মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস, ‘দুর্বল আইনের অংশ হয়নি’ বিরোধী দল

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে ‘দুর্বল’ আইন পাসের জন্য মানবাধিকার কমিশন বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপনের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিল দুটি পাস হয়। এর মধ্যে গুমের ফলে মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার কিংবা পাঁচ বছর পার হলেও জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আইনটা পড়লে দেখা যাবে, এখানে মানবাধিকার কমিশনের হাতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া আছে। সেই ক্ষতিপূরণ যদি না দেয়, সে ক্ষেত্রেও বলা আছে, পাবলিক ডিমান্ড রিকভাবরি অ্যাক্টে সেই ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে। আমরা মনে করি, এই বিলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কনসাল্ট করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।
অন্যদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আগের অধ্যাদেশকে শক্তিশালী করে এই বিল আনা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটিও শক্তিশালী করে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আমরা গুমের এই প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে এসেছি।’
তবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে যখন বিলগুলো বাতিল করা হয়, তখন বলা হয়েছিল যে অত্যন্ত শক্তিশালী ও আরও ভালো আকারে তারা নিয়ে আসবে। মানবাধিকারসংক্রান্ত যে বিলটা এসেছে, সেখানে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনকে একটা ইউনিফর্ম অথরিটি দেওয়া হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মানবাধিকারসংক্রান্ত বিলে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যদি কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি তার তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু আইনের দ্বৈত প্রয়োগ হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী রাষ্ট্রের কর্মচারী, কিন্তু তারা এ দেশের নাগরিক। একই অপরাধে একজনের জন্য সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আরেক জায়গায় আটকা পড়ে যাবে— এটা হতে পারে না।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুর্বল আইন পাস করার অংশীদার আমরা হব না। আমরা এই আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি।’
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও বলেন, ‘ওয়াকআউট করার জন্য আপনাদেরও ধন্যবাদ।’ পরে বিল দুটি কণ্ঠভোটে পাস হয়
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে যা আছে
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও আমলযোগ্য এবং জামিন ও আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গুমের সাধারণ অপরাধের জন্য ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কিংবা কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে এবং স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করে অথবা তার অবস্থান গোপন রাখলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।
গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বিলে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনী কিংবা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দিতে পারবে।
গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার ও ডিজিটাল সাক্ষ্য নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিলে গুমের মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আদালতের কাছে অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক বলে প্রতীয়মান হলে অভিযোগকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন আদালত। একই সঙ্গে অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে যা আছে
এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে বলা হয়েছে, একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী ও একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকবেন।
চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি বাছাই কমিটি থাকবে। এতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য; মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক; রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি; জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তার মনোনীত সাংবাদিক প্রতিনিধি; এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি থাকবেন।
বিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদা পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।
প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট হলে আর কোনো উদ্যোগ নেবে না। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ করতে পারবে। ওই সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে জানাবে।




















