মানবাধিকার সুরক্ষা প্রশ্নে প্রতিশ্রুত রাখতে পারেনি বিএনপি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানবাধিকার সুরক্ষা প্রশ্নে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, সম্প্রতি এমন তিনটি আইন পাস করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আবারও পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ এ কথা বলেছে। বিবৃতিতে যে তিনটি আইনের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো— জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন ২০২৬। শেষ আইনটির মাধ্যমে বিতর্কিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী এসআরবি গঠন করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলছে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার সুরক্ষায় বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যা নতুন তিন আইন পাসের পর বাতিল হয়ে গেছে। এতে অতীতে ব্যাপকভাবে ঘটে যাওয়া গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ঠেকানোর ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যেখানে গুম প্রতিরোধ ও তদন্ত এবং এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়ার পর তারেক রহমানের সরকার সেই কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করে এবং নতুন আইনে প্রতিষ্ঠানটির তদন্তের ক্ষমতা দুর্বল করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এসআরবি আইনের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের জন্য দায়ী পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি করা হলেও কার্যত কেবল সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনকি সাধারণ পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে যে ধরনের সুরক্ষামূলক নিয়ম প্রযোজ্য হয়, সেগুলো নতুন আইনে রাখা হয়নি বলে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলায়িন পিয়ারসন বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে তদন্ত ও জবাবদিহির বাইরে রাখার নতুন সরকারের যে প্রচেষ্টা, সেটি থেকে এমনটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না যে হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা অতীতের বিষয় হয়ে থাকবে। অতীতে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের সময়েও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঢালাওভাবে আটক করার ঘটনা থামেনি বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি বলছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের দেড় দশকের শাসনামলের তুলনায় হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কিন্তু তারেক রহমানের সরকার তার পূর্বসূরি সরকারের মতোই শত শত কথিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটকে রেখেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করলেও সেটি স্বাধীন ছিল না উল্লেখ করে এইচআরডব্লিউ বলছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। একইসঙ্গে তহবিল সংগ্রহ ও কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি প্রশাসন ওই অধ্যাদেশ বাতিল হতে দিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাদেশের সংসদে বিরোধীদলের ওয়াকআউট সত্ত্বেও গত ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে মানবাধিকার কমিশন নিয়ে নতুন একটি আইন পাস করা হয়েছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। এটি কেবল অভিযুক্ত সংস্থার কাছে একটি প্রতিবেদন চাইতে পারে। যদিও একটি অস্পষ্ট বিধান থেকে মনে হয় যে সংস্থাটি রিপোর্ট দিতে ব্যর্থ হলে বা তাদের প্রতিবেদন সন্তোষজনক বলে বিবেচিত না হলে তখন তারা নিজস্ব তদন্ত শুরু করতে পারবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন আইনের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আবারও ফিরিয়ে আনা, কমিশনের বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা কমানো এবং জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থার মর্যাদা ও স্বাধীনতা অবনমিত করা হয়েছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়েও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে এইচআরডব্লিউ। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ক্ষমতা আর নেই। এখন গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সংস্থার পরিবর্তে অন্য একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে সরকার।
অধ্যাদেশে কোনো গোপন আটককেন্দ্র আছে বলে সন্দেহ হলে সেখানে নজরদারি, পরিদর্শন ও তদন্ত করার ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ক্ষমতাগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির ওপর ভিত্তি করে রাখা আইনি কাঠামোতে এমন কর্মকর্তাকে দায়ী করা যেত, যিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন বা যার জানা উচিত ছিল এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেননি। এখন এ ধরনের কোনো ঘটনায় কমান্ডিং অফিসারকে দায়ী করতে সরাসরি আদেশের প্রমাণ প্রয়োজন হবে।
এদিকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত পুলিশের বিশেষ বাহিনী র্যাব গত ১০ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাহিনীটি আসলে বিলুপ্ত করা হয়নি, বরং নাম পরিবর্তন করা হয়েছে মাত্র। নতুন আইন অনুযায়ী, বিলুপ্ত হওয়া র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, নথিপত্রসহ যাবতীয় সম্পত্তি নতুন বাহিনী স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বিবৃতিতে বলেছে, এমনকি লোগোটিও একই থাকছে। শুধু ‘আরএবি’র দুটি অক্ষর বদলে ‘এসআরবি’ লেখা হয়েছে। অথচ বিএনপি নিজেও এর আগে র্যাব ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, মানবাধিকারের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন ও অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নতুন নামকরণ করা সংস্থাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও দেশটির নতুন সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নীতিমালা নিয়ে জোরালো উদ্বেগ প্রকাশ করা উচিত বলেও মনে করে মানবাধিকার সংস্থাটি।
ইলায়িন পিয়ারসন বলেন, ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী একটি সরকারকে উৎখাত করতে বিক্ষোভকারীরা জীবন বাজি রাখার পর তারেক রহমান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। নতুন সরকার যে এত দ্রুত নিপীড়নমূলক পথ অনুসরণ করছে, সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এর পরিণতি কী হতে পারে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

















-2e9586-256x144.webp)

