জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে সেনাবাহিনী, জাসদের দাবি সঠিক নয়: সাখাওয়াত

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২১: ৩৫
শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বন্দিদশা থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধারের কৃতিত্ব ‘জাসদের নয়’ বলে দাবি করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তার ভাষ্য, ওই দিন টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে। এ কাজে তৎকালীন কর্নেল মহিউদ্দীন নেতৃত্ব দেন। ফোর বেঙ্গলও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।

শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাসদের বয়ান হচ্ছে, তারাই জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু এই বয়ান সঠিক নয়। জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি। এ কাজে নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন কর্নেল মহিউদ্দীন। ফোর বেঙ্গলও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।”

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত বলেন, সেদিন ভোর ৬টার দিকে তিনি টু ফিল্ডে গিয়ে দেখেন, জিয়াউর রহমান ইউনিটটির অধিনায়কের কার্যালয়ে বসে আছেন। তার পাশে ছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স (ডিএমও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরউদ্দীন খান।

এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর কর্নেল তাহের গণবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে টু ফিল্ডে যান। সেখানে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার কথা হয়। তাহের জিয়াকে তাদের সঙ্গে যেতে এবং সৈনিকদের সামনে ২১ দফা বা ১৭ দফা দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলতে বলেন। তবে জিয়াউর রহমান তাতে রাজি হননি।

সাখাওয়াতের ভাষ্য, জিয়াউর রহমান আগেই রেডিও ও টেলিভিশনে নিজের বক্তব্য পাঠিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে কোথাও যেতে অস্বীকৃতি জানান।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমানকে একবার বাইরে নিয়ে যেতে পারলে তিনি আর ফিরে আসতেন না। এতে কর্নেল তাহের ও জাসদের একাংশ নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারত,”

উদ্ধার অভিযানে দুটি সামরিক ইউনিটের ভূমিকার কথা তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “ওই দুটি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা তাকে অন্য কোথাও যেতে দেননি এবং টু ফিল্ড তাকে আগেই উদ্ধার করে নিয়ে আসে।”

৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের সময়কার কিছু ঘটনা এখনো রহস্যাবৃত বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ওই উত্তাল সময়ে কর্নেল হুদা কেন সম্পূর্ণ একটি ব্যাটালিয়ন (১০ বেঙ্গল) নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন, তা আজও বড় রহস্য।”

জিয়াউর রহমানের সাহসিকতা ও নেতৃত্বের প্রশংসা করে সাখাওয়াত বলেন, “জিয়াউর রহমানের সততা ও সাহসিকতা ছিল অনন্য। তিনি হকি মাঠে লোডেড রাইফেল হাতে থাকা উচ্ছৃঙ্খল ট্রুপসদের সামনে নির্ভয়ে দাড়িয়ে তাদের শান্ত করেন। তার মনে কোনো প্রতিশোধস্পৃহা ছিল না।”

খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও হায়দারকে বাঁচাতে জিয়াউর রহমান নওয়াজেশ উদ্দিনকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সাখাওয়াত বলেন, “সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে মেজর জিয়া রিকনসিলিয়েশন বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন।”

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গ টেনে সাখাওয়াত বলেন, ভারতকেন্দ্রিক নীতি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সূচনা করেন। প্রথম দেশ হিসেবে চীন সফর করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি আল কুদস কমিটিতে ভূমিকা রাখেন।

নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আজ পর্যন্ত ঠিক করতে পারিনি। আমরা অনেক বছর ভারতকেন্দ্রিক থেকেছি। আমি কেন পাশ্ববর্তী ভারতে দায়ী করব, ভারতীয় হলে আমিও তাই করতাম।”

ইরানের প্রসঙ্গ টেনে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “যদিও ইরানের সাথে আমাদের তুলনা চলে না, কিন্তু আমাদের উচিত তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া।”

স্বাধীনভাবে জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদেরও শর্তযুক্ত বিদেশি ঋণ পরিহার করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং স্বাধীনভাবে জাতীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

গত ১৫ বছরে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সাখাওয়াত। তার মতে, দেশকে শক্তিশালী করতে হলে সেনাবাহিনীকে আবারও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে হবে।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ভূরাজনীতি গবেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আমিনুল করিম, রাওয়া চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. দেলোয়ার হোসেন খান।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad