যুদ্ধ শেষ করতে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমাতে হবে: জে ডি ভ্যান্স

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আলাস্কায় নির্বাচনি সমাবেশের পর ফেয়ারব্যাংকস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রয়টার্সের প্রতিবেদক জ্যাকব বোগেজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ৫ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত
আলাস্কায় নির্বাচনি সমাবেশের পর ফেয়ারব্যাংকস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রয়টার্সের প্রতিবেদক জ্যাকব বোগেজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ৫ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা ‘অর্থবহভাবে’ কমাতে হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে সমঝোতা আলোচনায় ইরানের সিদ্ধান্ত কে বা কারা নেয়, তা নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো অনিশ্চিত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। আলাস্কায় নির্বাচনি প্রচার শেষে কথা বলার সময় ভ্যান্স বলেন, যেকোনো চুক্তির জন্য ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা কমাতে হবে। শুধু ভবিষ্যতে পারমাণবিক কর্মসূচি কমানোর আশ্বাস দিলেই হবে না।

ভ্যান্স বলেন, ‘আপনি যদি পারমাণবিক অস্ত্র না চান, তাহলে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানি কেন প্রয়োজন? আর যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেখাতে চান, তাহলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি তৈরি করবেন না। এটি খুবই মৌলিক একটি বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, তারা যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেখাতে চায়, তাহলে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতায় অর্থবহ পরিবর্তন আনতে হবে।’

রয়টার্স লিখেছে, বিদেশে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংশয়ী ভ্যান্স এবার সংঘাতের অবসানে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জুনে তিনি একটি সাময়িক শান্তিচুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে সেটি দ্রুত ভেঙে পড়ে। এই যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্যও রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠেছে।

ইরান যুদ্ধের অবসান এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ট্রাম্প তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো একটি চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহী। তবে এর জন্য ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে হবে। ভ্যান্সের ভাষ্য, ‘আমরা কথার বিনিময়ে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি না।’

‘ইরান কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তা স্পষ্ট নয়’

শান্তি আলোচনার বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে তেহরানে আসলে কে সিদ্ধান্ত নেয়, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের অনিশ্চয়তা। ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে তাদের কতটা কর্তৃত্ব রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে জানান ভ্যান্স। বলেন, ‘আমরা যে বিষয়টি বুঝতে পেরেছি, তা হলো— তাদের দেশ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।’

আলাদাভাবে মঙ্গলবার ট্রাম্পও বলেছেন, তার ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা’ হলো ইরান কে চালাচ্ছে, তা কেউ জানে না। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা তাদের ইরানি আলোচক কারা এবং ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে— তা ভালোভাবেই জানেন।

সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘সমস্যাটি আসলে উলটো। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং মিশ্র বার্তাই সমস্যার কারণ।’

এদিকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বোঝার জন্য তিনি সরাসরি সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগও তিনি নাকচ করে দেন। আরও বলেন, ইরানি সেনারা হরমুজ প্রণালিতে মাঝেমধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম হলেও এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করার মতো সক্ষমতা তাদের মূলত নেই।

শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তিনিই নেতৃত্ব দিচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি বলতে রাজি হননি ভ্যান্স। তবে হোয়াইট হাউজের প্রধান আলোচক হিসেবে তাকে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা অবশ্যই এতে জড়িত। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই পুরো বিষয়টি পরিচালনা করছেন।’

ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এরই মধ্যে এটি নির্বাচনি প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা চাপের মুখে পড়েছেন।

সংঘাত মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা কমানোর চেষ্টা করছেন ভ্যান্স। ভোটারদের তিনি বলছেন, আগামী মাসের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সমর্থন না করার কারণ হিসেবে এই বিষয়টিকে বিবেচনা করা উচিত নয়।

আলাস্কায় ভ্যান্স রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার সঙ্গে সুলিভানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প আলাস্কায় ১৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় এবার অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনি পরিস্থিতি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আলাস্কায় নির্বাচনি প্রচারে ভ্যান্সের বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ। আলাস্কার ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থানের কারণে সেখানে ভোগ্যপণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে জ্বালানি উৎপাদন অঙ্গরাজ্যটির অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত।

সমাবেশে রিপাবলিকান সিনেটর সুলিভান ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সকে ভুল করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে বসেছিলেন। এ সময় উপস্থিত লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়েন। ট্রাম্পের পর হোয়াইট হাউজে উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে ভ্যান্সকে অন্যতম শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরে রয়টার্সকে ভ্যান্স বলেন, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, ‘আমি স্বভাবগতভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করি। বিষয়টি নিয়ে আমি সত্যিই খুব একটা ভাবিনি।’

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement