প্রতিদিন প্রাণহানি, তবু ফাইলবন্দি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের উন্নয়ন

সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার, কক্সবাজার
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৩: ৪৩
মৃত্যুর করিডোরে পরিণত চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক। ছবি: রাজনীতি ডটকম

চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক এখন যেন নীরব এক মৃত্যুকূপ। গত ১১ মাসে ১৫৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৫০ জন, আহত হয়েছে ৩৫১ জন। অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, লবণাক্ততার কারণে পিচ্ছিল অবস্থা, ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য— সব মিলিয়ে মহাসড়কটি পরিণত হয়েছে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রুটে। আর এ পরিস্থিতির প্রতিবাদেই সম্প্রতি চকরিয়ার মাতামুহুরী সেতু এলাকায় তিন ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচিতে ফেটে পড়ে স্থানীয় জনতা।

‘চট্টগ্রাম–কক্সবাজার সড়ক উন্নয়ন আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সেতুর দুপাশে রশি দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কোনো গাড়িই যেতে দেওয়া হয়নি। সেতুর ওপর ব্যানার-ফেস্টুন, স্লোগানে মুখর জনতা, সবার একটিই দাবি— মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করতে হবে অবিলম্বে। দীর্ঘ যানজটে পর্যটকসহ সাধারণ যাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। অনেককে পায়ে হেঁটে অবরোধ এলাকা অতিক্রম করতে দেখা যায়। শেষে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তিন ঘণ্টা পর অবরোধ তুলে নেয় আন্দোলনকারীরা।

অবরোধে অংশ নেওয়া মানুষের বক্তব্যে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। খুরুশকুলের রফিক আহমদ বলেন, “আমরা এই সড়ক দিয়ে ঘর থেকে বের হলে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি না, আবার ফিরতে পারব কি না। প্রতিদিনই ২-৩ টা দুর্ঘটনার খবর শুনি।” ঈদগাঁর ইয়াছিন আরাফাতের অভিযোগ, “বাংলাদেশের আর কোথাও মহাসড়কে এতো ৩ চাকার গাড়ি চলে না। এগুলো সরাতে না পারলে দুর্ঘটনা কমবে কীভাবে?”

অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য। ছবি: রাজনীতি ডটকম
অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য। ছবি: রাজনীতি ডটকম

চকরিয়ার ইদ্রিস আলী বলেন, “রাস্তা সরু, বাঁক বেশি, লবণবোঝাই ট্রাক থেকে পানি পড়ে রাস্তা পিচ্ছিল— সব মিলিয়ে ভয়ংকর অবস্থা।” একই অভিযোগ বাসচালক রহিম উদ্দিন ও স্থানীয় মোহাম্মদ সাইফেরও। তাদের অভিযোগ, মহাসড়কজুড়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, নিষিদ্ধ ইজিবাইক ও সিএনজি আধিপত্য বিস্তার করলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।

হাইওয়ে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জিয়া উদ্দিন জানান, যানবাহনের গতি ৭০–৮০ কিলোমিটারের বেশি হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ ৩ চাকার গাড়ির বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে। তবে চার কিংবা ছয় লেনে উন্নীত না হলে দুর্ঘটনা কমানোর চেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ। বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “যানবাহনের চাপ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, এই সড়ক অবিলম্বে ৬ লেনে উন্নীত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।”

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। এখন ফাইনাল রিপোর্টের অপেক্ষা চলছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিদিন ৩০–৩৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে এই মহাসড়ক দিয়ে, অথচ ধারণক্ষমতা মাত্র ১২–১৫ হাজার। লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, পটিয়া, চকরিয়া, রামু— এসব অংশে যানবাহনের চাপ ও ওভারটেকিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়। সওজ ইতোমধ্যে ২১টি স্থানকে ‘হাই রিস্ক জোন’ হিসেবে শনাক্ত করেছে।

১৯৮০-এর দশকে নির্মিত এই সড়ক তখনকার যানবাহনচাপের তুলনায় এখন বহুগুণ বেশি চাপ বহন করছে। অভিযোগ রয়েছে— চলতি বছর ছোট ছোট দুর্ঘটনা মিলিয়ে প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা ২০০–এর কাছাকাছি। গত ৫ নভেম্বর চকরিয়ায় একটি মাইক্রোবাস ও মারছা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। দুর্ঘটনার দুই মাস আগেই মারছা পরিবহনের ওই বাসটির রোড পারমিট শেষ হয়েছিল। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা প্রকাশ করে।

গত তিন বছরে লোহাগাড়ায় ১১ বার, চকরিয়ায় ৮ বার, কক্সবাজারে ৭ বার এবং রামুতে ৫ বার রাস্তা অবরোধ, মানববন্ধন ও গণসমাবেশ হয়েছে। জনতার দাবি একটাই— ছয় লেন ছাড়া বিকল্প নেই। একই পরিবারের পাঁচজন পর্যটক নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামের চেরাগি পাহাড় এলাকায়ও রাস্তায় নামে মানুষ। তাদের বক্তব্য— এই সড়কে প্রতিটি দিন মানেই মৃত্যুর শঙ্কা।

অন্যদিকে পরিবেশগত উদ্বেগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চুনতি অভয়ারণ্য, মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ও ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ১৩ দপ্তরে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বেলা (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি)। বন বিভাগও স্পষ্ট জানিয়েছে, বনের ভেতর দিয়ে সড়ক সম্প্রসারণ নয়; প্রয়োজনে আন্ডারপাস বা উড়ালসড়ক করা হোক, কিন্তু বনভূমি কাটা যাবে না।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ধীরগতি নিয়ে হতাশা বাড়ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুমোদন পাওয়া ‘চট্টগ্রাম–কক্সবাজার হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট–১’–এ চার লেন বাইপাস, ছয় লেন ফ্লাইওভারসহ ২৩.৫২ কিলোমিটার উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা থাকলেও এক বছরে টেন্ডার পর্যন্ত আহ্বান করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধীরগতি শুধু মানুষের জীবনই ঝুঁকিতে ফেলছে না, জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুতর প্রভাব ফেলছে। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালামাল পরিবহন, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রম— সবই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল।

ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাম্প্রতিক মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনশহরের প্রধান প্রবেশপথ যদি মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়, তবে দেশের উন্নয়নই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরিদ উদ্দিন খান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা শুধু সময়ের দাবি নয়— এটি জীবনরক্ষার প্রশ্ন।”

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারবাসীর প্রশ্ন, উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল আগে নড়বে, নাকি এই মহাসড়কে একের পর এক লাশ পড়তে থাকবে? মানুষের কাছে মৃত্যুর মিছিল আর প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কোনো ব্যাখ্যাই আর গ্রহণযোগ্য নয়।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারে একমত বাংলাদেশ-রাশিয়া

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ড. খলিলুর রহমানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের আমন্ত্রণে তিন দিনের সরকারি সফরে তিনি রাশিয়া যান।

১৩ ঘণ্টা আগে

নতুন উপাচার্য পেল ৪ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়েছে, যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর কিংবা নবনিযুক্ত উপাচার্যদের অবসর গ্রহণের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যেটি আগে হবে, সে পর্যন্ত তাদের নিয়োগের মেয়াদ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে উপাচার্যদের সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রজ

১৩ ঘণ্টা আগে

এনসিটিবি ও ৫ শিক্ষা বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান

এ ছাড়া ঢাকা, যশোর, রাজশাহী ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডেও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডেও।

১৪ ঘণ্টা আগে

কর্মবিরতি প্রত্যাহার, মঙ্গলবার কাজে ফিরছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

বৈঠক শেষে সোমবার (৮ জুন) রাতে সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং ইন্টার্ন ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা এক যৌথ ঘোষণায় এ কথা জানান। কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের ভাতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ ছয় দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকরা।

১৬ ঘণ্টা আগে