঠন সার্ক গত বহু বছর ধরেই ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে কার্যত অচল হয়ে রয়েছে।

চলতি বছরের জুনে চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনজীবনের উন্নয়ন নিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করেন। তখন তারা বলেছিলেন, এই সহযোগিতা কোনো ‘তৃতীয় পক্ষে’র বিরুদ্ধে নয়।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি

ইসহাক দারের এ মন্তব্য এসেছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সীমিত বিমানযুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।

এদিকে গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও বড় ধস নামে। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। পরে নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। কিন্তু ভারত এখনো তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়নি।

তাহলে কি সার্কের বিকল্প তৈরি হচ্ছে?

বর্তমানে সার্কের সদস্য দেশ হলো— ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তান।

প্রশ্ন উঠছে, ভারতকে আংশিক বা পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন কোনো আঞ্চলিক জোট গঠনে এই দেশগুলো আদৌ রাজি হবে কি না।

গত আগস্টে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার  ঢাকা সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে। ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
গত আগস্টে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে। ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

পাকিস্তানের প্রস্তাব কী?

ইসহাক দার বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের লক্ষ্য হলো—

‘পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং এই ধারণাকে আরও দেশ ও অঞ্চলে ‘সম্প্রসারণ ও পুনরাবৃত্তি’ করা।

‘অর্থনীতি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ— বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন কাঠামোর জোট হতে পারে,’— বলেন ইসহাক দার।

ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোনো একটি দেশের অনমনীয়তার কারণে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকার জিম্মি থাকতে পারে না।’

সার্ক কী এবং কেন অচল?

১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল— বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। ২০০৭ সালে আফগানিস্তান যুক্ত হয় এই আঞ্চলিক জোটে।

এই জোটের মূল লক্ষ্য—

  • দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন
  • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
  • সাংস্কৃতিক উন্নয়ন

কিন্তু গত ৪০ বছরে সংগঠনটি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে মূলত ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার কারণে। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে যে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল, কাশ্মীরে হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে সে সম্মেলন বর্জন করে ভারত। এরপর থেকে সার্ক কার্যত স্থবির।

সার্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?

২০২৫ সাল পর্যন্ত সার্কভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ২০০ কোটির বেশি, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।

জনবহুল হলেও এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ— প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ২৫ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য ৬৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য

  • ২০১৭–১৮ অর্থবছর: ২.৪১ বিলিয়ন ডলার
  • ২০২৪ সালে নেমে আসে ১.২ বিলিয়নে
  • তবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার

পাকিস্তানের প্রস্তাব কি সফল হবে?

বিশ্লেষক প্রভীন দোন্থি বলেন, ‘সার্কের নীরব মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক খারাপ হওয়া এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে চীনের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতার পথ খুলেছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রাবিয়া আখতার বলেন, ‘এ উদ্যোগ এখনো স্বপ্ননির্ভর (aspirational), বাস্তবমুখী নয়। তবে এটি সার্কের অচলাবস্থায় পাকিস্তানের বিকল্প আঞ্চলিক কাঠামোর ভাবনা স্পষ্ট করে।’

তিনি বলেন, শ্রীলংকা, নেপাল, মালদ্বীপ ও সম্ভবত ভুটান প্রাথমিক আলোচনায় আগ্রহী হতে পারে। তবে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদে অগ্রগতি খুব সীমিত থাকবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সতর্ক করেছে, এ উদ্যোগ এগোলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে এবং চীনের সঙ্গে ভারতের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাও বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপাক্ষিক জোটের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক জোটই বেশি কার্যকর থাকবে। কারণ এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট সুবিধা এবং বাস্তব ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তবে পাকিস্তানের এই উদ্যোগ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে— দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি নতুন শক্তির সমীকরণ গড়ে উঠছে, যেখানে ভারত একচেটিয়া প্রভাব রাখতে আর আগের মতো পারছে না।

[আল জাজিরার দোহার সাংবাদিক উসাইদ সিদ্দিকী। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতি-রাজনীতি নিয়ে তার এ ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধটি শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) প্রকাশিত হয়েছে। রাজনীতি ডটকমের পাঠকদের জন্য সেটি অনুবাদ করে দেওয়া হলো। মূল লেখাটি পড়তে ভিজিট করুন: https://aje.io/83dbss]

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ইতিহাসে বিভ্রান্তি নয়, প্রয়োজন সত্যের স্বীকৃতি

মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঘোষণা বা একটি ঘটনার ফল নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব, প্রেরণা, ত্যাগ ও সাহস— সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস।

৩ দিন আগে

আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় পাকিস্তান জন্মের পরপরই। প্রথমে এমন কথা উচ্চারণ বিপজ্জনক ছিল বলেই এ দেশের মানুষকে প্রথমে ভাষা আন্দোলন ও তারপর স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। একপর্যায়ে স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটি স্বাধীনতার ধারণায় পর্যবসিত হয়।

৫ দিন আগে

আমরা সবাই যখন লুটেরা— একটি আত্মসমালোচনার সময়

গণপরিবহন, শ্রমবাজার, কৃষি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত উৎপাদক বা ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, শ্রমিক তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পান না, কিন্তু মধ্যবর্তী একটি শ্রেণি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লাভবান হয়। এটি একটি অসম অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিফলন।

৬ দিন আগে

আমাদের প্রেস-লেখক-পাঠক প্রস্তুত, এখন সময় নীতিমালা প্রস্তুতের

প্রকাশক ও উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মেহেদী হাসান অমিকন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং বাংলাপ্রকাশ ও লেকচার পাবলিকেশন্স পিএলসির প্রকাশক। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প ও অমর একুশে বইমেলা নিয়ে রাজনীতি ডটকমের মুখোমুখি হয়েছেন জ্ঞান-অর্থনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা মেহেদী হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহরিয়ার শরিফ।

১০ দিন আগে