বাংলা একাডেমিতে অধ্যাপক ফজলুল হককে শেষ শ্রদ্ধা, মরদেহ শহিদ মিনারে

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বাংলা একাডেমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত
বাংলা একাডেমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্যসমালোচক ও সমাজবিশ্লেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। সোমবার সকালে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলা একাডেমিতে কফিনবন্দি মরদেহ আনা হলে সহকর্মী, শিক্ষার্থী, লেখক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হয়।

বাংলা একাডেমির প্রয়াত এই সভাপতিকে স্মরণ করে সহকর্মীরা তার কর্মময় জীবন, চিন্তা-চেতনা ও সমাজের প্রতি অবদানের কথা তুলে ধরেন।

বাংলা একাডেমির পাশাপাশি জাতীয় কবিতা পরিষদ ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মনসুর মুসা, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, গবেষক সাইমন জাকারিয়া, কবি সরকার আমিনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন দেশের অন্যতম প্রজ্ঞাবান বুদ্ধিজীবী। আমৃত্যু তিনি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, সমাজসচেতন ও স্বাধীনতাকামী একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে কাজ করে গেছেন। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিজের শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক ফজলুল হককে স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনের শুরুতেই তিনি তার ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে দায়িত্বশীল সরকারি পদে থাকাকালেও সুযোগ পেলেই স্যারের কাছে ছুটে যেতেন। তার ভাষায়, ‘স্যারের কাছে বসলেই মনে হতো যেন এক শান্তিময় বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে আছি। তিনি সবসময় দেশ, মানুষ এবং শোষিত মানুষের সংগ্রামের কথাই বলতেন।’

মন্ত্রী ২০১৫ সালে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হামলায় নিহত অধ্যাপক ফজলুল হকের একমাত্র ছেলে, জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এমন নির্মম ঘটনার পরও অধ্যাপক ফজলুল হক প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্রীয় বিচারও দাবি করেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের দেশের জন্য আমি তাকে উৎসর্গ করে দিলাম।’ মন্ত্রীর ভাষায়, এমন ধৈর্য, স্থিরতা ও মানবিক উচ্চতার মানুষ এই দেশে তো বটেই, পৃথিবীতেও খুব বিরল।

অধ্যাপক ফজলুল হকের স্মৃতি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, তার অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছেন। তার আদর্শ ও স্মৃতিকে অম্লান রাখতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যা যা করা প্রয়োজন, তা করা হবে।

জাতীয় শোকসভা ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক, চিন্তক ও সাহিত্যসমালোচক। বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আনুষ্ঠানিক প্রয়োজন ছাড়াও তিনি প্রায় নিয়মিত একাডেমিতে আসতেন। এখানে বসেই লেখালেখি করতেন, মতবিনিময় করতেন এবং দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।

তিনি আরও বলেন, একাডেমির বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যাপক ফজলুল হক নিয়মিত কল্যাণকামী ও আদর্শভিত্তিক পরামর্শ দিতেন, যা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মোহাম্মদ আজম জানান, তার প্রয়াণের পর এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে তার রচনাসমগ্র পাঠ, মূল্যায়ন এবং তার আদর্শিক জীবনচর্চাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ লক্ষ্যে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে শিগগিরই একটি জাতীয় শোকসভার আয়োজন করা হবে।

তিনি বলেন, পরবর্তী পর্যায়ে অধ্যাপক ফজলুল হকের জীবন, কর্ম ও চিন্তাধারা নিয়ে একটি বিস্তারিত ও মানসম্মত স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে তার সামগ্রিক অবদান মূল্যায়নের পাশাপাশি বিভিন্নজনের স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি স্থান পাবে।

মহাপরিচালকের ভাষায়, সারাজীবন তিনি সাহিত্যতত্ত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ নিয়ে লিখেছেন। তার গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক মূল্যবোধ সমাজে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলেই তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজা শেষে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হয়।

সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। পরে দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে তাকে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement