শান্তিময় বিশ্বের প্রত্যাশায় দাঁড়িয়েছি, হাতিয়ার যুক্তিতর্ক-মানবতা: জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও

জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে শান্তিময় একটি বিশ্বের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলছেন এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজের কথা, যেখানে মারণাস্ত্রের বদলে পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তিতর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা আর মানবতা। শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তিতর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। অন্যের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জাতিসংঘকে দেখতে চায় বাংলাদেশ।

নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোরে) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিসহ নানা বিষয় তুলে ধরেন তিনি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এই প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন। তিনি বাংলাতেই এই ভাষণ দেন।

ভাষণের শুরুতেই একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে, শ্রদ্ধা জানান তাদের প্রতি। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে ভোট দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ায় গণতন্ত্রকামী মানুষদের অভিনন্দন জানান তিনি।

একই পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার এক দুর্লভ নজিরও স্থাপন করেছেন তারেক রহমান। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন তার বাবা প্রয়াত জিয়াউর রহমান, ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

মা-বাবাকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।

বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কিছু ঘটলে প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি তার প্রভাব পড়ে— এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশ অশান্ত। বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে। জ্বালানি নিরাপত্তাসংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আলোচনা ও কূটনীতিকেই হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির অন্তরায় বলে অভিহিত করেন তারেক রহমান। বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় জাতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্ব মানবতা এবং বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারও পুনর্ব্যক্ত করছি।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য- “রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড ন্যাশসনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল”কে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল।

তিনি আরও বলেন, 'পিসবিল্ডিং কমিশনে'র ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement