দুই দিনের বৃষ্টিতে ফের ডুবল হাওর, পানির নিচে কৃষকের শেষ সম্বল

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
দুই দিনের টানা বর্ষণে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকার ধানের জমি এবং গ্রামীণ সড়কগুলো ফের পানিতে তলিয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত

আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও গত দুই দিনের টানা বর্ষণে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকার ধানের জমি এবং গ্রামীণ সড়কগুলো ফের পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন হাওরে এখনও প্রায় ৫০ একর জমি সম্পূর্ণ পানির নিচে রয়েছে, যার সিংহভাগই বর্গা চাষিদের। রোববার সকাল থেকে শুরু হয়ে সোমবার পর্যন্ত চলা প্রবল বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার কারণে তলিয়ে যাওয়া এই ধান কাটার আর কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না স্থানীয় কৃষকরা।

মাঠে ফসল হারিয়ে উপজেলার শত শত প্রান্তিক ও বর্গা চাষি এখন সর্বস্বান্ত। এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যারা চাষাবাদ করেছিলেন, ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। সামনে কোরবানির ঈদ থাকলেও হাওরপাড়ের এসব কৃষক পরিবারে নেই কোনো আনন্দ। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ হবে— এই চিন্তায় কাটছে তাদের দিন।

এদিকে হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র গো-খাদ্যের সংকট। ধানের খড় ও খেতের ঘাস পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এই সুযোগে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অল্প দামে গরু, মহিষ ও হাঁস কিনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে হাঁসের প্রধান খাদ্য ধান হওয়ায়, খেত তলিয়ে যাওয়ায় হাঁসের খামারিরাও লোকসানের মুখে পড়ে কম মূল্যে খামারের হাঁস বিক্রি করে দিচ্ছেন।

মিঠামইনের ঘাগড়া গ্রামের আদর্শ কৃষক শরিফ ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেন, ‘২ দিনের মেঘে যে খেতগুলো ভাসা আছিন হেই খেত অহন কোমর পানির তলে গেছে গা, আর আশা নাই। গরুরও খাওন নাই, গরু বেইচ্চা নিজে খামু না ঋণ দিমু?’ তিনি মিঠামইনের বেরি বিলে ১ একর ৫০ শতাংশ ও কড়কইরা বিলে ৫০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছিলেন, যার এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। প্রতিদিন স্থানীয় বাজারে দুধ বিক্রি করে সংসার চালানো এই কৃষক এখন বাধ্য হয়ে নিজের ৬টি গরুই বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

একই অবস্থা ফোরদিঘা হাওরের কৃষক মামুন মিয়ার। তিনি জানান, ৫০ শতাংশ জমির এক শতাংশও কাটতে পারেননি। খেত এখন এক হাত পানির নিচে। পাঁচটি গরু নিয়ে বিপাকে পড়া মামুন বলেন, ‘গরুর বন (খড়) নাই। ঈদের আগে গরু বেইচ্চা ঋণ শোধ করমু, এরপর ঢাকা যাওন ছাড়া কোনো গতি নাই।’

বাজারের পিঠা বিক্রেতা আঙ্গুর মিয়া ঋণ করে বেহির হাওরে ৩ খানি জমি চাষ করেছিলেন। মাত্র এক খানি জমির ধান কাটতে পারলেও বৈরী আবহাওয়ায় তা শুকাতে না পেরে নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ঋণ দিবার ক্ষমতা নাই, ঈদ আইছে পুলাপাইনরে কী বুঝ দিমু? অহন দেশ ছাড়ন ছাড়া উপায় নাই।’

একইভাবে ফসল হারিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেন নৌপোষা ও সিনাই বিলের কৃষক ডালিম মিয়া এবং বেরি, চপ্টা ও কাশিদ্দাপুড়া হাওরে ১০ একর জমিতে চাষ করা ঘাগড়া গ্রামের মুদি দোকানি রুবেল মিয়া। রুবেল জানান, অর্ধেক ধান কাটার পর বাকি খেত তলিয়ে গেছে। এখন হারভেস্টার মেশিন নামানো যাচ্ছে না, আর দিনমজুর পাওয়া গেলেও তারা আড়াই হাজার টাকা দৈনিক মজুরি চাচ্ছেন। পচা ধান ঘরে তুলে কোনো লাভ নেই দেখে তিনি খেতের ধান কাটার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

এদিকে সরকারি সহায়তার তালিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ কৃষকরা। পূর্ব অষ্টগ্রামের বড় হাওরের কৃষক মনু মিয়ার অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম তালিকায় উঠছে না। স্থানীয় প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিরা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছেন।

এ বিষয়ে মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু জানান, হাওরের অধিকাংশ ধান কাটা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে বর্তমানে যেগুলো নিচু এলাকায় সামান্য পরিমাণে পানিতে তলিয়ে রয়েছে, শ্রমিক ও হারভেস্টার সংকটের কারণে সেগুলো আর কাটা সম্ভব হচ্ছে না। আবহওয়া ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তালিকা প্রণয়নে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই।’

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

রাজশাহী থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ, চরম দুর্ভোগে যাত্রীরা

এ দিন সকাল থেকেই রাজশাহীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেলেও কোনো বাস নির্ধারিত রুটে ছেড়ে যায়নি। কাউন্টারগুলোতেও ছিল অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার চিত্র। বিশেষ করে আসন্ন ঈদুল আজহার আগে এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

১ দিন আগে

কিশোরগঞ্জে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর বাজার, প্রস্তুত প্রায় ২ লাখ গবাদিপশু

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার কিশোরগঞ্জে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৪০৬টি গবাদিপশু। এর বিপরীতে জেলার মোট চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ১৮৫টি পশুর। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত থাকবে প্রায় ৩৯ হাজার ২২১টি পশু।

১ দিন আগে

আত্মীয়ের বাসা থেকে ৮ মাসের সন্তানসহ দম্পতির মরদেহ উদ্ধার

মাদারীপুর শহরের একটি বাসা থেকে স্বামী–স্ত্রী ও তাদের আট মাস বয়সী শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার দিবাগত রাতে শহরের আমিরাবাদ এলাকা তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন সদর উপজেলার কলাগাছিয়া এলাকার চিন্ময় দাস (৪০), তার স্ত্রী ইশা দাস (২৫) এবং তাদের আট মাস বয়সী সন্তান।

১ দিন আগে

তনু হত্যা মামলা: পোশাকে মিলল অজ্ঞাতনামা ৪র্থ ব্যক্তির ডিএনএ

রোববার (১৭ মে) রাত পৌনে ১১টার দিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই ঢাকা কার্যালয়ের পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানান, এর আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়ার তথ্য দিয়েছিল। নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষায় আরও একজন পুরুষের রক্তের নমুনা শনাক্ত হয়েছে।

১ দিন আগে