শামীমের বিরুদ্ধে ‘মবে’ নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার জামায়াতের

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দফায় দফায় মারধরের শিকার ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে মনে করছে তার পরিবার। উসকানিমূলক ভিডিও ছড়িয়ে শামীমের বিরুদ্ধে মানুষজনকে ক্ষেপিয়ে তোলার কাজে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ তার পরিবারের সদস্যদের।
স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পরে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের দপ্তর থেকেও গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াতের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দফায় দফায় মারধরের শিকার হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফের মারধরের পর রাতে মৃত্যু হয় শামীমের। বুধবার ও বৃহস্পতিবার দিনভর এ নিয়ে অনলাইন-অফলাইনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে মারধর করছে— এমন খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ওসি বলেন, ‘রাত সাড়ে ৮টায় উত্তেজিত জনতা বলেন আর তৌহিদী জনতা, যে নামেই হোক, তারা এসে আবার মারধর করে।’ পরে অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া শামীমকে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগর বিবিসি বাংলাকে বলেন, উসকানিমূলক একটি ভিডিও দিয়ে মানুষকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে ইচ্ছাকৃতভাবে, পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আইন যদি তাকে শাস্তি দিত, আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু আমার ভাইকে এভাবে বিনা বিচারে পিটায় মারবে কেন?
শামীমকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করেন সাগর। তার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সোমবার প্রথম দফায় তাদের বাড়িতে হামলা করা হয়। স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মী লোকজন জড়ো করে মব তৈরি করে বলে দাবি করেন তিনি।
সাগর বলেন, বাসায় যেদিন প্রথম হামলা হয়, সেদিন যারা আসছিল তারা সবাই জামায়াতে ইসলামের সমর্থক ও কর্মী। মাঠপর্যায়ের যারা স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সভাপতি, সেক্রেটারি— এককথায় ওনাদের কমিটিতে যারা আছে সবাই আসছিল। এরা যখন প্রথম হামলা করে, আমাদের বাজারে জামায়াতের যে অফিস আছে, ওখানে সংগঠিত হয়ে ওখান থেকে এসেই প্রথম হামলা করা হয়।
সাগরের এ দাবি অস্বীকার করে ২ নম্বর পারুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী বলেন, শামীমের বাড়িতে বউ নিয়ে গ্যাঞ্জাম হয়। ও রসুল ও আল্লাহর নামে কটূক্তি করে। এটা মোটামুটি আমাদের মাঠঘাটে ভাইরাল হয়ে যায়।
পরে শামীম বিষ খেলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কামরুল ইসলাম দাবি করেন, সেখানে তাকে মারধর করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ তারে মারধর করে। এই পর্যন্ত জানি আমরা।’ মারধর করা লোকজনের মধ্যে জামায়াতের কেউ ছিল কি না— এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এলাকার সবাই ছিল।’
শামীমের পরিবারের দাবি, সোমবার বাড়িতে হামলার পর রাতে বিষ পান করেন শামীম। পরিবারের সদস্যরা তাকে স্থানীয় এক ডাক্তারের চেম্বারে নেন। চিকিৎসক তার অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানান। মঙ্গলবার বিকেলে সেই ডাক্তারের চেম্বারে চড়াও হয় মব। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তৃতীয় দফায় সেখানে গিয়েও তার ওপর আরেক দফায় হামলা চালানো হয়। পরে পুলিশ তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নিলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলামীও। কোনো ধরনের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাক্ষিত। এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু তদন্তের আগেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জামায়াতে ইসলামীকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তার বিচার করার দায়িত্ব আইন ও আদালতের, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা কাউকে গণপিটুনি দিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে শাস্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার। বলেন, জামায়াতে ইসলামী এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না।

-dbb093.jpg)









-b446b8-256x144.webp)






