নামের মিলে ১ বছর অন্যের সাজা ভোগ, অবশেষে মুক্তি পাচ্ছেন আলমাস

দুই যুগ আগে করা অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছের পরিবর্তে গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। নামের মিলের কারণে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রায় এক বছর কারাভোগের পর রোববার (৮ নভেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঁইয়ার বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার দোহার উপজেলার সুন্দরীপাড়া গ্রাম থেকে আলমাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরদিন তাকে আদালতে পাঠানো হলে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করে কারাগার থেকেই হাই কোর্টে রিট করেন আলমাস। প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর আদালত চার সপ্তাহের রুল জারি করেন।
রুলে জানতে চাওয়া হয়, প্রকৃত আসামির পরিবর্তে আলমাসকে গ্রেপ্তার ও আটকে রাখার ঘটনাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং তাকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে দুই ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে সহযোগিতা করতে বলা হয় দোহারের ইউএনও ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারকে।
আদালতের নির্দেশে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে অনুসন্ধান করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান। গত ১ নভেম্বর জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছ এবং গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। আত্মীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ। মহিউদ্দীন মো. হানিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে পরিচয় বিভ্রাট বলে উঠে এসেছে। নাম ও বাবার নামের প্রায় মিল থাকলেও মা ও দাদার নামসহ অন্যান্য পরিচয়ে দুজনের পার্থক্য রয়েছে। আরও সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত হলে শুরুতেই তা শনাক্ত করা সম্ভব হতো।
ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ৩ কারণ
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আলমাসকে ভুল করে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো দুই ব্যক্তির গ্রামের নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের মিল এবং ২০০২ সালের মামলার নথিতে ঠিকানা লেখার ভুল। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের আদি গ্রাম ঢাকার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর। অন্যদিকে আলমাসের পরিবারের আদি গ্রাম একই উপজেলার দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা।
২০০৭ সালের আগে আলমাসের পরিবার সেখানে বসবাস করত। নদীভাঙনের কারণে ওই বছর তারা সুন্দরীপাড়ায় চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীনে পূর্ব ধোয়াইরসহ একাধিক গ্রাম রয়েছে। ডাকঘরের নাম ব্যবহার করে ঠিকানা লেখার প্রচলন থাকায় দুই ব্যক্তির ঠিকানায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ২০০২ সালের অস্ত্র মামলার এজাহার ও এফআইআরে আলমাছের ঠিকানা ছিল পূর্ব ধোয়াইর।
তবে আদালতে পাঠানোর ফরওয়ার্ডিংয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এস এম মোস্তাক হোসেন ঠিকানা লেখেন ‘দক্ষিণ বাররা’। ২০০৪ সালের ৬ অক্টোবর রায়-পরবর্তী গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও একই ভুল ঠিকানা রাখা হয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে তদন্ত কর্মকর্তার ‘অসতর্কতা’ এবং ‘বিভ্রান্তির বীজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ২০০২ সালের ১৪ অগাস্টের ওকালতনামা ও ২০০৩ সালের ২০ এপ্রিল হাই কোর্টের জামিন আদেশে ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইর লেখা ছিল।
বাবার নামের মিলও পরিচয় শনাক্তে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন নথিতে প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান, খলিল আহমেদ ও আবুল খায়ের (খলিল) পাওয়া গেছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। দুই ব্যক্তির বাবার নামের এই সাদৃশ্য ভুল গ্রেপ্তারের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গ্রেপ্তারের দিনই পরিচয় নিয়ে আপত্তি
অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বিকাল ৩টার দিকে দোহার উপজেলার চর মোহাম্মদপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জুবাইদুল হক সুন্দরীপাড়া গ্রাম থেকে আলমাসকে গ্রেপ্তার করেন। ওই সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পুলিশকে জানান, আলমাস প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। তাদের বক্তব্য ছিল, প্রকৃত আসামির পরিবারের সঙ্গে আলমাসের পরিবারের পরিচয়ের পার্থক্য রয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর এসআই জুবাইদুল হক আলমাসের জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দোহার থানার ওসি মো. হাসান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান। ছবি ও পরিচয়পত্র যাচাই-বাছাই করার পরও তাকে আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া জবানবন্দিতে এসআই জুবাইদুল হক বলেন, পরিচয়ের বিষয়টি তিনি ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন।
পুলিশ ফাঁড়ির জিডি নম্বর ৮৪-তে ঘটনাটি নথিভুক্ত করার পর ৪ নভেম্বর আলমাসকে দোহার থানা হেফাজতে রাখা হয়। পরদিন ৫ নভেম্বর তাকে আদালতে পাঠানো হলে কারাগারে পাঠানো হয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের দিনই মাঠপর্যায়ে পরিচয় বিভ্রাটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল। কিন্তু নির্দেশের দোহাই দিয়ে তা উপেক্ষা করা হয়। দুই জনপ্রতিনিধির জবানবন্দিতেও পুলিশ উপরের নির্দেশের কথা বলেছিল।
আলমাস তার জবানবন্দিতে জানান, জবানবন্দি দেওয়ার সময়ের প্রায় নয় বছর আগেও একই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ বাড়িতে গিয়েছিল। তখন এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। তাদের বক্তব্য শুনে পুলিশ সেবার ফিরে যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একই মামলায় তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।
২ ব্যক্তির পরিচয়ে যেসব পার্থক্য
দুই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করতে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সাতজনের জবানবন্দি নিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দুই এলাকার জনপ্রতিনিধি, আলমাসের বাবা ও স্ত্রী, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের দুই আত্মীয় এবং গ্রেপ্তারকারী পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া আলমাসের নিজের বক্তব্য ও ডাকঘরের পোস্টমাস্টারের লিখিত প্রত্যয়নও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দুই ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয়ের পার্থক্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের দাদার নাম শেখ শহর আলী। নাগরিক সনদ, তার বাবার ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের লাইসেন্স এবং চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেনের জবানবন্দির সঙ্গে মিলিয়ে এ পরিচয় পাওয়া গেছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের দাদার নাম শেখ নওয়াব আলী। একইভাবে আলমাছের মায়ের নাম সালমা আক্তার বলে তার দুই আত্মীয় জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে আলমাসের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে তার মায়ের নাম রওশনারা বা রাসনারা বেগম উল্লেখ রয়েছে। ভাইবোনের সংখ্যাতেও দুই পরিবারের পার্থক্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ তিন বোনের একমাত্র ভাই। তার বোনদের নাম রেখা, লিপি ও শিল্পি। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের দুই ভাই সেলিম ও আলামিন এবং দুই বোন আসমা ও নাজমা।
আলমাছের চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন ও আত্মীয় কাউসার মাহমুদ পারিবারিক পরিচয়, ভাইবোনের নাম এবং অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ বর্তমানে কানাডায় তার বোন রেখার সঙ্গে থাকেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আত্মীয়দের দেওয়া এসব তথ্যও দুই ব্যক্তির পরিচয় আলাদা করতে ব্যবহার করা হয়েছে।
২০০২ সালের অস্ত্র মামলা
রিট আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল বিকাল ৩টার দিকে মিরপুরের হাজী রোড থেকে এসআই ইকবাল হায়াত মো. আলমাছ ও নাজমুল আলম মামুনকে গ্রেপ্তার করেন। এজাহারে বলা হয়, আলমাছের ডান কোমরে গোঁজা অবস্থায় একটি ৩২ বোরের রিভলবার পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের ২০ এপ্রিল হাই কোর্ট থেকে জামিন পান আলমাছ। তবে বিচার চলাকালে তিনি পলাতক হন। ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০০২ সালে আলমাছকে গ্রেপ্তারকারী এসআই ইকবাল হায়াত এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এস এম মোস্তাক হোসেনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের কোনো ছবি বা হস্তাক্ষর কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আলমাসের রিট আবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে রাখার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত, তাকে আদালতে হাজির করা, তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কারও দায়ও নির্ধারণ করা হয়নি। পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদনসহ রিট মামলার রুল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। রোববার হাই কোর্ট আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।











-369d59-256x144.webp)
-350d76-256x144.webp)

