মেক্সিকো সীমান্তে ‘হিট রে’ ব্যবহারের অনুমতি হেগসেথের, আইনি-নৈতিক ভিত্তি নিয়ে বিতর্ক

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও হিট রে মেশিন। ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও হিট রে মেশিন। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সামরিক বাহিনীর তৈরি ‘হিট রে’ পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তবে অস্ত্রটি সীমান্তে ব্যবহার করা কতটা আইনসম্মত এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে এর প্রয়োগ কতটা নৈতিক— তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সিএনএনের হাতে পাওয়া একটি স্মারকলিপি অনুযায়ী, হেগসেথ গত মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অ্যাকটিভ ডিনায়াল সিস্টেম (এডিএস) সাত মাসের জন্য স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগকে (ডিএইচএস) ধার দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই পরীক্ষামূলক ব্যবহারের মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।

এডিএসকে সাধারণভাবে ‘হিট রে’ বলা হলেও প্রযুক্তিগতভাবে এটি তাপরশ্মি নয়। এটি ৯৫ গিগাহার্টজের অদৃশ্য মিলিমিটার-তরঙ্গ ছুড়ে দেয়। তরঙ্গটি ত্বকের খুব অল্প গভীরে প্রবেশ করে সেখানে তীব্র উত্তাপের অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে লক্ষ্যব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই সরে যেতে, নুয়ে পড়তে বা দৌড়াতে বাধ্য হন।

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এর অনুভূতিকে গরম ওভেনের দরজা খুললে মুখে লাগা তাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সাধারণত এই অনুভূতি ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। তবে অস্ত্রটির উদ্দেশ্যই হলো লক্ষ্যব্যক্তির জন্য এমন তীব্র অস্বস্তি তৈরি করা, যেন তিনি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

আইনি অনুমোদন আছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বহু বছর ধরে এডিএসকে ‘অপ্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ২০১২ সালে মার্কিন মেরিন কোর জানিয়েছিল, সিস্টেমটি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সে সময় কর্মকর্তারা অস্ত্রটির নিরাপত্তা নিয়েও আস্থা প্রকাশ করেছিলেন।

কিন্তু ‘অপ্রাণঘাতী’ মানেই আইনিভাবে ঝুঁকিমুক্ত, তা নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও বৈষম্যহীনতার মতো নীতি গুরুত্বপূর্ণ।

সীমান্তে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের ঠেকাতে কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা হলে সেটি প্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না— সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্রটি যদি ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়, তাহলে কে বৈধ লক্ষ্য আর কে নয়, তা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষের ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, এডিএসের ব্যবহার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয়তার সীমা অতিক্রম করবে কি না। কোনো ব্যক্তিকে সীমান্ত অতিক্রম থেকে বিরত রাখতে এমন একটি সামরিক-গ্রেডের অস্ত্র ব্যবহার করা হলে তার আনুপাতিকতা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

‘অপ্রাণঘাতী’ অস্ত্রের নৈতিক প্রশ্ন

এডিএসের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো— এটি প্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্রের তুলনায় প্রাণহানির ঝুঁকি কমিয়ে মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে পারে। সীমান্তে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রাণঘাতী অস্ত্রের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা হলে ক্ষয়ক্ষতি কমতে পারে— এমন যুক্তি রয়েছে।

কিন্তু নৈতিক দিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে এর ব্যবহার নিয়ে। কারণ অস্ত্রটি এমনভাবে তৈরি যে ব্যথা ও তীব্র শারীরিক অস্বস্তির মাধ্যমে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অর্থাৎ কাউকে গুলি না করেও তার শরীরকে লক্ষ্য করে তাকে একটি নির্দিষ্ট আচরণে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে এটি নিছক ‘নিরাপত্তা প্রযুক্তি’, নাকি মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রিত শারীরিক কষ্ট প্রয়োগের একটি ব্যবস্থা— সে প্রশ্ন উঠছে।

আরও একটি উদ্বেগ হলো অপব্যবহারের সম্ভাবনা। সীমান্তে বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে জড়ো হলে অস্ত্রটি ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে ব্যবহার করা হতে পারে। অথচ ভিড়ের প্রত্যেক ব্যক্তি একই মাত্রার হুমকি তৈরি করছেন— এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।

আফগানিস্তান থেকে সীমান্তে

এডিএস যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কোনো প্রযুক্তি নয়। প্রায় ২০ বছর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী এটি আফগানিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল। তবে অস্ত্রটি সেখানে ব্যবহার না করেই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও সীমান্তে এডিএস ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে সীমান্ত অতিক্রম ঠেকাতে এবং ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রটি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা মোতায়েন করা হয়নি।

এবারের ব্যবস্থাটি আগের চেয়ে আলাদা। নতুন স্মারকলিপি অনুযায়ী, ডিএইচএস অস্ত্রটির ব্যবহার, পরিচালনা এবং কৌশল নির্ধারণের দায়িত্বে থাকবে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের কোনো সদস্য এটি পরিচালনা করবেন না।

মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন বলেছে, তারা ‘জীবন রক্ষা এবং একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার কার্যকারিতা বাড়াতে পারে’— এমন নতুন প্রযুক্তি নিয়মিত মূল্যায়ন করছে। কিন্তু সীমান্তে ‘হিট রে’ পরীক্ষার অনুমোদন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে— মানুষকে সীমান্ত থেকে সরিয়ে দিতে কতটা শারীরিক কষ্ট দেওয়া বৈধ, আর কতটা কষ্ট দেওয়া নৈতিক?

অস্ত্রটি প্রাণঘাতী নয়— এই একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর মেলে না। শেষ পর্যন্ত এর বৈধতা নির্ভর করবে কখন, কার বিরুদ্ধে, কী পরিস্থিতিতে এবং কী মাত্রায় এটি ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। আর নৈতিকতার প্রশ্নটি আরও কঠিন—রাষ্ট্র নিরাপত্তার নামে মানুষের শরীরে ইচ্ছাকৃতভাবে তীব্র যন্ত্রণা তৌরির প্রযুক্তিকে কতদূর পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য মনে করবে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad